সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

এক.

কখনো শীত কখনো গ্রীষ্ম, আসলে জাহাজ এত দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করে নেয় যে আবহাওয়া তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কতবার এমন হয়েছে ডেস্টিনেশনে পৌঁছে দেখি ড্রেসকোড মেলেনা। সবাই হাঁটে সোয়েটার, ব্লেজার পরে আর আমি কাঁপি ঠকঠক করে।উল্টা দুনিয়ার উল্টা মানুষ হলে যা হয় আর কী। তারপরেও পথেঘাটে এমন ঘটতে পারেই ধরে এগিয়ে যাই। কিন্তু সমুদ্র, সে তো বিস্ময়েরও বিস্ময়। সমুদ্রে কেমন থাকে আবহাওয়া?

বঙ্গোপসাগর

প্রায় প্রতিটি ভ্রমনপথেই সাগর থাকে উত্তাল। কখনও কখনও তো ঝড়ের গতি এতোই থাকে, মনে মনে ভয় পেয়ে যাই। আর তার সঙ্গে থাকে রোলিং পিচিং এর কষ্ট। নর্থ প্যাসিফিক আর বে অফ বিস্কের নাম শুনলে সত্যিই ভয় লাগে। জুনিয়র অবস্হায় আমার সী সিকনেস ছিলো খুব কমন সিনারিও। সবাই খায়দায়, গল্প করে আর আমি? বমি করি। হেলতে দুলতেই দিনশেষ। মাঝে মাঝে ফোনে যখন বলতাম মাথা ঘুরায় আর বমি হয় তখন নিজেও হাসতাম, এ তো মেয়েদের ব্যামো।

 

জাহাজে ঘুম ছিলো বড় কষ্টসাধ্য এক ব্যাপার।
দোলাদুলি আর আছাড় খেতেই ঘুম উধাও। আজকাল অবশ্য ঘটনা বিপরীত। দুললে ঘুম হয় বেশী বেশী।

আজ আমি পারফেক্ট সমুদ্রমানব, এসব রোলিং পিচিং, ঝড়ঝাপটা আমাকে খুব একটা
গাইগুই করতে পারেনা। আয়রন ম্যান ইন দা সল্টি ওয়াটার বলে কথা।

আসলে সাগর শীতকালেই বেশী উত্তাল থাকে, ব্যতিক্রম শুধু বে অফ বেংগল আর ইন্ডিয়ান ওশান (গরমে গরম!!!)। যতই চ্যালেজ্ঞিং হোক না কেন আমাদের প্রশিক্ষণ আর আল্লাহর রহমতে সাহসের সঙ্গেই সমুদ্রে পথ চলেছি যুগেরও অধিক।

সমুদ্রঝড় কতটা ভয়ংকর? আচ্ছা সব ঝড়ের নামকরণ মেয়েদের নামেই বা কেন করা হয়? আসলে প্রতিটি ঝড়েরই একটি করে নাম দেয়া হয়, আমার ধারণা নাম দেয়ার কাজটি আমরা পুরুষেরা করি বলেই হয়তো ভয়ংকর কিছুর দায়টা মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেয়ার এই চেষ্টা।

বে অফ বিস্কে আর উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর উত্তরের শীতে বেশ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তবে সমুদ্রের কোনো অংশকেই নাদান ভাবা ঠিক হবেনা পাঠক, যেকোনো সময় এর ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতাই ওকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিং

বে অফ বিস্কে ফ্রান্সের কোলে বসে জাহাজগুলিকে দাবড়িয়ে বেড়ায়। ফাদেল আরাব নামের এক জাহাজ নিয়ে তিনদিন এ সাগরে হারিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা আজও ভুলিনি। শীপ সামনে না এগিয়ে এক জায়গায়ই খাবি খাচ্ছিলো। এমনকি রেড সীও মরুঝড়ের প্রভাবে কখনও কখনও বেসামাল হয়ে পড়ে, একবার জাহাজ নিয়ে ওর মধ্যেই বালুঝড়ে ৪ দিন ভেসে ছিলাম জেদ্দায় ভীড়বো বলে।
জাহাজের ডেক পুরু বালুতে ঢাকা পড়েছিলো। মনে হলো পুরো মরুভূমি উড়ে এসে জাহাজে জুড়ে বসেছে। আমরা জাহাজের ডেকে যেতে পারিনি অনেকদিন, শুধু বালুর ঝড়, এসির এয়ারফিল্টার তো পুরু বালুতে ভরে যায় দুপুর না পেরোতেই।

আরেকবার জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সাগরে ভেসে বেড়িয়েছি ৭ দিন, ঝড়ের মাঝেও ভেসে বেড়ানো, যেকোন সময় জলসমাধির ভয় নিয়ে ভেসে বেড়ানো, পালতোলা নৌকার থেকেও অসহায় আমরা, সে গল্প নাহয় অন্য কোনোদিন।

আরেক আপদ হলো দক্ষিণ চীন সাগর। দক্ষিণ চীন সাগর আবার সবসময়েই উথাল পাথাল থাকে।
এ কারনেই হয়তো চীনাদের বিশ্বাসে ড্রাগনরাজ খাবি খায়। ওরা স্বপ্নেও ড্রাগন দেখে ভয় পায় বলে আমার বিশ্বাস। তাইওয়ানের লুজন স্ট্রেইট থেকে শুরু হয় এ দোলাদুলি।

তবে আমার সবচেয়ে পরিচিত সমুদ্র প্যাসিফিকের নর্দান অংশ। জীবনে বেশী পাড়ি দেয়া সমুদ্রপথ জাপান থেকে উত্তর আমেরিকা। উইন্টারে যদি কেউ এ সাগর পাড়ি দেয় তাহলে এর নাম প্রশান্ত কেমন বেমানান মনে হয় তার, আসলে হওয়া উচিত অশান্ত মহাসাগর। যদিও গ্রীষ্মে এ সাগরের জল পুকুরের মতোই টলমল।

নর্থ প্যাসিফিক পাড়ি দিতে গিয়ে একবার চারটি ক্যাটাগরি ৪ হারিকেনের মুখোমুখি হয়েছি। কতোবার পথ বদলেছি তার ইয়াত্তা নেই। পালাতে পালাতে আলাস্কার কোলের ভিতরে ঢুকে গিয়েও শান্তি পাইনি, টাইফুন ঘুরে গিয়ে শীপের পিছু নিয়েছে, আমরাও পালিয়েছি।

উত্তাল সাগর

এলিউশিয়ানের পিছনে ঢুকে বেরিং প্রণালীর কাছাকাছি গিয়ে আবার যখন নিচে উঁকি মেরেছি, ঝড়ের সেই ধাওয়া খেয়ে পিছে গিয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম জাহাজ নিয়ে। আইল্যান্ডের আড়ালে সেফ ড্রিফটিং করে কোনমতে ঝড় পার করে তবেই জাপান যাত্রা।

সমুদ্রঝড় আজকাল ভাস্কো দা গামা, ম্যাগেলান কিংবা সিনবাদ যুগের মতো করে জাহাজ মাস্তুল ভেঙ্গে দেয়না, সেই কাঠের জাহাজ তো বিলুপ্তপ্রায়,
ইউনেস্কো হয়তো খুঁজবে আর কিছুদিন পর।
কাঠের জাহাজ এখন শুধুই মেরিটাইম মিউজিয়ামগুলির সৌন্দর্যববর্ধন করছে।

সমুদ্রঝড়, যার অধিকসংখ্যক সৃষ্টি আর বিনাশ সমুদ্রেই। দু’ একটা ভুল করে লোকালয়ে চলে আসে, আর তার ক্ষমতা আমরা ছাড়া আর কেইবা জানে। আজকাল ঝড়ের পূর্বাভাষ ২/৪ দিন আগেই হাতে চলে আসে, জাহাজের ক্যাপ্টেন এখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন “ঝড়ে পড়েছি, এনজয়ইং ঝড়”। অকস্মাৎ কেউ ঝড়ের সঙ্গে সেলফি নিয়ে হাজির হলে অবাক হবোনা, প্রযুক্তি তুমি আমারে করেছো অনুভূতিহীন।

সমুদ্রতীরে ঢেউ দেখে যতটা আনন্দ সমুদ্রে ভেসে ভেসে ঢেউ দেখা ততটাই বিপরীত। এই বুড়া বয়সেও দু একবার চুপিচুপি যে বমি করিনা তা কিন্তু না। এডভেঞ্চারের ফ্যাসিনেশন মাথার মধ্যে তালগোল পেকে যায়।(চলবে)

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]