সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

শান্ত আর টলমলে জলের নদী মনে হয় নীল নদকে

আজ শনিবার, এ কয়দিন জাহাজের প্রকৌশলীরা বেশ চাপে ছিলো। জাহাজের ফোরক্যাসল উইন্ডলাস মোটরের বিভিন্ন পদের সমস্যা একের পর এক জটিল হচ্ছিলো আর তার সঙ্গে পরছিলো ঠাডা পরা রোদ্দুর।

পিরামিড

তবে প্রকৌশলীদের একটা গুণ আমি সারাজীবন দেখে এসেছি এরা মুরগীর ছাওয়ের মতো একজায়গায় থাকবে। বিশেষ করে প্রধান প্রকৌশলীর আশেপাশে ঘুরঘুর করবে।
কিচকিচও করবে মুরগীর ছাওয়ের মতো।ও ফোরক্যাসল কি জিনিস সেটা বলে নিচ্ছি, জাহাজের সামনের দিকে সাধারণ ডেক থেকে উঁচু যে ডেকে জাহাজকে সামনের দিকে বন্দরের সঙ্গে বাধবার যন্ত্রপাতি আর মুরিং রোপের

জায়গাটুকু সেটাই ফোরক্যাসেল।
সামনে একটা উঁচু মাস্টও থাকবে, সঙ্গে থাকবে রাতের নেভিগেশন লাইট।
টাইটানিক মুভি দেখলে মনে পরার কথা, দুই নাবিক সেই মাস্টে বসে গল্প করতে আর রোজকে দেখতে গিয়ে আইসবার্গ দেখতে ভুলে গিয়েছিলো।
যদিও এখন আর নাবিক এসব খাম্বা খুম্বায় উঠে ডিউটি করেনা।
সামনের দিকে আবার দুটো নোঙরও থাকে বন্দরের বাহিরের উপকূলে ভাসবার জন্য।

তো এই ফোরক্যাসেলের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো আজ, রোদে পুড়ে একেকজন কাবাব হয়ে গেছে।
দুপুরের আগেই কাজ শেষ, সেকেন্ড ইনঞ্জিয়ার তিনায়তিনাকে বললাম বিকেলে ছুটি করো, চারটার পরে আবার ড্রিল আছে।
জাহাজে প্রতি শনিবার কাজের নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন পদের ড্রিল হয়, ফায়ার ড্রিল, বোট ড্রিল, আরও অনেক হাবিজাবি।
এগুলি হলো নাবিকদের জীবনে সবচেয়ে অপছন্দের কাজ।

দুপুরের লাঞ্চে আমি একটু দেরী করেই যাই।
আমি সারাজীবনই একটু ঢিলা প্রকৃতির, তারাহুরো জিনিসটা আমার জীবনে নেই।
ফিলিপিনোদের সঙ্গে কাজ করলে যে কেউ আরো ঢিলা হবে। এরা খুব একটা তারাহুড়ো করে না, যেমনে চলছে তেমনি চলুক মনের সেটিং এদের।
তো আজ হেলতে দুলতে লাঞ্চে গিয়ে দেখি পুরোপুরি মৎসদিবস। সমুদ্রের একটা নাম না জানা মাছ ক্যাপসিকাম আর পেয়াজ দিয়ে ভেজে দেয়া,
নুডলস দিয়ে আলুর সঙ্গে চিংড়িমাছ, তাও সেদ্ধ।
আর সঙ্গে যে স্যুপ, সেটা ঝিনুক দিয়ে মাশরুম আর আদাজল দিয়ে বানানো। ফিলিপিনোরা মাছের স্যুপটা ভালো বানায়, প্রচুর আদা আর রসুন দিয়ে অনেকক্ষণ জ্বাল দিয়ে বারবার পানি রিফিল করে এই স্যুপটা ওরা বানায়।
আমি তো বাঙ্গালি, তাই এই স্যুপটা দিয়ে আমি ডালের কাজ সারি।
তবে আজকের ঝিনুকের স্যুপটা বেশীই পানি দেয়া ছিলো।

আমি ঝিনুক শামুক এগুলি খেতে পারি, অভ্যাস আছে।

নীল নদ থেকে উঠে আসা মন্দির আবু

প্রথম শামুক আর ঝিনুকের ঘণ স্যুপ খেয়েছিলাম পানামায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে।

সেবার অবশ্য না বুঝেই খেয়েছিলাম। সিফুড স্যুপ বলতেই ওরা এটা দিয়েছিলো।
এরপর থেকে এই শামুক ঝিনুক আমাকে আর ভয় দেখাতে পারে না।
আমার বউকে নাকি তার মা, আমার শ্বাশুড়ি ছোটবেলায় কি এক ঔষধ হিসেবে শামুক খাইয়ে দিয়েছিলো।
এরপর থেকে আর সে কোন কুচকুচ করা জিনিস মুখে নেয় না। আমার ইচ্ছা আছে তাকে একবার ভুলিয়ে ভালিয়ে শামুক ঝিনুকের স্যুপ খাওয়ামু।

জাহাজে আসলেই আমার খালি প্রিয় খাবারগুলির কথা মনে হয়। আমি আসলে নিতান্তই গরীবি খাবার বেশী পছন্দ করি।
কচুর লতি দেশীটা অথবা ধুন্দল দিয়ে চিংড়ি মাছের তরকারি আমার খুব পছন্দের।
মাছের মধ্যে খইলশা মাছ খুব কড়া করে ভাজা, কিনবা চিংড়ী মাছের বড়া হলে আমার আর কিছু লাগে না।
যদিও এ জিনিসগুলির দাম এখন আর গরীবি নাই।
আমার দাদী খুব শখ করে গ্রামের বাড়ীতে কাঁকরোল আর মাটিআলু লাগাতেন।
একটা নুয়ে পরা আমগাছে লতায় লতায় ভরে যেতো কাঁকরোল আর মাটি আলুর গাছ। সবুজ, হলুদ আর লাল রঙের কাঁকরোল হতো প্রচুর। আমি সেগুলি গাছ থেকে পেরে এনে দিতাম দাদীকে।
তবে দাদীর হাতে যাদু ছিলো, রান্নাটা উনি এতো চমৎকার করতেন আজও ভুলতে পারিনি।
কলায় পাতায় মোড়ানো গুড়ো মাছের পাতুরি যে স্বাদের হতো, পৃথিবীর আর কোন কারিগর সেরকম বানাতে পারবে বলে মনে হয় না।  আহা জাহাজে বসে আজ দুযুগ পুরোনো স্মৃতিকাহন কেন!!!
খানাপিনার আলোচনা তাহলে বাদ।

এখন একটু একটু করে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে।
লোহিত সাগরের শেষ দিকটায় চলে এসেছি। একদিকে সৌদি আরব আরেকদিকে মিশর।
টিভিটা টিউনিং করে দেখি আরব চ্যানেলে আরবীতে বকেই চলেছে। খুব খেয়াল করেও কিছু বুঝতেছি না।
বাঙ্গালি তো আরবী পড়তে শিখেছি, অর্থ তো আর শিখিনি।
ছোটবেলায় হুজুরের বহুত কানমলা খেয়েছি শুধু আরবী পড়ার সময় ঘুমানোর জন্য।
আরবী পড়া আর মসজিদে খুতবা শোনার সময় আমার ঘুম আসবেই, এটা আমার কাছে বেহেশতী সুখের একটা ব্যাপার।
যা বলছিলাম এই বেটার আরবী শুনে উল্টো মেজাজ খারাপ লাগছিলো, বোঝাই যাচ্ছে গপাগপ পরচর্চা করছে। শুধু একটা শব্দ বুঝলাম ইয়েমিন ইয়েমিন।
প্রত্যেক লাইনের আগায় মাথায় ইয়েমেনের নাম নেয়া  মানে ওদের গুস্টি উদ্ধার চলছে।
দিলাম শালার টিভি বন্ধ করে, জাহাজের টিভি রিমোট তো আমার নিয়ন্ত্রণেই থাকে, হা হা হা।

কালকে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে লোহিত সাগরের শেষ মাথায় চলে যাবো, মানে সিনাই উপদ্বীপ।
সিনাই পৌছালে আমার মন ভালো হয়ে যায়, এই সিনাই নিয়ে কুরআনে একটি সুন্দর শ্রুতিমধুর সুরা আছে।
সিনাইএর দুপাশে দুইটি উপসাগর, সুয়েজ উপসাগর আর আকাবা উপসাগর।
আকাবা বন্দর পর্যন্ত পৌছতে একদিনের মতো সময় লেগে যায়, যদিও সঠিক মনে করতে পারছি না। অনেক আগে আকাবায় গিয়েছিলাম, পাশেই ইসরায়েল, ইসরায়লে তখনও আলোর ঝলকানি, আকাবায় গরীবি হাল। পাশাপাশি দুদেশের দুটি বন্দর, যদিও আকাবায় বাহিরে যাওয়া হয়নি,
অথচ ইসরায়েলে আমি বাহিরে ঘুরেছি। ওরা ভুল করে একমাত্র বাংলাদেশীকে ইউক্রেনিয়ানদের সঙ্গে পারমিট দিয়েছিলো।

নীল নদ

সুয়েজ উপসাগর পাড়ি দিয়ে সুয়েজ ক্যানাল পৌছতে আমাদের দশ তারিখ সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
পরের দিনের সুবেহ সাদিকের কনভয় ধরতে রাত দশটার আগে পৌছলেই হবে।
ডানদিকে যে পাথুরে পাহাড়ের উপত্যকা পরবে সেটাই সিনাই, আর এর নামকরণও ছোট একটি পাহাড়ের নামে, তুরে সিনিনা। পাশের পাহাড়ের নাম দেখলাম ক্যাথেরিন, যদিও আল্লাহ এই তুর পাহাড়েরই শপথ করেছেন,
একেই সম্মানিত করেছেন।

আমার খালি এই উপসাগর পাড়ি দেয়ার সময় মনে হয়, ফেরাউনরে মনে হয় এখানেই চুবানো হয়েছিলো, নীলনদ তার শাস্তির জন্য অনেক ছোট হয়ে যেতো।
নীল নদের পাশে আমি অনেকক্ষণ বসেছিলাম, আমার কাছে শান্ত আর টলমলে জলের নদী মনে হয়েছে নীলকে।
লেক ভিক্টোরিয়া থেকে সাদা নীল আর ইথিওপিয়ান লেক তানা থেকে ব্লু নীল এসে মিশেছে এ মিশরে।
পৃথিবীর উত্তরদিকে বহমান সবচেয়ে বিখ্যাত এ নদী।
খেয়াল করে দেখেছি পৃথিবীর যতো বিখ্যাত নদী আছে সব দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিলেছে, একমাত্র এই নীলনদই উত্তরে ধাই ধাই করে ছুটেছে। যদিও আরও অনেক নদীই উত্তরে গিয়েছে তবে নাম এতো রোশনাই হয়নি।
ও হ্যা, মজার গল্প হলো, আমাদের তুরাগ নদীও কিন্তু উত্তর পূর্বে প্রবাহিত হয়ে পূর্বাচলের একটি জায়গায় গিয়ে হ্রদের কাছে শেষ হয়েছে।
পূর্বাচলের এই বিশাল জলাভূমিতে প্রচুর লাল শাপলা, লাল পদ্ম আর সাদা পদ্ম ফুল ফোটে সারাবছর।
তবে বেশীদিন থাকবে বলে মনে হয়না।

নীলনদের, পিরামিডের গল্প আরেকদিন বলবো।
সুয়েজ ক্যানেল পাড়ি দিবো আর গল্প জমাবো। মিশরীয়দের আমি খুব ভালোভাবেই জানিতো তাই জানি ওরা গল্পের ডালি সাজাবেই, গল্প ওদের সাথেই হাটে।
এমন চালাক এবং বান্দর মানুষ আমি খুব কম দেখেছি দুনিয়ায়।
তবে তাদের সবচেয়ে বড়গুণ বুকপকেটে কুরআন শরীফ আর আলহামদুলিল্লাহর হাসি।

ইউ মুসলিম মি মুসলিম, ফর ইউ অনলি টুয়েন্টি ডলার, ডোন্ট স্পিক আদারস, কিপ সিক্রেট।
পরে দেখি এই কথা সবাইরেই কয়, আর দামও যার কাছে যা পায় তাই লয়। সেসব গল্প পরে বলবো।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]