সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

 জাপান পুলিশ

যে সময়ের গল্প বলছি তখন আমি কেবল শিক্ষানবিস থেকে ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার প্রমোশন পেয়েছি।জাপানিজদের সঙ্গে চাকুরি শেষে পুরোপুরি বাংলাদেশী কম্প্লিমেন্টের জাহাজে জয়েন করেছি। হুটহাট বাইরে যেতে পারি। সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার একাডেমী সিনিয়র হওয়ায় আব্দার করলেই শোরলিভ পাওয়া যেতো।

একদিন জাপানের মিজুসিমা পোর্টে পৌঁছে বাইরে যাবো। আমি আর ফিটার গেলাম পারমিশন নিতে, সেকেন্ড স্যার বললো কোথায় যাবা এই সন্ধ্যাবেলা। আমরা বললাম একটু আরদিং করবো স্যার, বেশী দূর যাবো না, আপনিও চলেন। উনি বললেন তোমরাই যাও, আমি ফোন করতে যাবো।

আমি আর ফিটার দুইজন মিলে বাইরে যাচ্ছি, গেটে গিয়ে দেখি একটু কড়াকড়ি, হলুদ রঙের শোরপাস বের করলাম। জাপানে শীপ গেলেই হলুদ রঙ্গের একমাসের একটা শোরপাস দেয়া হয়। শোরপাস দেখিয়ে আউটবুকে একটা এন্ট্রি মারলাম, তারপর আমরা হাঁটা শুরু করলাম। পকেটে ডলার আছে কিন্তু ইয়েন আছে যৎসামান্য, তা দিয়ে ট্যাক্সি চড়া অকল্পনীয়। সুতরাং পায়ে হাঁটা হলো সর্বোত্তম। আমাদের আসলে কোন গন্তব্য নেই। জাপানে এটা আমাদের একটা কমন ব্যাপার, উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি।

হাঁটতে হাঁটতে বাড়ীঘর আবাসিক এলাকায় পৌঁছে গেছি। হঠাৎ চোখে পড়লো কমলার বাগান, একটা দু‘টা নয় প্রায় গোটা বিশেক কমলাগাছে ভরপুর কমলা। দেখে খুব লোভ হলো। জাপানে প্রায় সব বাসাবাড়িতে একটা দু‘টা কমলা গাছ থাকে, বিশেষ করে শহরতলী আর মফস্বল এলাকাগুলিতে। আমি আলী ভাইকে বললাম দেখছেন কতো সুন্দর কমলা, আমার মুখে দুষ্টু হাসি। সে তখন খুব সিরিয়াস, বলে স্যার না না, এই কাজ করা যাবে না। নির্ঘাত পুলিশে ধরবে। আমি বোকা বোকা ভাব নিয়ে বললাম কি কাজ? স্যার আপনি যাই বলেন কমলা চুরি করা যাবে না। আমি বললাম আচ্ছা চলেন পরে দেখা যাবে।

এরপর হাঁটতে হাঁটতে সেভেন ইলেভেন আর লসন স্টোর পেলাম। এগুলি পেট্রোল স্টেশন কাম সুপার শপের মিনি ভার্সন। আমার খুব প্রিয় একটা জিনিস পাওয়া যায় এ দোকানগুলিতে, জাপানিজ সফট রাইস কেক। দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় হাজার ইয়েন খরচ করলেই অনেক রাইস কেক পাওয়া যায়। এগুলি কিনে আমি আর আলী মিলে রাস্তার পাশের পার্কে গিয়ে বসলাম। বসে বসে কেক আর সফট ড্রিংকস খেলাম। এতো সফট কেক দুনিয়ার কোথাও আমি পাইনি, মুখে দেয়ামাত্র গলে যায় কেকের টুকরো, স্বাদেও অদ্বিতীয়। কেকপর্ব শেষে আবার জাপানিজ হাঁটাহাঁটি পর্ব শুরু। হাঁটছি আমরা উদ্দেশ্যহীন, কোন বাঁধা নেই, নেই কোন চিন্তা। সামনে এগিয়ে একটা বড় সুপারশপে ঢুঁ মারলাম, ইয়েন যেহেতু নাই ঘোরাঘুরিই সার। অবশ্য কেনাকাটা করার চিন্তাও করিনা, জাপানে সবকিছুই খুব এক্সপেনসিভ। তখন শুধুমাত্র ডলার শপগুলিতেই যা একটু যেতাম, ওখানে ১০০ ইয়েনে প্রতিটা জিনিস পাওয়া যেতো। এটা এক ধরণের মজার বিষয় ছিলো আমাদের জন্য। ১০০০ ইয়েন দিয়ে হয়তো দশটা আইটেম হয়ে যেতো। জিনিসপত্র সবই অবশ্য মেইড ইন চায়না হতো, তবে জাপানিজদের জন্য বানানো বলে গুণগত মান ভালোই হতো।

যাক এবার ফেরার পালা, আমি সেই একই পথধরে ফিরছি। আলী খালি আমারে অন্যপথে টানে। আমিও নাছোরবান্দা, ঐ রাস্তায়ই ফিরবো। শেষমেষ হাঁটতে হাঁটতেই বললো স্যার বেশী কিন্তু চুরি করা যাবে না, দুই চারটা নিয়েই ভাগবো আমি মনে মনে বললাম এইতো চান্দু লাইনে আসছো। মুখে বললাম আরে আপনে এতো ডরান কেন? দুই চারটা কমলা গাছ থেকে পেড়ে শখ মিটাবো, জীবনে কি কমলা পাড়ছি নাকি গাছ থেকে!!

আমার এই কমলা খাওয়ার থেকে দেখাটাই আনন্দের লাগলো, আমরা বাগান থেকে ভয়ে ভয়ে কয়টা নিয়ে তাড়াতাড়ি চললাম শীপের দিকে। তাড়াহুড়া করে পাতাপুতাসহ পলিথিনে নিয়ে গেটের কাছে চলে আসছি। এসে দেখি আরেক ঝামেলা। গেটে কেউ নেই, গেটও বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করেও কাউকে পেলাম না। মহাবিপদ, সেই উঁচু গেট, তারমধ্যে আবার শীতও কুহুকুহু টাইপ। আমরা শীতে কাঁপতেছি, কিন্তু কেউ আসেনা।
অনেকক্ষণ বসে থেকে আলীর দিকে তাকালাম আর একটা মিচকা হাসি দিলাম। সে বলে, না না স্যার গেট পার হওয়া যাবে না, এই গেট কেমনে পার হবেন, আর পার হওয়া ঠিকও হবে না। আলী আমার ব্যাপারগুলি খুব ভালো বুঝতো, ওর ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করা ছেলেপেলে সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা ছিলো। আমি অনেক ভেবে বললাম, তাহলে শীতেই তো মরা লাগবে, তার থেকে চলেন একটা ট্রাই মারি, কিচ্ছু হবেনা, আমি আছিনা!!

সে যাত্রায় কেমনে পার হয়েছিলাম সেটা ইতিহাস, বিশাল উচু গেট উইথ তারকাটা, আলী আর আমি টুপটাপ করে পার হয়ে সিধা জাহাজে। শীপে এসে চুপচাপ রুমে চলে গেলাম, দুটা রেখে বাকী কমলা দিয়ে দিলাম আলীকে।

এরপর হলো আসল কাহিনী, সকাল সকাল শীপে বেশ শোরগোল। আমরা তখন ইঞ্জিনরুমে মহাব্যস্ত। হঠাৎ ইঞ্জিনরুমে ফোন করে ক্যাপ্টেন আমাকে আর আলীকে উপরে শীপ অফিসে আসতে বললো। আমি মনে মনে দোয়াদরুদ পড়া শুরু করছি, আইজকে শেষ। আলী এরমধ্যে আরও ভয় বাড়ায়ে দিলো, আপনারে আগেই কইছিলাম কমলাগুলি চুরি না করতে। আমি ভয়ের চোটে দিলাম এক ঝাড়ি, আরে রাখেন আপনার কমলা, এখন জেলে নিলে কী হবে সেটা কন। আল্লাহর নাম লন বেশী বেশী।

শীপ অফিসে গিয়া তো হার্টফেইল করার দশা, ক্যাপ্টেন জিয়া স্যার আর গোটা চারেক পুলিশ বসে আছে। আমি তো পইড়া যাই যাই টাইপের ভাব। জিয়া স্যার দেখি হাসি হাসি মুখ, এইটুকুই ভরসা। সবচেয়ে যে সিনিয়র পুলিশ সেই বলা শুরু করলো, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার এন্ড ফিটার আলী, দিস ইজ আনবিলিভেবল দ্যাট ইউ ক্রসড আওয়ার সিকিউরিটি গেট। বাট হাও ইট ইজ পসিবল?!!!

এ কথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, যাক চুরি মামলা না। কেস অন্য, গেট পার হওয়া মামলা। এ মামলায় আমাগো পক্ষে যুক্তি আছে। আমরা তখন বেশ সাহস নিয়ে যুক্তি দিচ্ছি, বাইরে বসে বসে যখন মরে যাই যাই অবস্হা তখনই তো না পারতে গেট পার হলাম। এমন ভাব যেনো মইরা যাওয়ার চেয়ে গেট পার হওয়া উত্তম ভেবেই এই আকাম করছি।

সিকিউরিটি চীফ বললো, সেটা আসলে ব্যাপার না, আমরা এখানে আসছি তোমরা কেমনে গেট পার হইলা আর এটা ঠেকানোর উপায় কী  এটা নিয়ে তোমাদের এক্সপার্টিজ মতামত নেয়ার জন্য। ততক্ষণে হার্টবিট মোটামুটি নর্মাল হয়ে আসছে, আবার একটু ভাবও চলে আসছে, জাপানিজরা আমাদের এক্সপার্টিজ মতামত চায়। মনে মনে ভাবি চোরের আবার অভিজ্ঞ মতামত। আমাদের দুজনকে গেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, চারপাশে অসংখ্য বন্দর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, পুরো এলাহী ব্যাপার-স্যাপার।

যাই হোক এরপর যখন গেটে গেলাম, তখন আমাদের দু‘জনরে বলে আবার গেট পার হয়ে দেখাও। এইটা তো মুশকিল, আলী বললো স্যার আমারে দিয়া হবেনা আপনি পার হন। আমার হাত পা কাঁপতেছে, আমি ওর হাঁটুর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আসলেই কাঁপছে। কিন্তু মুশকিল হলো ঘটনা রিপিট করতে হবে, আলী প্রথম পার হবে, সে মাথায় বসবে তারপর আমি উঠবো। আলী তো আর পারেনা, ভয়ের চোটে হাত পা কাঁপে তার, কোথায় পা দেয়, কোথায় হাত দেয় তার ঠিকঠিকানা নাই। যাই হোক আমি অনেক বুঝিয়ে জাপানিজদের দেখালাম তাদের গেট কতটা সহজে পার হওয়া যায়। সিকিউরিটি কতোটা দুর্বল। এরপর তাদের বললাম গেটের কী কী চেঞ্জ করলে মানুষ তো ভালো বান্দরও পার হতে পারবে না।

পুরো ঘটনা একজন দেখলাম ভিডিও করলো, আরেকজন খালি নোটবুকে কী কী  লিখলো। আমি যা কই তা-ই যেনো ইম্পোরটেন্ট। এমন একটা ভাব সবচেয়ে বড়চোরের কাছ থেকে চুরি ঠেকানোর উপায় বের করছে এরা। সেদিন আর কোন ঝামেলা ছাড়াই ছাড়া পেলাম। শীপে ফিরতে ফিরতে আলী বললো, স্যার আপনার সঙ্গে আর জিন্দেগীতেও শোরে যামু না, এই কান ধরলাম। আপনি স্যার পুরাই একটা বিপদ। বুড়া হয়ে গেলাম কোনদিন বাংলাদেশের পুলিশেও ধরলো না, আর আপনার সঙ্গে গিয়ে কি ধরাটাই না পড়লাম। তাও জাপানি পুলিশের হাতে, বড়ই শরমের কথা।

এরপর আবারও আলী আমার সঙ্গে শোরে গেছে, নিশ্চিন্তেই গেছে, আর ধরাও খায় নাই সে। এরপর অন্য শীপ নিয়ে আমিও বহুবার জাপান গিয়েছি। আবারও পুলিশের সঙ্গে মস্করা করছি, দুইবার থানায় গেছি, কিন্তু আমারে বাইন্দা রাখার সাধ্যি কার। ছোটবেলায় ক্যাডেট কলেজ থেকে যেই পরিমাণ বান্দরামি শিখেছি সেইটা বাকি জীবনের জন্য কাফি হ্যায়।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]