সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

সুকোত্রা দ্বীপটি এখন আমাদের খুব কাছাকাছি, ৯৯ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে আছি আমরা। এডেন উপসাগরে ঢুকতেই এই সুকোত্রা দ্বীপটি, কখনও যাওয়া হয়নি এ দ্বীপে। দ্বীপটি ইয়েমেন থেকে অনেকদূরে হলেও ইয়েমেনের অংশ হয়েই আছে বহুকাল। যদিও এখন সৌদিদের আক্রমণে ইয়েমেন যখন বিপদগ্রস্ত তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী কোন উদ্দেশ্য বিধেয় ছাড়াই এ দ্বীপ তাদের বলে দাবি করে বসেছে। আমরা এই আরব উপদ্বীপের মানুষদের যতো ভালো ভাবি বা বলি আসলে তারা কিন্তু তেমন নয়, বেশ লোভী এবং অত্যাচারী, শাসক হিসেবে দুনিয়ায় ইসলামের যতটুকু ক্ষতি সাধন করা যায় তার পুরোটা এরা করছে বা করার চেষ্টায় আছে। যা হোক বর্তমান আরবদের আমি কখনই মুসলিমদের উদাহরণ হিসেবে মনেও করিনা। এদের না আছে ভ্রাতৃত্ববোধ না আছে বিনয়।

গতকাল জাহাজে বারবিকিউ উৎসব চলছিল কাপ্তান কাটাকুটানের জন্মদিন উপলক্ষে, আজও নাকি ক্যারাওকে গানের উৎসব হবে। এরা এতোই আমুদে জাতি যে আমি নিজেকেই কেমন বেমানান মনে করি মাঝেমাঝে। আমরা হয়তো বাংলাদেশে ঘটা করে কিছু উৎসবে মেতে উঠি, কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনেও যে হাসতে হয়, গান গাইতে হয়, ফূর্তিতে মেতে উঠতে হয় সেটা ওদের কাছ থেকেই আমি জেনেছি। আমি কাল বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বললাম, আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলছে বিশ্বকাপের। একজন বোকাবোকা চেহারায় জানতে চাইলো ক্রিকেট কি জিনিস। আমি বুঝলাম, আসলেই তো এরা ক্রিকেট কি তাই তো জানে না।

দীর্ঘদিন স্প্যানিশ উপনিবেশ শাসনে ছিলো ফিলিপিন্স, সেই হিসেবে ওরা অবশ্য ফুটবলটাও শেখেনি। পৃথিবীর তাবৎ স্প্যানিশ আর পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিলো যে দেশগুলি তারা খুব ভালো ফুটবল খেলে, সম্ভবত এই ফিলিপিন্সই ব্যতিক্রম। স্প্যানিশ কলোনিয়াল দেশগুলোর আরেকটি জিনিস না বললেই না, সেই গুয়েতেমালা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা,  সবার জাতীয় পতাকায় আসমানী রঙ আছেই, হয় ডাইনে বায়ে নাহয় উপর নিচে, আর ফুটবলটাও খেলে এরা অফুরান ভালোবাসায়। অন্যদিকে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশে ছড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেট, জাহাজে চড়ে যুগে যুগে নাবিক সওদাগরেরাই ফুটবল, ক্রিকেট দেশে দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশের ছোঁয়া পাওয়া দেশ মানেই ক্রিকেট ভালো খেলে। যদিও আজকাল ব্রিটিশরা তাদের এক সময়ের প্রজাদের কাছে নাকানিচুবানি খায় হরহামেশাই।

যাই হোক এবার আমার ফিলিপিনোদের ক্রিকেট শেখানোর গপ্পোটা বলি। বহু ভেবেচিন্তে ওদের বললাম বেসবল তো বুঝো, নাকি!!
জ্বী বস, আলবত বুঝি।
আমি বলি তাহলেই ক্রিকেট বোঝা সহজ।
ক্রিকেটও বেসবলের মতো একটা খেলা, তবে বেসবলের ব্যাট যেমন ডান্ডার মতো ক্রিকেট ব্যাটটা সেরকম না, এটা হলো ফ্লাট আর কাঠের বানানো।
এরপর আরেকটা মিল হলো বেসবলে রান নেয় বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে, আর ক্রিকেটে রান নেয় সিধা দৌড়ায়ে।
আর মাঠের বাহিরে বল গেলে বেশী রান বেসবলের মতোই।
এদের দেখে মনে হলো এরা খুব বুঝছে। আমি এবার বললাম এই বিশ্বকাপে তো বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে।
যা কিছু বুঝেছে, নাকি কি কিছুই বুঝে নাই, এটা শুনে সবাই একসঙ্গে চিল্লাইলো, ভি চিহ্ন সবার বাংলাদেশের জন্য।

এরপর আমার সারা সন্ধ্যা গেলো উপুর্যুপরি টেনশনে, যদি প্রথম খেলায়ই ধরা খাই, চুপচাপ থাকতে হবে, এই ক্রিকেট নিয়ে বেশী কথা বলা যাবেনা।
যদিও বাংলাদেশ জিতেই গিয়েছে, ওদেরকে সংবাদটা জানিয়ে এসেছি সেই মধ্যরাতে, তখনও ওদের ক্যারাওকে বিয়ার উৎসব চলছিলো।
আহা কী গানই যে এরা গায়, আর কি যে মজা পায়!!!

আমি অবসরে আজকাল বিনোদন খুজে পাই ফেসবুকের মন্তব্যগুলি পড়ে। গতকাল রাতে কিউই সুপারস্টার ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ফেবু পোস্টে গিয়ে মন্তব্যগুলি পরে হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেছে। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম কে একজন লিখছে,
“শালারপুত তোরে কাছে পাইলে টেংরি ভাইঙ্গালাইতাম,
You are too good McCullum, keep going”
মানে সে যা বাংলায় লিখেছে ইংরেজিতে তরজমাও করে দিছে। আমরা বাংলাদেশীরা এমনই কিউট জাতি, খেলা চলার সময়, বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ,  ইনশাআল্লাহ। দোয়া-দরুদ আর মেনাজাতে বসে যাই। তারপর একবার জিততে পারলে কেডা কোথায় আছিস। প্রতি টুর্নামেন্টে কমন একজন শত্রু বানানো চাইই চাই। তারপর খেলায় জিতলে তাহার চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করি, যদিও ক্রিকেটটা যে একটা খেলা তখন ভুলেই যাই। আর হেরে গেলে রয়েল বেঙ্গল বাঘ মিউ মিউ করা শুরু করে মেনিবিড়ালের মতো। সুন্দরবনের বাঘও তখন মাছ আর দুধ খায় চুরি কইরা।

রাত দুটার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো আমার, জাহাজটা হঠাৎ দুলতে শুরু করেছে। ডানে বায়ে দুলতে দুলতে আমার কেবিনে অনেককিছু ফ্লোরে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। কেবিনের পোর্টহোলের পর্দা সরিয়ে দেখি বেশ ভারী বৃষ্টি হচ্ছে আর চলছে আকাশ আলো করা বজ্রপাত। আমরা ছোটবেলায় এটাকে বলতাম ঠাডা, ঠাডা পরে অনেক মানুষ মারা যেতো বলেই মনে হয় এমন নামে তাকে ডাকা। এই ঠাডা পড়ছিলো পুরো সাগরে এলোপাথাড়ি, চমকে চমকে আলোকিত হয়ে উঠছে ঘুটঘুটে আঁধারের এ সাগর। আতশবাজির মতো আলো। একবার আমাদের এক জাহাজের এম -এফ এইচ -এফ এন্টেনায় এই বজ্রপাতের আঘাতে ঐটা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিলো।

এতো রাতে এই ঠাডা ঠুডা দেখতে ভালো লাগছিলোনা, তাই সবকিছু গুছিয়ে, আবার ঘুমের কোলে। জাহাজের এই একটা জিনিস পৃথিবীসেরা।
জাহাজ একটু একটু দুলবে, আর ঘুমটা হবে ছোটবেলার দোলনাঘুমের মতো। যদিও ওয়েদার বেশী খারাপ হলে তখন আবার বিপরীত দৃশ্য। এমন কষ্টের ঘুম কেউ ঘুমায় না মাটির পৃথিবীতে। সারাক্ষণ মনে হবে ভূমিকম্প হচ্ছে আর আপনি রোলারকোস্টারে বসে আছেন। নিজেকে পাকা জাম মনে করুন পাঠক, সঙ্গে লবণ মরিচ মিশিয়ে কৌটায় ঝাকালে যে অবস্থা আমাদেরও তেমন হয়।

নেপালিরা একটু দেরী করে এলো আজকের উৎসবে, একজনকে জিগ্যেস করলাম ক্রিকেট বোঝো কিনা, সে বললো সাকিব আল হাসান তো খুবই ভালো মানুষ। তার মানে ক্রিকেট শুধু বোঝেই না খবরও রাখে। সাকিবকে ওদের খুব পছন্দ, কারনটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে নেপাল নাকি খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে আজকাল। আমরা বাংলাদেশীরা ভালো খেলতে পারি এই ক্রিকেটটা, যখন খুব ভালো কিছু করে ফেলে মাশরাফির শিষ্যরা তখন আর জাতপাত বুঝিনা, আলোচনা শুরু করে দেই, বোঝা না বোঝা সে পরের ব্যাপার।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]