সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

আমরা সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষদের কখনও ফেলে যাইনা

আপাতত মিশরের উপকূল থেকে বেশ খানিকটা দূরেই আছি আমরা। উপকূল রেখা যেহেতু দেখা যাচ্ছেনা সুতরাং আমরা ভালোই দূরত্বে আছি। গ্লাসে হাত দিয়ে টের পেলাম বাইরের তাপমাত্রা আমাদের থেকে কম। জানালা খুলে দিতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা, বাতাসের গতিও বেশ।
ব্রীজে গিয়ে তথ্য উপাত্ত নিয়ে যা জানা গেলো, আমরা গ্রীসের ক্রিতি দ্বীপ থেকে আটান্ন নটিক্যাল মাইল আর লিবিয়ার উত্তর পূর্ব শাহহান থেকে বাহাত্তর নটিক্যাল মাইল দূরে আছি। তারমানে মিশর পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। বাতাসের তাপমাত্রা ২১° সেন্টিগ্রেড আর পানির তাপমাত্রা ১৯ এর একটু বেশী। বাতাসের গতিবেগ সাত কি আট নট, মৃদু হাওয়া যাকে বলে। উত্তরের শীতল ভাবটা এখনও কাটেনি এখানে, গ্রীষ্মের গরম এখনও বিরক্তিকর হয়নি এখানে। এমন তাপমাত্রা আর মিঠা হাওয়ার জন্যেই মেডিটেরিয়ান আমার খুব প্রিয়। চারদিকেনীলের আভা, কি সাগর কি আকাশ। মেঘ নেই বললেই চলে, রুমের জানালাটা খুলেই রেখেছি। অন্দরে বাহিরে সবকিছু এক হয়ে যাক, জলের ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজটাও পাওয়া যায় আমার কেবিনে। মন ভালো করার সব অনুষঙ্গ যেনো জলসাগর একসঙ্গে জড়ো করে রেখেছে।

গতকাল রাতে দেখেছিলাম আকাশে চাঁদ আরো উজ্জ্বল হচ্ছে, ধীরে ধীরে পূর্ণিমা জোছনার প্রস্তুতি ওর। হয়তো জিব্রাল্টারে পৌঁছাবো পূর্ণিমা রাতেই।তার আগে মাল্টা আর সিসিলির মাঝ দিয়ে যেতে হবে বহুদূর। দিন সাতেক লেগে যাবে তারিক ইবনে জিয়াদের পাহাড়ে পৌছতে। সপ্তম শতাব্দীতে তারিক ইবনে জিয়াদ এই ইউরোপের দরজার দখল নিয়েছিলো বলে তার নামেই এই পাহাড়, জেবেল তারিক, তা থেকেই আজকের নাম জিব্রাল্টার। ইসলামের দিগবিজয়ী গল্প যেখানে শুরু।

পথে পথে কত বন্দর পড়বে, ভিড়বে না আমাদের এ তরী। তিউনিস, আলজিয়ের্স, ওরান, মেলেইলা তারপরেই জিব্রাল্টার। আমরা এবারের যাত্রায় থামবোনা কোথাও, একেবারে জিব্রাল্টার গিয়ে জ্বালানি নিয়ে আবার আমেরিকার টেক্সাসের দিকে যাত্রা শুরু।

তবে মনে পড়ে যায় অনেক গল্প। একবার আলজিয়ের্স থেকে ডিসচার্জ শেষে জাহাজ সমুদ্রে বের হলে দু’দিন পরে পাওয়া গেলো একজন স্টোএওয়ে, মানে জাহাজে পালানো মানুষ। আফ্রিকার বন্দরে এলে জাহাজের চিপাচাপায় আফ্রিকানরা পালিয়ে থাকে, যদি ধরা না পড়ে তাহলে ইউরোপ আমেরিকার কোন এক বন্দরে নেমে যায় ওরা।

কিন্তু যেহেতু ধরা পড়েই গেছে সেহেতু আমাদের ওপর বেশ চাপ এলো ওপর থেকে। কেন জাহাজ ছেড়ে দেয়ার আগেই ভালোভাবে খুঁজে বের করা হলো না। আসলে যে মানুষদের উদ্দেশ্যই থাকে পালানোর তাদের আপনি ঠেকাবেন কী করে।
এমনকী এরা প্রপেলারের সঙ্গে লাগোয়া ট্রাঙ্কে, নোঙরের শেকল রাখার জায়গায়, ক্রেণের চিপায় আরও কতো জায়গায় যে পালিয়ে থাকে। যা হোক জাহাজের কিছু ঐতিহাসিক নিয়ম আছে, যেগুলো খুব মানবিক, মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণাকেও অবাক করে দেয়। এমন সব পালিয়ে আসা মানুষদের, কিংবা সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা কাউকে সর্বোচ্চ সহায়তা করার নিয়ম রয়েছে আমাদের।

তার খাবার, তার প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি সরবরাহ করা হবে। এবং তাকে দিয়ে কোন কাজও করানো যাবে না। তাকে যেদিন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, তার বাড়ী ফেরার জন্য টিকেট, টাকাপয়সা এবং সঙ্গে সিকিউরিটিও দিবে জাহাজ কোম্পানি। কোম্পানিগুলি এজন্যেই একটু বেজার হয়।
আর সঙ্গে বেড়ে যায় জাহাজের ইন্সুইরেন্স কাভারেজ মান্থলি পেমেন্ট। ব্যাপারগুলি কাপ্তানকেই সচেতনভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়।

যাহোক সে যাত্রায় বেটা বেকুব ধরা খেয়ে গেলো। তার পরিচয়পত্র চেক করে পাওয়া গেলো সে ক্যামেরুনের নাগরিক, যে দেশের নিজস্ব কোন সমুদ্র উপকূলই নেই। মজার ব্যাপার হলো এটাই তার প্রথম পালানো নয়, আরো তিনবার সে চেষ্টা করেছে এবং ধরা পড়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে এবার সে কয়েক প্যাকেট বিস্কুটও নিয়ে এসেছিলো। তাই খেয়ে দুদিন পার করেছে। কিন্তু প্রকৃতির ডাক তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। বোসন ক্রেণের আশেপাশে গিয়ে গন্ধের চোটে বুঝে ফেলছে কাম সারা।

জাহাজসুদ্ধ হৈচৈ। তারপর ওকে ধরে এনে প্রথমে করানো হলো গোসল, এরপর ভালো পোষাক পরিয়ে ছবিটবি তুলে রিপোর্টিং। পরের কয়েকদিন কাপ্তানের জীবন আসে আর যায়। আমরা ওর লগে ফান করি, এরপর কোথায় পালাবি কেমনে পালাবি তাই শিখাই। জাহাজের একমাত্র নারী অফিসার, থার্ড অফিসারকে তার বেশ পছন্দ হলো।
তার নাকি এমন একটা বউ থাকলে সে আর পালাইতো না। আমরা থার্ড অফিসারকে বললাম যদি সে রাজি থাকে তাহলে আমরা ক্যামেরুণের জামাই বাবু পাই।

সে ও বেশ মজা পেয়েছিলো, যতদূর দেখেছি ফিলিপিনো মেয়ে অফিসাররা বেশ স্মার্ট হয়। আমরা অবশ্য ভার্বাল এবিউজের নিয়মকানুন মেনেই এমনসব ফান করতাম। শেষমেশ যেহেতু জাহাজ আর্জেন্টিনায় যাচ্ছিলো, এবং আর্জেন্টিনা কর্তৃপক্ষ আগেই বিগ নো বলে দিয়েছিলো তাই জাহাজ থামাতে হলো। পিছনে যেতে হলো খানিকটা পথ, সেনেগালের উপকূলের কাছাকাছি,  তারপর সেনেগালীয় এজেন্ট তার বাহিনী নিয়ে ওকে নিয়ে গেলো। যাওয়ার সময় কাপ্তান সব খরচাপাতি আরও বেশকিছু ডলার দিয়ে বেচে গেলো সে যাত্রায়। যাবার বেলার তার মুখে বিজয়ের হাসি, আবার অন্তত একবার সে চেষ্টা করবে এটা নিশ্চিত।

আমরা সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষদের কখনও ফেলে যাইনা, যদিও এতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়, তবুও। ভূমধ্যসাগরে আজকাল রেসকিউ কল খুব বেশী। কাপ্তানরা খুব বিরক্ত। ছোট ছোট রাবারের নৌকায় করে শতশত মানুষ উন্নত ইউরোপে যেতে চায়। পালাতে চায় তাদের জীবন থেকে, একটু ভালো থাকা ভালো খাওয়ার জন্য।
যারা পৌঁছতে পারে তারা ভাগ্যবান, আর যারা পারেনা তারা কেউ জীবন দেয় আবার কেউবা জাহাজে উদ্ধার হয়ে আবার ফেরত যায়,
পরবর্তী চেষ্টার জন্য।

মিঠা হাওয়ায় ভেসে লবণ লবণ অভিজ্ঞতাও কম হলোনা। মাঝেমাঝে ভাবি একসময় ইউরোপিয়ানরা জীবন বাঁচাতে  এ সাগর পাড়ি দিয়ে আলজেরিয়ার ওরান আসতো। তারপর কাসাব্লাঙ্কা, সেখান থেকে নিরপেক্ষ লিসবন হয়ে আমেরিকা, স্বপ্নের আমেরিকা। এটা অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। জিউসরা তখন হিটলারের দাবড়ানি খেয়ে ফ্রান্সের মার্সেলি থেকে হাজারে হাজার পাড়ি দিতো এ সাগর। আজ গল্পটা উল্টো হয়ে গেছে। অন্ধকার থেকে আলোয় ছুটে বেড়ানো মানুষদের গল্প এখন।

লাঞ্চে টমেটো ভর্তা বেশ ভালোই লাগলো, কুক দিনদিন বাঙ্গালি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সীমান্তে এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাঙ্গালি হয়ে গেলে ওর আর দোষ কী। তবে টমেটো ভর্তায় ধনিয়া পাতা পর্যন্ত ঠিক ছিলো, তার হাতে অস্ত্র বেশী এসে গেছে পুদিনা পাতাও দিয়ে দিছে। গতকাল বিকেলে বানিয়েছিলো গরুর চামড়ার এক আইটেম। গরুর চামড়া রান্না হয় এটাই তো আমার জানা ছিলোনা, বন্ধু জানালো ক্লোসটরেল নাকি খুব বেশী, তাই আর বেশী খাইনি।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]