সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

আদার ব্যাপারীর সঙ্গে কেনো যে জাহাজের বৈরিতা হলো তা বোধহয় সবাইই বুঝবেন। কিন্তু একসময় আমিও আদার ব্যাপারীর মতোই ফলের ব্যবসায়ী বনে গিয়েছিলাম। তখন রেফার শীপে চাকরির সুবাদে নিজেকে কাঁচামালের ব্যবসায়ী মনে হতো।

পুরো আস্ত জাহাজ বড়সড় একটি ফ্রিজ, কল্পনা করুন পাঠক। যদিও হাজার হাজার টন ফলের পরিবহনে এই জাহাজ সমুদ্রে দ্রুতগতির সঙ্গে ইউরোপের চাহিদা মেটাতো।

চিলি, ইকুয়েডর, নিউজিল্যান্ড আর ফিলিপিন্স থেকে পুরো জাহাজ লোড করে ইউরোপের ইতালি, স্পেন, আর জার্মানিতে যেতে হতো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
কলা, কমলা, কিউই থেকে শুরু করে অ্যাভোগাডো সবই জাহাজে উঠতো। একবারতো জাম্বুরাও উঠলো পণ্য হিসেবে।

মজার ব্যাপার হলো যখন কার্গো লিস্টে গ্রেপফ্রুটের নাম আসলো তখন টেম্পারেচার অ্যাডজাস্ট করেছিলাম আঙ্গুরের জন্য, আর অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম হাজার টনের জাম্বুরা লোড হচ্ছে।
গ্রেপফ্রুট মানে যে জাম্বুরা জীবনে আর ভুলবো না। কিন্তু প্রশ্ন একটা রয়েই গেলো, এতো জাম্বুরা খায় কেডা?!!!

তখন ইউরোপের অলিগলিতে হেটে বেড়ানো অভ্যাস হয়ে যায়। আমাদের নিয়মিত গন্তব্য হয়ে যায় ইতালির লিভর্ণো, স্পেনের বিলবাও, পর্তুগালের লিসবাও।

লিভর্ণো আমার খুব মনে ধরতো, কাছেই ছিলো শহর, পায়েহাটা দুরত্ব। ওখানে গিয়ে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো বাঙালি সাইবার ক্যাফে আর ফোন ব্যবসায়ী বন্ধুটির সঙ্গে। শুধু কি তাই, হাটে মাঠে ঘাটে যেখানেই যাই সেখানেই বাঙালি।
প্রায়ই বাসে চড়ে চলে যেতাম পিসার হেলানো টাওয়ার দেখতে। টাওয়ার দেখতে যেতাম বললে ভুল হবে, আসলে ওখানে যেতাম বাঙালি আবহ পেতে।

পিসার হেলানো টাওয়ার ঘিরে যে চত্বরটি গড়ে উঠেছে সেখানে গেলে যে কারো ভ্রম হতে পারে যে সে হয়তো বাংলাদেশে চলে এসেছে।
আসল রহস্য বলি, চত্বরটি ঘিরে যে ২৪০ টি দোকান রয়েছে তার মালিকানা চারজন বাংলাদেশীর।
আর মোটামুটি সবগুলি দোকান ভাড়ায় পরিচালনা করে বাঙালিরাই। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখানে এসে এক অন্যরকম বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে।

আমি লন্ডন আর নিউইয়র্কের বাংলাদেশের গল্প শুনেছি কিন্তু পিসায় এসে এই রাজত্ব দেখে বিস্মিত হয়েছি বারবার।
পথে গোলাপ, পত্রিকা কিংবা ছাতা বিক্রি করতেও দেখেছি অসংখ্য পরিশ্রমী যুবককে।
তবে আমার ধারণা পৃথিবীতে যেসব দেশের মানুষ বাংলাদেশীদের নিঃশর্তে পছন্দ করে সেই লিস্টে ইতালী সবার উপরেই থাকবে।

রেফার শীপের গল্পেই ফিরি।
একবার কি মনে করে জাহাজের নরওয়েজিয়ান মালিক তার ছেলেকে জাহাজে পাঠিয়ে দিলো কাজকর্ম শেখানোর জন্যে।
ক্যাপ্টেন যখন তাকে ইঞ্জিন রুমে পাঠিয়ে দিলো তখন আমিতো তাকে দেখে থ্। হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে হেডফোন লাগিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে সে। আমি আর তাকে কি শেখাবো নিজেই শেখা শুরু করলাম। তার কথা হলো ইঞ্জিনের শব্দদূষনের থেকে মিউজিকের শব্দদুষনের মাত্রা অনেক কম আর কানের জন্য আরামপ্রদ।

আমি বাংলাদেশী শুনে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে অর্থনীতির আলোচনা।
বললো বাংলাদেশতো নরওয়ের খবরের কাগজের হেডলাইন, আমি ভাবি কয় কি। টেলিনর নামে ওদের দেশের এক কোম্পানি নাকি আমার দেশে বেশ বেকায়দায়, তাও আবার কর ফাকির অভিযোগ। ওরা নাকি ভাবতেও পারেনি নরওয়েজিয়ান কোম্পানি কর ফাকি দিতে পারে।
আমি মনে মনে ভাবি, সবই আবেশ, বাংলাদেশে গেলে পাগলেও সুখ খোজা শুরু করে আর টেলিনর তো এ যুগের ভার্চুয়াল ব্যাবসায়ী।

তবে যে জিনিসটা সহজেই ভুলবো না তা হলো নরওয়েজিয়ান রিসেট।
ব্যাপার হলো এই যে, “যাই ম্যালফাংশন করবে তাই ডাইরেক্ট বন্ধ করে দিবা তারপর আবার অন করবা” সব সমস্যার নাকি এইটাই সমাধান।
এবং এইটা ওরা খুব কনফিডেন্সের সঙ্গেই প্রাত্যহিক জীবনে প্র্যাকটিস করে, আর ফলাফলও নাকি অবিশ্বাস্য। সত্যিই নরওয়েজিয়ান রিসেট প্যাটেন্টের ওরাই দাবিদার।

সবশেষে সবাইকে রেফার শীপ থেকে শেখা কলা পাকানোর সহজ বুদ্ধি শেখানো যাক।
কাঁচা সবুজ কলাকে পলিথিনের ব্যাগের মধ্যে কয়েক টুকরো আপেলসহ রেখে দিলে দাগহীন হলুদ হয়ে পাকবে কলা আর স্বাদ হবে চিনিমিষ্টি।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]