সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

সময় এসেছে  মানুষগুলিকে সম্মানিত করার

আমি জানি না এই আরব সাগরের মাঝামাঝি প্রজাপতি এলো কোথা থেকে।
প্রজাপতি যেই ছোট এই সাগরের হাওয়ায় ওরা টিকে আছে কিভাবে সেটাই তো রহস্য।
আমার মনে হয় গতকাল আমরা যখন মিনিকো দ্বীপের পাশ দিয়ে এসেছি তখন এরা জাহাজের সঙ্গে উড়তে চলে এসেছে।

মিনিকো দ্বীপটি ভারতের বিশেষ শাসিত এলাকা।

মিনিকো দ্বীপ

এখানকার অনেক নাবিকের সঙ্গে জাহাজে চাকরি করেছি।
তবে মোহাম্মদ নামে এক নাবিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ হয়। ওর কাছেই শুনেছি, এ দ্বীপের সবাই মুসলিম,
নিয়ম অনুযায়ী কেউ দ্বীপের বাইরে বিয়ে করতে পারেনা, সে পুরুষ কিংবা নারী যেই হোক।
আর টুরিস্ট বলতে শুধু ভারতীয়রা আসতে পারে, তাও সূর্যাস্তের আগে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয়, বিশেষ অনুমতিসাপেক্ষে তিনদিন থাকতে পারে।
এই নিয়মগুলি আসলে অনেক আগের।তবে মিনিকো দ্বীপের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো ওদের টুনা মাছ ধরার কৌশল।
কোন বড়শি বা জাল দিয়ে নয়, শুধুমাত্র হুকের মতো একটা লম্বা লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করে টুনা গেথে ওঠাতে পারে ওরা।
আর পৃথিবীর অন্যতম বড় টুনার যোগানও দেয় এই দ্বীপবাসী। জাপানিজরাও একসময় এই কৌশল শিখতে এ দ্বীপে এসেছিলো।
পাঠক মনে আছে? ইকুয়েডরের মানতায় গিয়ে টুনা দেখেছিলাম শত শত জাহাজে।
মানতা যদি পৃথিবীর টুনা ক্যাপিটাল হয় তবে মিনিকো হবে তার পর্যটন নগরী।

আরেকটা মজার গল্প বলি তাহলে।

জাহাজ তাইওয়ান কিনবা কোরিয়ান উপকূল দিয়ে এলে জাহাজে কবুতর চলে আসে।
আমরা যতদূর যেতে থাকি কবুতরগুলোও সঙ্গে যেতে থাকে। তবে কবুতরগুলির পায়ে ছোট ছোট স্টিকার আর নম্বর জুড়ে দেয়া।
আমরা ওদের খাবার দেই, ওরাও সময়মতো চলে আসে খাবার খেতে।
প্রশান্ত মহাসাগরে একটা খেলা বা প্রতিযোগিতা হয়, কোন এক বিশেষ জাহাজে বিভিন্ন প্রতিযোগীর পোষা কবুতর মাঝ সাগরে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর সুন্দর এক সকালে এদের মুক্ত করে দেয়া হয়।
এরপর দেখার পালা কার কতগুলো কবুতর কতো দ্রুতগতিতে গন্তব্যে পৌছায়।
এটা আমার কাছে পছন্দ না হলেও পুরো প্রাচ্যদেশীয় অঞ্চলে খুব জনপ্রিয় খেলা এটি।
এতে নাকি অনেক বাজিকর বাজিও ধরেন এই কবুতরের বাড়ী ফেরার দৌড়ে।
তবে ঠিক কি কারনে এই প্রজাপতিগুলি উড়ছে আর ঘুরছে বুঝতে পারিনি আমি।

মাঝেমাঝেই ছোট ছোট মেঘের দলে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ, হালকা একটা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েই পার হয়ে চলে যাচ্ছে।
আসলে আমরা যাচ্ছি পশ্চিমে আর ওরা যাচ্ছে পুবে, বিপরীতমুখী হওয়ায় খুব দ্রুতই পার হয়ে যায় মেঘ।
আজ সকালে একটা ছোট টুইস্টার দেখলাম।
এগুলি খুবি নির্বিবাদী টুইস্টার, করেনাকো ফোসফাস মারেনাকো ঢোশঢাশ,
বাপুরামের সাপের মতোই।
সাগর থেকে জল নিয়ে মেঘকে হয়তো বলছে নে ভাই পানি নে।
এখন কয়েকদিন এমনিই যাবে, মেঘ থাকবে বাংলাদেশের শরতের আকাশের মতো, বৃষ্টি হই হই করেও হবে না।

ব্রীজে গিয়ে নেপালি থাপা আর শর্মার সঙ্গে গল্প করি, ওরা হিন্দি নেপালি মিলিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে।
ওদের চাকরির মেয়াদ ছ’মাস হলেও ওরা চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে চাইছে।
ম্যানিং এজেন্সিগুলিকেই নাকি এই সিকিউরিটি জবের জন্য ৪/৫ লাখ টাকা দিতে হয়।
এগুলি উঠিয়ে তারপরে অতিরিক্ত কিছু টাকা জমিয়ে তবেই বাড়ী ফিরতে চায় ওরা।
পৃথিবীর সব গল্পগুলির একটা অন্তঃমিল রয়েছে,
এই যে শ্রমিক, প্রবাসী এরা যে মনোকষ্ট আর শ্রমকষ্ট সহ্য করে আয় করে তার বড় একটা অংশ মধ্যসত্বভোগীরা লুটে নিচ্ছে।
এই লুটেরারা দেশে দেশে শুধু ভালো যোগাযোগ আর তোষামোদি করে লুটপাট করে নিচ্ছে শ্রমিকের কষ্টার্জিত টাকা।
বাংলাদেশে আমাদের বৈদেশিক আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হলো প্রবাসীদের আয়।
অথচ বিমানবন্দরেই দেখেছি প্রবাসীরা কতোটা নিগৃহীত।
সময় এসেছে এই মানুষগুলিকে সম্মানিত করার,
যাদের শ্রমে ঘামে দেশের অর্থনীতি মজবুত হচ্ছে প্রতিদিন।

ব্রীজে থার্ড অফিসার বললো আজ থেকে নাকি তিনদিন টানা পার্টি হবে।
আমি বললাম কি সেই উৎসব।
অফিসার আমাকে বললো, কাপ্তানের জন্মদিন সোমবার, তাই শনি আর রবিবার মিনিপার্টি, সোমবার ধামাকা উৎসব।
আমি মনে মনে বলি, আল্লাহ্ বাচাইছে, জন্মদিন আগেই হয়ে গেছে।
নাহলে তিনদিন এই ফিলিপিনো দুষ্ট বালকদলের বিয়ার সরবরাহ করতে গিয়ে তো জন্মদিনে মানিব্যাগ ফতুর হয়ে যেতো।
আমি গোপনে এই কাপ্তানের নাম দিছি কাইশ্যা, বেশ হাসিখুশী এবং বিনোদন হলো এই কাপ্তান।
সারাদিন বসে বসে সেদ্ধ ডিম খাবে, ভাতের ধারেকাছেও যাবেনা।
আমার কাছে কাল বললো, সে মুটিয়ে গেছে, এখন ওজন কমানোর চেষ্টায় আছে তাই ভাত খাচ্ছেনা।
আমি গুণে গুণে দেখলাম প্রতিদিন সে ছয় থেকে আটটা ডিম খায়, ওজন কেমনে কমায় সেই তরিকা উনার কাছ থেকে শিখছি।
কাপ্তান কাটাকুটান যতো ঘুমায় আমার মনে হয় এতো ঘুম শীতকালে ব্যাঙও ঘুমায় না।
বিয়ার পাইলে চান্দে যে কি খুশী হয়, স্যান্ডো গেঞ্জি পরেই শুরু হয় তার ক্যারাওকে
তারপরেও সে আশাবাদী তার ওজন কমবে।

রাতে আজকাল আমার মনটা খারাপ থাকে।
শ্রীলঙ্কা উপকূল পার হওয়ার পর আকাশে তারার দেখাও মিলছে না।
আমার প্রিয় চাঁদটাও ডুব দিয়েছে, আবার দেখা মিলবে হয়তো চানরাতে।
তার আগপর্যন্ত বিরহে থাকতে হবে, হয়তো ছয় তারিখের পর থেকে চাঁদ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে,
আমরা ততোদিনে জেদ্দার কাছাকাছি পৌছে যাবো।
জেদ্দার পাশ দিয়ে যেতেই হয়তো ঈদ আসবে, মানে এবারের ঈদ আমরা মক্কার মানুষের সঙ্গে পাবো।

যদিও আমরা দুইজন মাত্র মুসলিম জাহাজে তবুও কাপ্তান বলে রেখেছে আস্ত ল্যাম্ব নাকি বারবিকিউ হবে এবার।
এই আস্ত ল্যাম্ব সে ক্রিশনাপাটনাম থেকে নিয়েছে আমাদের ঈদ উপলক্ষে।
গতবারের ঈদে ৪ জন মিলে সবচেয়ে ছোট জামাতে নামাজ পরেছিলাম, এবার মনে হয় দুজনেই পরতে হবে।
একটা দুইটা ফিলিপিনো ধরে তালিম দেয়া শুরু করমু নাকি তাই ভাবতেছি,
তাবলীগেও তো যাইনাই, একবার গিয়ে পালিয়ে আসছি,
আমাকে দিয়ে এ কাজও হবে বলে মনে হচ্ছে না।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]