সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

তরমুজ মিশরীয় সভ্যতার কোলেপিঠে করেই এসেছে

আজ সারাটা দিন গেলো এলোমেলো, অবশ্য ঠিক জিরো আওয়ার থেকেই শুরু হয়েছে এ যন্ত্রণা। রাত বারোটার পরে পাইলট এসে এমন হন্তদন্ত হয়ে নোঙর ওঠালো, যেন এখনই হাওয়ায় ভাসিয়ে জাহাজ ভূমধ্যসাগরে নিয়ে যাবে। চারটা পর্যন্ত তানিবানি করে সুয়েজের গোড়ার দিকে গ্রেট বিটার লেকে নিয়ে আসলো, তারপর পিনপতন নীরবতা। গ্রেট বিটার লেক বাংলায় তরজমা করলে হয় বিখ্যাত তিতা হ্রদ। কেন যে এ নাম ব্রিটিশরা দিয়েছিলো আমি তা জানি না, তবে এই মাঝরাতে ঘুম নষ্ট করিয়ে এমনে নিয়ে আসলে এটার নাম তিতাই হয়ে যাবে। এরপর বেশ দেরী করেই ঘুমোতে গেলাম, এটা জাহাজিদের জীবনে অবশ্য হরহামেশাই ঘটে থাকে। কিন্তু কী  এক কারনে সূর্যোদয়ের সময় ঘুম গেলো ভেঙ্গে, জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম মামায় কেবল উঠি উঠি করছে। আর কী করা দুটো ছবি উঠিয়ে আবার ধপাস।

এবার আমার কেবিন এবং অফিসরুম জাহাজের ডানদিকে মানে স্টারবোর্ড সাইডে পড়েছে, এটা ব্যাতিক্রম। কারন প্রধান প্রকৌশলীর ঘরবাড়ি জাহাজের বামদিকেই হয়, এটা জাহাজের ঐতিহাসিক নিয়ম। আর কেবিনের চারপাশে পোর্টহোল পাঁচটি, যার কারনে আমার দৃশ্যসীমা অবারিত। টুপটাপ ক্যামেরায় ছবি তোলার হারও এজন্য বেশী। বিটার লেকে আমরা নোঙর করে দুপুর নাগাদ রওয়ানা করবো, তবে এই হ্রদে ভাসলে খুব তিতা মনও মিষ্টি হয়ে যাবে। একবার খুব মনোযোগ দিয়ে চারদিক দেখলাম, তারপর ভেবে দেখলাম এমন স্বচ্ছ জলের শান্ত হ্রদ আমি শুধু পানামা ক্যানেলেই দেখেছি, নাম আবার তার গাতুন হ্রদ। তবুও মিশরের কোন এক শান্ত জলের হ্রদে জাহাজ থামিয়ে নোঙর করে বসে আছি এটাই তো অনেক বড় গল্প। হয়তো বুড়ো বয়সে ছোটদের সঙ্গে গল্প করবো সুয়েজ পাড়ি দেয়ার, অতলান্তিক পাড়ি দেয়ার, প্রশান্ত পাড়ি দেয়ার, পৃথিবীর জল তো কোনটাই আর বাকি রইলো না।

তবে এইসব সরু জাহাজি রাস্তায় আমাদের সবসময় দায়িত্ব পালন করতে হয় বিরামহীন। যদিও নিয়ন্ত্রণকক্ষে সবাই বসে বসে স্ক্রিনে তদারকি করা আর গল্প গুঁজবে সময় পার হয়ে যায়। আজকের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো চতুর্থ প্রকৌশলীর লড়াই করা মোরগের ফার্মিং। ফিলিপাইনে মোরগের লড়াই একটি বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় বাজির খেলা। ছোটবেলায় দেখেছি মোরগ শুধু মুরগী ধাওয়া করে, আর ফিলিপাইনে মোরগে মোরগে লড়াই করে। এটা এতোই জনপ্রিয় খেলা যে মোরগের বাণিজ্যিক চাষ হয়, ওর নিজের ফার্মেই ফাইটিং কক আছে আশিটি। যা হিসেব দিলো প্রত্যেকটির দাম যদি হয় ১২০ ডলার তাহলে আশিটির দাম প্রায় দশ হাজার ডলার। আমরা ওর ফোনে দেখলাম কিভাবে ওর মোরগ ছাও থেকে বড় হচ্ছে, প্রতিদিন মারামারি শেখানো হচ্ছে হাতে কলমে।
সে কী যুদ্ধ, সে কী প্রশিক্ষণ, মাইরের উপর মাইর।

অতঃপর প্রকৃত যোদ্ধা হয়ে গেলে গ্রাহক এসে নিয়ে যাবে, পায়ে বেঁধে দিবে ধারালো ব্লেড, তারপর সিধা কোপাকুপি। বড় নৃশংস এ খেলা, মুহূর্তেই একটা মোরগ নাই হয়ে যায়। জীবিতটাও আধমরা। কী মজা দ্বীপবাসী জানে। বাজিও হয় হাজার ডলার থেকে লক্ষ ডলার। একবার নাকি এক মোরগ লড়াইয়ে বাজির দর ছিলো ১২ মিলিয়ন পেসোস, লও ঠেলা।

আমরা আলোচনা করছি তো করছিই, নেই কাজ তো খই ভাজ। এবার প্রশ্ন এই যে মোরগ এগুলির ডিম আসে কোথা থেকে। এরা তো ফাইটার, যোদ্ধা মোরগ, লেতরা মোরগ তো আর না। তার আগে বলে নেই মোরগের এই লড়াই খেলার আদি জন্মস্থান হলো আমেরিকার টেক্সাস। যদিও তখন টেক্সাস ছিলো মেক্সিকোর অংশ। টেক্সাসের মানুষ এই মোরগ লড়াইয়ের বাজি খেলতো। এমনিতেই যে ঠুস ঠাস গুল্লি করা জাতি এরা, মোরগ নিয়ে বাজি তো ওদের কাছে ডালভাত। পশ্চিমা মারামারির গল্প পড়তে পড়তে যারা বড় হয়েছি তারা তো জানিই টেক্সাস কি জিনিস।
তো আমেরিকা সরকার কিন্তু এই মোরগ মুরগীর লড়াই নিয়ম করে বন্ধ করে দিয়েছে, অথচ এই জাতের মোরগ শুধু যে টেক্সাসেই হয় তাই ডিম পাড়া মুরগীগুলিও খুব দামী এখন। টেক্সাসে ডিম পাড়ে আর ডিমে বাচ্চা ফুটে ফিলিপাইনে। সবই নাকি আন্ডারগ্রাউন্ডে হয়।

ফিলিপাইনে এতোই জনপ্রিয় এ খেলা বন্ধ করবে সাধ্যি কার। আমার চতুর্থ প্রকৌশলীর বাণিজ্য তাই খারাপ না, মোরগ বেচেই নাকি বেতনের সমান আয় তার। আমারেও নাকি একজোড়া যোদ্ধা মোরগ, আর মুরগী উপহার দিবে, যাতে বাংলাদেশে মোরগের লড়াই শুরু করতে পারি।
ব্যবসাটা মন্দ না, কী কন।

এরপরের আলোচনা হলো আদা। হুম জিনজার মানে সেই আদা। কুকি মিশরে আমাদের খাবার দাবারের রসদ অর্ডার করে খুব খুশী। এক ডজন আচার, বিরিয়ানি মসলা, মুরগীর টিক্কা মসলা আরও কী কী অর্ডার করেছে এগুলির ফিরিস্তি দিচ্ছে কয়দিন ধরে। আমিও খুশী, রান্নাবান্নায় তার উন্নতি চোখে পড়ার মতো, বেগুন ভর্তা আগে মিষ্টি মিষ্টি লাগলেও এখন লবণমরিচ ঠিকঠাক হয়েছে। সেমাইও মনে হয়ে শেষ হয়েছে, কয়েকদিন সেমাইর উপর ভীষণ অত্যাচার গিয়েছে। তারপর যদি সে মসলাপাতি পায় তাহলে না জানি আবার কী হয়।

গতকাল রাতেই এলো প্রোভিশন মানে খাবার দাবারের বাজার। সবাই মিলে তাড়াহুড়ো করে জিনিস বুঝে নিয়ে এরপর আবার জাহাজ নিয়ে রওয়ানা তিতা হ্রদের দিকে। কিন্তু তাড়াহুড়ায় কাম একটা হইছে। কুকি সব বুঝে পেলেও তার ১৫ কেজি আদা খুঁজে পাচ্ছে না। এই আদা কই গেলো কাপ্তান ভীষণ রাগ তার উপর। আজ দুপুরে দেখা হওয়ার পর পুরা মিশরের গুস্টি উদ্ধার করলো কাপ্তান। আমি মনে মনে কই, বেটারা সব দিলো, আদা দিলোনা কেন। আদা কি মিশরে হয়না/ নাকি দাম বেশী? ঐ যে বলেছিলাম মিশরীয়রা গল্প নিয়েই আসে। এবার দিয়ে গেলো এই আদার গল্প সঙ্গে চীফ অফিসারের সিমকার্ড। সে সকালবেলা ঘুরে বেড়াচ্ছে তার সিমকার্ড নিয়ে, কালকেই চার গিগা বলে দিয়েছে তাকে বিক্রেতা আর এখন সিমই ব্লকড। মানে হলো বিক্রেতা সিমকার্ড দিয়ে আবার তার পরিচিত দোকানে গিয়ে বলেছে যে তার সিমকার্ড হারিয়েছে,  নতুন সিম ইস্যু হলে পুরাতনটা তাইরে নাইরে নাই। এভাবেই চলছে তার ব্যবসা, আর আমাদের চীফ অফিসার এখন এভাবেই নেটওয়ার্ক খুঁজে বেড়ায় এখানে সেখানে, বেচারা।

তবে এতোকিছু যখন বললামই তখন তরমুজের গল্প না বললে কেমন হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি আর সুস্বাদু তরমুজ কোথায় হয় জানেন কি?
মিশরেই যেহেতু ঘুরপাক খাচ্ছি তারমানে ধরে নেন উত্তর সঠিক, মিশরের তরমুজই পৃথিবীসেরা। এতো সুন্দর রঙ আর সুমিষ্ট তরমুজ আমি আর কোথাও পাইনি, অবশ্য কুয়াকাটার লিলিপুট তরমুজটার তুলনা চলে কিঞ্চিৎ। আমি নিজের কথা নাহয় বলছি, কিন্তু তিন হাজার দুশো বছর আগেও ফারাও সম্রাট তুতে’আনখা’মুন তরমুজের বীজ রাখতে বলেছিলেন তার মমিতে। হুম ফারাওদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে মসনদে বসা তুতেনখামুনের মমির সঙ্গেও তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে। উনিও মৃত্যুর পর মিশরের তরমুজ খেতে চেয়েছেন। মিশরে মোটামুটি পাঁচ হাজার বছর আগের হায়ারোগ্লিফিক্সে তরমুজের ছবি পাওয়া গিয়েছে। মোদ্দাকথা, তরমুজ মিশরীয় সভ্যতার কোলেপিঠে করেই এসেছে। যদিও এর আদি জন্মস্থান দক্ষিণ আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে। আল্লাহ তাহলে এই মরুভূমিতেই দিয়েছিলেন জলমিষ্ট রঙীন তরমুজ। সুতরাং যারা বাংলাদেশে বসে বসে তরমুজে ভেজাল দেন, মানে রঙ আর স্যাকারিন ইনজেক্ট করেন তাদের জন্য পরামর্শ, মিশর থেকে বীজ নিয়ে তরমুজ ফলান, মাটি তো মাশাআল্লাহ, যে তরমুজ হবে বেচে কুলাতে পারবেন না।

রাত নয়টার দিকে আলহামদুলিল্লাহ সুয়েজ খাল থেকে বেরোলাম আমরা। আমার জাহাজ ইকান সিম্বাকের এটাই প্রথম সুয়েজ যাত্রা ছিলো, আর আমার ছিলো হয়তো পনের বিশের মাঝামাঝি কোন একটা সংখ্যা। জাহাজ বামদিকে ঘুরবে এখন, তারপর সোজা পশ্চিমমুখী যাত্রা জিব্রাল্টারের দিকে। একটু পরেই আমরা থাকবো আলেকজান্দ্রিয়া বরাবর। বাতিঘরটা এখন আর নেই, শুধু বন্দরটাই সচল। আমার খুব পরিচিত বন্দর আলেকজান্দ্রিয়া। জাহাজে উঠতে এসেছি, জাহাজ নিয়ে এসেছি এ আলেকজান্দ্রিয়ায়। ঘুরে ঘুরে দেখেছি এক সময়ের বিখ্যাত এ বন্দরটি।
ফারাওদের শেষ শাসক ক্লিওপেট্রা, পৃথিবীজয়ী আলেকজান্ডার দা গ্রেট আর মার্ক এন্টোনির অনেক গল্প আছে এ শহরকে নিয়ে।
থাক জনাব, ওসব বলা আমার কম্ম নয়, আমি এখন জাবাল তারিকের জিব্রাল্টারের দিকে জাহাজ ঘুরিয়েছি।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]