সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

সিসিলির মাউন্ট ইটনা

জাহাজ নিয়ে ইউরোপ যাওয়া হয়নি অনেকদিন। আগে ইউরোপ মানেই আমার কাছে মনে হতো লিভর্ণো। ইতালীর রোমের কাছাকাছি এ বন্দরে আমার যাওয়া-আসা তখন প্রতিমাসে। দক্ষিণ অ্যামেরিকায় লোড করে পানামা ক্যানেল ক্রস করে অতলান্তিক পূবালী হাওয়ায়  ২২ নটিক্যাল মাইল গতিতে ৯ দিনে পৌছে যেতাম জিব্রাল্টার। জিব্রাল্টার থেকেই শুরু হতো ভূমধ্যসাগরের মিষ্টি হাওয়া। মিষ্টি হাওয়া মাঝে মাঝে দুষ্টুও হয়ে যেতো, তবুও সাগর হিসেবে ভূমধ্যসাগর আমার সবচেয়ে প্রিয়।

পিসার হেলানো টাওয়ার

মেডিটেরিনিয়ান সাগরের জলহাওয়া আমার খুব পরিচিত। মার্সেলি থেকে লিভর্ণো, ত্রিপলি থেকে আলেকজান্দ্রিয়া সব যেনো আমার প্রাণের শহর। মানুষগুলি বড় আপন আর মিশুক। এ সাগরের চারপাশের মেয়েরা দারুণ সুন্দরী, গায়ের রঙটা যেমন তেমনি উচ্চতা সঙ্গে আকর্ষণীয় চলনবলন। সিরিয়ার তারতুজে যেমন সুন্দরী দেখেছি তেমনি লেবাননেও দেখেছি রঙের ছটা। ইতালী আর ফ্রান্সের উপকূলেও মানুষ বেশ অভিজাতদর্শন হয়। আমার ধারণা এর জন্য ভূমধ্যসাগরীয় মিষ্টি হাওয়া আশেপাশের ভূপ্রকৃতির কৃতিত্ব রয়েছে।

লিভর্ণোর গপ্পটা খুব মজার। আমি সম্ভবত ইউরোপিয়ান এ বন্দরে দিনের হিসেবে সবচেয়ে বেশী থাকতাম। প্রতিবার জাহাজ নিয়ে আসলে তিন থেকে পাঁচদিন থাকা হতো। জাহাজিদের হিসেবে এটা বেশ ব্যতিক্রমী। শীপ যেখানে ঘন্টার হিসেবে বন্দরে থাকে আজকাল সেখানে এমন লম্বা সময় বন্দরে থাকলে অনেক ভালো লাগে। লিভর্ণো বন্দরে আমার কমন ডেস্টিনি ছিলো পিসার হেলানো টাওয়ার। সেদিনগুলিতে জাহাজে একাই বাংলাদেশী হওয়ায় বেশ খাতিরযত্ন পেতাম।

কাপ্তানসহ বাকি সিনিয়র অফিসাররা ছিলেন ইউক্রেনের, বাকি ক্রুরা ফিলিপিনো। আমি জাহাজের সেকেন্ড ইনজিনিয়ার, ইন্ডিয়ান সাবের একমাত্র প্রতিনিধি। জাহাজে মুসলিমও একমাত্র আমি, ইউক্রেনিয়ানরা অক্সফোর্ড আর ফিলিপিনোরা ক্যাথলিক ধর্মের। জাহাজে কবে ঈদ কবে কুরবানি টের পাইনা আমি। তবে আমার দু‘জন ক্যাডেট ছিলো জোয়ানা ও আন্না ক্যাটরিনা। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এরা মেয়ে। আমার জাহাজি জীবনের প্রথম ফিমেল শিক্ষার্থী। ওদের নিয়েই পুরো জাহাজ হৈচৈ সারাদিন।
ইউক্রেনের সহকর্মীরা সারাদিন তাদের জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে ছাত্রী দুজনকে পড়ায়।
আমি হাসি মিটিমিটি। কোন একটা কাজ দিলে ওদের চারপাশে সৈন্যসামন্তের অভাব হয়না।

সিসিলি দ্বীপ

এরই মাঝে একবার সিডিউল এলো জাহাজ লিভর্ণো ছেড়ে পূবমুখী যাবে। নেক্সট ডেস্টিনেশন রুমানিয়া, বুলগোরিয়া আর ইউক্রেনের ওদেসা। শুনে সবার চোখমুখে আনন্দের আভা, আসলে বিদেশী জাহাজ নিয়ে নিজের দেশে যাওয়ার আনন্দটা অন্যরকম, যদিও এই বান্দার সেই সুযোগটা কখনও হয়ে ওঠেনি। আমরা যাবো মেসিনা স্ট্রেইট হয়ে ইতালীর নিচ দিয়ে গ্রীসে। ওখান থেকে জাহাজের রসদপত্তর আর প্রয়োজনীয় স্পেয়ার নিয়ে রওয়ানা হবো দার্দেনালিসের দিকে।

তবে তার আগে আমার জীবনে দেখা সুন্দরতম একটি ঘটনা না বলে পারছি না। মেসিনা স্ট্রেইট হলো ইতালীর মূল ভূখন্ড আর সিসিলি দ্বীপের মাঝের চিপা রাস্তা। জাহাজ চলাচলের এ পথে বাতাসের গতি খুব বেশী থাকে। ঠিক নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনের মতো। বাতাসের শহর ওয়েলিংটন।  সাধারণত একদিকে খুব দ্রুত পার হওয়া গেলেও বিপরীত দিকে ধীরগতিতে চলতে হয়। মেসিনায় আমরা পৌছালাম সন্ধ্যার একটু পরে।
সিসিলি আমার কখনও যাওয়া হয়নি তাই বেশ কৌতুহলী মন নিয়ে দেখতে লাগলাম সিসিলি আর মেসিনা।

গডফাদারের স্বর্গরাজ্য হিসেবেই বেশী পরিচিত এ দ্বীপ। আমার মনে পরে গডফাদার মুভির কথা, যেই সিসিলিতে বসে পৃথিবীর অপরাধজগতটাকে নিয়ন্ত্রণ করতো। আজও মেডিটেরিনিয়ান শিপিং কর্পোরেশন মাফিয়া শিপিং নামেই পরিচিত। সিসিলি দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরো কতো নাম। প্রমিথিউস, এসিলিস, হারকিউলিস কতো কতো নাম।

দ্বীপের পাশ দিয়ে চলছিলাম খুব ধীরে, দেখছিলাম অন্ধকারের আলোকচ্ছটা। কি মনে করে কিয়েভের কাপ্তানসাহেব জাহাজ একটু ডানদিকে দ্বীপঘেষে নিচে নামালেন। একটু পরে বললেন সিসিলি দ্বীপের মাউন্ট ইটনা থেকে অগ্নুৎপাত হচ্ছে, এবং এটা লাইভ দেখার অপরচুনিটি তিনি মিস করতে চাননা।

সিসিলির মাউন্ট ইটনা

ইউক্রেনিয়ানরা আমার দেখা জাহাজিদের মধ্যে সবচেয়ে পাগল কিসিমের মনে হয়েছে।চীজ, ব্রেড, মোজারেল্লা আর ভদকা ছাড়া তাদের জীবন কল্পনা করা কষ্ট। তবে ইরানিয়ানদের মতো করে ভিনেগারে ডুবানো সব্জী আর সালাদও ওরা খায়। কথায় কথায় টাচউড বলে ক্রস মেরে কথা বলবেই। ধর্মকর্ম না করলেও অক্সফোর্ড গোত্রের মানুষগুলি খোদারে খুব ভয় পায়। তবে ওভারঅল এরা মোটামুটি তারছেড়া। কখন কি করবে বা বলবে বোঝা মুশকিল।

তো যেই কথা সেই কাজ, জাহাজ নিয়ে যাচ্ছেন মাউন্ট ইটনার কাছাকাছি সমুদ্র দিয়ে।
দূর থেকে দাড়িয়েই আমরা দেখছি আলোকচ্ছটা।  আগ্নেয়গিরি নিয়ে ছোটবেলায় পড়েছি, সংবাদে দেখেছি, কিন্তু নিজের চোখে আগুনের বিচ্ছুরণ, আলোকছটা দেখলাম সেদিন। মাউন্ট ইটনা দেখে মনে পরলো ভিসুভিয়াস আর পম্পেই নগরীর কথা । ইতালীতে বেশকিছু আগ্নেয়গিরি আছে, এর কয়েকটি আবার জীবন্ত।  এগুলির একটা এই মাউন্ট ইটনা।

সেদিনের সেই চোখে দেখা আজও চোখে লেগে আছে, আসলে কিয়েভের কাপ্তানসাহেবের একটু পাগলামির সুযোগে এমন অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। পরে অনেকবার তাকে ধন্যবাদ দিয়েছি। হাসিখুশী এ মানুষটি আমার দেখা খুব ভালোমনের একজন মানুষ ছিলেন।

ভিসুভিয়াস নিয়ে একটা কবিতা লিখেছি কিছুদিন আগে, যদিও একটু প্রেমপ্রেম তবে ভালোলাগাটাই অন্তর্নিহিত। গ্রীসের বন্দরে রসদপাতি নিয়ে এরপরে রওয়ানা হই পৃথিবীর আরেক আশ্চর্য জলপথ পাড়ি দিতে। যে পথের একপাশে ইউরোপ আরেকপাশে এশিয়া। পথের নাম দার্দেনালিস এরপরে বসফরাস। আর ইস্তান্বুলের নাম কে না শুনেছে, সেই পথেই পাড়ি দেবো মারমারা সাগর, যেতে হবে কৃষ্ণসাগর। পথ চলার সেই গল্প পরে বলছি, ছেলের PEC ইংরেজী পরীক্ষা শেষ। পোলারে এখন বুকে জড়িয়ে আদর করতে হবে। কৃষ্ণসাগরের গল্প অন্য কোনদিন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]