সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

সমুদ্র জগতে ফিলিপিনোদের ডাকে মাংকি বলে

টুকটাক হাবিজাবি লিখবো এখন। হাতের কাছে খুব বেশী কাজও নেই, জাহাজ চলছে তার আপন গতিতে, নিচে গিয়ে ঘুরেফিরে সব যন্ত্রপাতি দেখি ঠিকঠাক চলছে কিনা, তারপর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে গল্পসল্প আড্ডা। সমস্যা হলো গল্প আড্ডা এখন ইংরেজি ভাষা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। দিনের যেটুকু বাংলা বলা বা লেখা সেটা ইন্টারনেটে বৌ- বাচ্চা আর বন্ধুদের ফোন দিয়ে যা কথা হয় এটুকুই। আমার ধারণা এতে করে আমার বাংলা শব্দভাণ্ডার বিপদগ্রস্ত।

জাহাজের ইন্টারনেট হলো এক মজার জিনিস। স্যাটকম ইন্টেলিয়ন কোম্পানির এই ইন্টারনেটের গতি বেশ ভালো। যদিও এটা আপেক্ষিক, কারণ সমুদ্রে বসে আমি ওয়াটস আপে, ইমোতে ভিডিও কল করতে পারছি এটা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। তবে চিপায় পড়লে যেটা হয় আরকি। আমাদের জাহাজ কোম্পানি দেখলাম ইন্টারনেটও মেপে মেপে ওজন করে দিচ্ছে। কাপ্তান সাব একটা চিরকুটে আমার আইডি পাসওয়ার্ড দিয়ে জানিয়ে দিলো প্রতিদিনের ব্যবহার সীমা ২০০ এমবি। এটা শুনে আমি তো অসুস্থ হওয়ার মতো অবস্থা, কী কয় এগুলি। ২০০ এমবিতে চায়ের পানিও ভালোভাবে গরম হয় না। মহা মুশকিলে পড়ে গেলুম।

বাড়ীতে যোগাযোগ নিয়ে ভীষন টেনশন শুরু হয়ে গেলো। এটা বলছি যখন বন্দরে ছিলাম তখনকার গপ্পো। তবে আমার খুব জ্ঞানী অতি জ্ঞানী ছেলেরে এ সমস্যাটা বলতেই বললো, এতো চিন্তা করো কেন বাবা? ওয়াটসআপ ইমোতে সারাদিন কথা বললেও ২০০ এমবি খরচ হবে না। আমি জিগ্যেস করলাম তুমি জানলে কেমনে। ও বললো আমি না জেনে কোন কথা কই না। আমি বিস্মিত এই জেনারেশনের জ্ঞান দেখে।

এরপরে নিজেই বসে গেলাম ফোনটাকে সাইজ রিসাইজ করতে। পোলায় এতো জানে, বাপে জানে না কিছুই, এটা চলতে পারেনা। ডাটা ইউজেস এর অপশনে গিয়ে একের পর এক বন্ধ করলাম অ্যাপস, ওয়াই ফাই চালু অবস্হায় এগুলো যেনো কোনভাবেই কিছু খেতে না পারে। এরপর গেলাম ওয়াই ফাই এডভান্সড সেটিং এ। ওখানে গিয়ে ওয়াই ফাই স্পিড মুডকে নরমাল থেকে করলাম এক্সট্রিম। এতে করে শিখলাম যে আমার হাতে যে এপটি চলবে সেটিই পাবে সব গতি, পিছনে থাকা অ্যাপগুলি পাবে শূণ্য এক্কে শূন্য। কতো কিছু যে শেখা বাকি ছিলো, হে আল্লাহ্।

দুনিয়ায় এতো জ্ঞান, আর আমি এগুলি জানতামই না। বসে বসে গ্রামীণফোনরে টাকা দিয়ে গেছি। এখন আমি কথা বললে নাকি বউয়ের মনে হয় আমি সামনে বসেই কথা বলছি। বাচ্চারা আমাকে ভিডিও কল দিয়ে ভেংচি কাটে, মন হচ্ছে ফিলিপিনোদের সঙ্গে আসার পরে আমাকে ওরা বান্দর মনে করছে। বাংলায় যেহেতু লিখছি তো বলেই ফেলি, সমুদ্র জগতে ফিলিপিনোদের সবাই ডাকে মাংকি বলে।আমি অবশ্য ওদের দুষ্ট বান্দর মনে করলেও ডাকি না।

অনেক ভেবে দেখলাম এই প্রতিদিন ২০০ এমবির চাপে না পরলে এতোকিছু কোনদিনও শিখতে পারতাম না। ও ফেসবুক লাইট, মেসেঞ্জারও লাইট, মানে হালকা করে নিয়েছি। উত্তরায় দেখলাম রেস্টুরেন্টের নাম চাপ সামলাও, আমি এবং আমরাও সমুদ্রে বসে এসব চাপ এভাবেই সামলাই। অনেক জাহাজে তো এখনও ইন্টারনেট ব্যবহার শুধুই অফিসিয়াল কাজেকর্মে সীমিত। কবে যে সমুদ্রে থাকা মানুষগুলিকে সবাই মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করবে তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন।

বাংলাদেশের জাহাজ কোম্পানিগুলিকেও বলবো, এবার একটু সমুদ্রে আপনার জাহাজ যে মানুষগুলি চালিয়ে ব্যবসাটা সচল রেখেছে তাদের কথা ভাবুন। তাদেরও পরিবার আছে, আছে বউ-বাচ্চা, বাবা-মা। যুগ তো পাল্টেছে, যখন পাল্টে গেছেই তখন এই নাদান পারিন্দাগুলিরেও একটু সুযোগ করে দেন। পঞ্চম সভ্যতার ইন্টারনেট যখন আপনাদের হাতে তখন এই নাবিকেরা একটু ইথার চায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্যে। স্যাটেলাইট ফোনবিল দিতে দিতে নাবিকেরা পেরেশান।

আমাদের জাহাজ কোম্পানি নাকি সাং রিলা হোটেলগুলিরও মালিক, সিংগাপুরে টাওয়ার টুওয়ার অনেক আছে। শ’ খানেক জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছে এই দুর্দিনেও। জাহাজের ক্রু অফিসার সবার আছে ইন্টারনেট প্যাক। কোন না কোনভাবে ম্যানেজ হয়ে যায় সবার। আলহামদুলিল্লাহ সৌভাগ্য আমার, লেখালেখিটা চালিয়ে নিতে পারছি। জাহাজ চলবে, আর নীল সমুদ্রের, আকাশভরা জোছনার, সমুদ্র গাঙচিলের, নীল তিমির, উরুক্কু মাছের ছবি দেবনা এটা কি হয়। নাবিকের মনটাকে বেঁধে ফেলে লাভ নেই, এ মন যে দিগন্ত দেখে অনেক অনেক দূরান্তে।

ছবি: নুসরাত নাহিদ

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]