সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

এভাবেই সমুদ্রের মানুষেরা যুগের পর যুগ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়

লোহিত সাগরের নাম লোহিত কেন হলো এটা এবার বুঝতে পেরেছি। পানি যদিও লাল হওয়া উচিত ছিলো, রেড সী যেহেতু নাম,  কিন্তু লালপানি কোথায় পাই। এতো গরম এই সাগরে যে পরানডা আসে আর যায়। এসি কাজ করলেও একটু বাহিরে বের হলেই আগুনগরম হাওয়া।  দু’দিন সামনে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে সহমর্মিতা দেখাতে গিয়ে মুখে একটা লাল পোড়া পোড়া ভাব চলে এসেছে। যাদের ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সি আছে তাদের উচিত হবে রেড সীতে একদিন নিজেকে ঝলসিয়ে নেয়া।

আরব সাগরে চীফ অফিসার সবার জন্য ইউভেক্স নামে এক গগলস পাঠিয়ে দিলো, আবার সবার রেসিপিয়েন্ট হিসেবে স্বাক্ষরও নিলো, বুঝলাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই মাল। দু’দিন পরেই টের পেলাম কোন আজাবে প্রবেশ করেছি। প্রথম ধাক্কা এডেন উপসাগর থেকেই।  সূর্য যে বিষুবরেখা বরাবর আছে বুঝতে কোন সমস্যাই হলোনা।  কাপ্তানের জন্য দেখি বালতি ভরে আইস নিয়ে যাচ্ছে স্টুয়ার্ড, আমি জিজ্ঞেস করলাম এতো বরফ দিয়ে কি করবে? বিয়ারের সঙ্গে তে বালতি বালতি বরফ দরকার হয়না। ও যা বললো তা খুবই চমকপ্রদ।

বরফ এগুলি নাকী বাথটাবের জলে ঢালবে তারপর নাকভাসানো জলে ঢুবে থাকবে। আমি ওরে কইলাম বুদ্ধিতো খারাপ না, আমার রুমেও এক বালতি বরফ দিয়ে যাও। আমি পা ডুবায়ে বাথটাবে বসে থাকমু।  স্টুয়ার্ড খুব খুশী, একটা কাজ পেয়েছে, চীফ ইঞ্জিনিয়ার  খুব একটা কাজ তারে দেয়না, সুতরাং এটা তার জন্যে খুব উৎসাহব্যঞ্জক।

জাহাজের একেবারে সামনে নোঙর থাকে, আর নোঙর উঠানো নামানোর যে যন্ত্র এটাকে উইন্ডলাস বলে, যদিও এটার আরও অনেক কাজ আছে। তো জাহাজের ডানদিকের নোঙরের উইন্ডলাস মটরে গোলমাল হওয়ায় এটার মেরামত চলছে। আমি আলগা মাতব্বরি করতে গিয়ে কোমরে পুরোনো ব্যথার জায়গায় আবার পেলাম ব্যথা। কো কা কো কা করে আসলাম কেবিনে, এসে দেখি চোখ মুখ গতকালের খাসীর বারবিকিউ এর মতো। যেটা বুঝলাম আমি থর না, সুপারম্যানও না, সুতরাং লাইনে হাঁটলে ভালো লাগে জনাব। চায়নিজ ইলেকি ওর শক্তি দেখিয়েই তো যতো ঝামেলা পাকালো, বেটা চাইনিজ আমিও রয়েল বেঙ্গল মিউ মিউ, দেখাচ্ছি তোকে, এই দেখাতে গিয়েই সব ঝামেলা।
রুমে এসে পণ করেছি, আর যামুনা সামনে, কামের গুস্টি কিলাই।

বাবেল মান্ডেব যখন পার হচ্ছি, তখনও আমি সামনে, দ্বীপগুলি এরকম আমি আগে কখনও খেয়ালই করিনি। সবুজের কোন দেখা নেই, ধূ ধূ মরুভূমির দ্বীপ, তবে পাহাড়ি মরুভূমি।   মানুষজনও থাকে বলে মনে হলো না। অথচ এসব দ্বীপে গাছপালা লাগিয়ে বসবাসযোগ্য হয়তো করা যেতো, কিন্তু কে করবে। একটা সেতু বানিয়ে আফ্রিকার সাথে আরব উপদ্বীপের সংযোগ হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু ইয়েমেন যুদ্ধের কারনে সেই পরিকল্পনা এখন হিমঘরে।  একপাশে ইয়েমেন আরেকপাশে জিবুতি। জিবুতি দেশটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে। ওদের জিডিপির ৭০ ভাগই নাকি চীনের কাছে ঋন, সুতরাং ওরা এখন চীনের কাছে বান্ধা। চীনের দেশের বাহিরে প্রথম স্বয়ংসম্পুর্ণ সেনা ঘাঁটি এখন জিবুতি। আরব আমিরাতকে কানমলা দিয়ে বের করে দিয়েছে চীন জিবুতি থেকে। তবে বাবেল মান্ডেবের দখলটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সবার কাছে, একবার এই চিপা বন্ধ হয়ে গেলে আরবের সবাই ফান্দে পড়া বগার মতো কাঁদবে।

সে যা হয় হোক, বাবেল দিয়া আমার কাম নাই, আমি গরমে কাহিল। লোহিত সাগরে আসলামই মনে হয় দু তিন বছর পর যতদূর মনে পড়ে।
আল্লাহ আল্লাহ করতেছি, সুয়েজ কবে পৌঁছামু, তারপর ভূমধ্যসাগর।  অনেকটাই তাপমাত্রা কম মেডিটেরিয়ান সাগরের।

ব্রীজে লোকজন কিভাবে ডিউটি করে আমি সেটা নিয়ে টেনশনে পড়ে যাই। এতো রোদ আর ধূসর রঙের আকাশ দেখলে তো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা। রেড সী আমার অপ্রিয় সাগরগুলির একটি।  যদিও সবসময় শান্ত থাকবে, কোন ঢেউ থাকেনা তবুও এর অতিরিক্ত তাপমাত্রা আমাকে মানসিক অশান্তি দেয়। লোহিত সাগরের সবচেয়ে চেনাজানা বন্দর হলো জেদ্দা,  আগে বেশ আসতাম এখানে।  একবার ওমরাহ করার সুযোগও হয়েছে। একবার ঘাড়ের কাছে সিস্টের অপারেশনও হয়েছিলো এই জেদ্দায়।

মিশরের ডাক্তার সাব আর ভারতীয় দুই সুন্দরী নার্স মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তারপর লোকাল এনেস্থিসিয়া দিয়ে জাঁতা  দিয়ে ধরছিলো।
মিশরীয় ডাক্তার কয় আরেকটু, ব্যথা তো লাগছে না, তাই না? আর আমি কুরবানির গরুর মতো লাফ দিয়ে ওঠার চেষ্টা করি, সুন্দরীরা দুপাশে জাঁতা দিয়ে ধরে। এমন অমানবিক ডাক্তারি আমি দুনিয়ায় আর কোথাও দেখিনি।

একসময় জেদ্দার রাস্তায় ঘুরতাম আর চটপটির মতো সেদ্ধ বুটের ডাল ভিনিগার আর লেবুর রস দিয়ে টকটক করে খেতাম।  এটাই ওদের স্ট্রিটফুড। আরবরা খুব হুক্কা টানে, যদিও এটার আধুনিক নাম দিয়ে নিয়েছে সীসা, গুরগুর শব্দ করে বিভিন্নপদের তামাক বিভিন্ন ঘ্রাণে হুক্কার পাইপ টানবে এরা। এই সীসার দেখা আমি প্রথম পাই  ২০০৪ সালের দিকে সিরিয়ার তারতুজ, এরপরে তুরস্কের ইজমিরে। তবে জেদ্দার রাস্তায় এর এতো আধিক্য দেখে মনে হয়েছে এটা নিশ্চয় হালাল। হালাল হুক্কা বলে কথা।

এখন ঢাকায়ও সীসা বার রয়েছে উচ্চবিত্তের আবাসিক এলাকাগুলিতে। মিশরের কায়রোতেও আমি সীসা টানতে দেখেছি।  কিন্তু আমার এতো কথা সীসা নিয়ে কারনটা অন্য, এতো গরমে মানুষ গরম সীসা টানে কেন, কোল্ড কফির মতো কোল্ড সীসা আবিষ্কার করেনা কেন!!!
ধোঁয়া ছাড়বে কুলকুল, আর উপর দিয়ে কৃত্রিম তুষারপাত হবে মাথাডার ঠিক উপরে।

আজ সারাদিন দেখলাম চীফ অফিসার খুব খুশী, তার বাড়ীর পাশ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে। সন্ধ্যায় দেখলাম সে তার ভাষায় ইথিওপিয়ান জাহাজের সঙ্গে গল্পে মশগুল। এতোদিনে পেয়েছে সে তার মাতৃভাষায় কথা বলা লোকজন, দুনিয়ার যতো কথা সবই সে বললো আমার ধারণা।  আমি তখন লোহিত সাগরে সূর্যাস্ত দেখছি, দূরের ধূসর আকাশ দেখছি। আর মাঝে মাঝে নেপালি আর্মসগার্ডের সাথে কথা বলছি। এই কয়দিন ওদের কাউকে রাইফেলে হাতও দিতে দেখিনি। গায়ে সমুদ্রের হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে ওরা। একজন আবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছে সমুদ্রের হাওয়া নিরাপদ তো!!

আমি ওরে বললাম দুনিয়ায় সবচেয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাবা এই সমুদ্রে,  সো যতো পারো ফুসফুস ওয়াশ করে নাও। অলস সময় পার করা নেপালি মুচকি হাসে, কোথায় জলদস্যু কোথায় পাইরেটস অফ সোমালিয়া, যে যার কাজে ব্যস্ত আজকাল,  মরার ডর সবার আছে। নেপালিরা অবশ্য মিশরের সুয়েজ ক্যানেল পর্যন্ত যাবে আমাদের সাথে। ওরা খুব খুশী।  নাহয় ওদের জেদ্দার কাছে ভাসমান এক জাহাজে নেমে যেতে হতো, জাহাজবাড়ির নাম সুলতান।  এই দিকের যতো আর্মস গার্ড ওরা সবাই এই সুলতানে থাকে, তারপর অন্য কোন জাহাজে আবার দায়িত্ব পালনে চলে যায়। তবে ওদের খুশীর কারন সুলতানে খাবার আর পানির কষ্ট, আমাদের সঙ্গে সুয়েজ যেতে পারলে সুয়েজ পারের কোন হোটেলে থাকবে, তারপর সুয়েজ থেকেই ফিরতি কোন জাহাজে উঠবে।

এরাও আমার কাছে সমুদ্রের নাবিকদের মতোই। এভাবেই সমুদ্রের মানুষেরা যুগের পর যুগ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, নিঃশব্দে নীরবে এবং বহু আত্মত্যাগে। একুয়াম্যানরা মনে হয় আজকাল জাহাজ চালায়। একবার শুনেছিলাম পৃথিবীর সমুদ্র পরিবহন যদি বন্ধ হয়ে যায়, পৃথিবী মাত্র তিনদিনে  অচল হয়ে পড়বে।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]