সম্প্রীতির কবিতা,সমন্বয়ের গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

প্রাণের বাংলায় ‘দূরের হাওয়া’ কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন উর্মি রহমান। একদা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত উর্মি রহমান ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। যুক্ত রয়েছেন নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মোর্চায়। দূরের হাওয়া মানেই তো দূর পৃথিবীর গন্ধ। অন্য দেশ, অন্য মানুষ, অন্য সংস্কৃতি। কিন্তু মানুষ তো একই সেই রক্তমাংসে। সমাজ, মানুষ, আন্দোলন আর জীবনের কথাই তিনি লিখবেন প্রাণের বাংলার পৃষ্ঠায়।

বছর তিনেক আগে দক্ষিণ কলকাতার কিছু মানুষ বাংলা নববর্ষের দিন মঙ্গলশোভাযাত্রা আয়োজনের কথা ভাবে। তার আগে কলকাতায় বসে টেরই পেতাম না দিনটা বাংলা বছরের প্রথম দিন। তবে পহেলা বৈশাখের দিন অনেকেই বাড়িতে বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু কোন কোন বাড়িতে দেখেছি সেটা বাঙালি খাবার নয়। অনেকেই পোলাও-মাংস ইত্যাদি খায়। মনটা সেদিন খারাপ হয়ে থাকে যখন বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ মঙ্গলশোভাযাত্রা আয়োজনের কথা ভাবে, তখন  আমাকে ওদের সঙ্গে থাকার জন্য আহ্বান জানায়। সম্ভবতঃ আমি কলকাতায় ওদের চেনা একমাত্র বাংলাদেশী ছিলাম। মঙ্গলশোভাযাত্রা তো বাংলাদেশেই শুরু হয়েছিলো এবং অনেক বছর ধরে হচ্ছে। ইউনেস্কো তার স্বীকৃতিও দিয়েছে। আমি ওদের প্রথম সভায় গেলাম। তখন  প্রায় কাউকে চিনতাম না। পরে ওদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো। ওরা হয়ে দাঁড়াল আমার একান্ত আপনজন। আমি ওদের ভালবাসায় আপ্লুত হলাম। শুরু থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিলো, আমাদের মূলমন্ত্র হবে সম্প্রীতি, সমন্বয় আর আমরা সেই সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরবো।

এবারের অনুষ্ঠানের থিম্ সেকথাকেই মনে রেখেই করা হয়েছে – সম্প্রীতির কবিতা, সমন্বয়ের গান। দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া অঞ্চলে একটি সুইমিং ক্লাব আছে। সেখানে দু’টি বেশ ভাল সুইমিং পুল আছে, অনেক মানুষ সাঁতার শিখতে ও সাঁতার কাটতে আসে, যাদের মধ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েও আছে। সেখানে একটা বড় ঘর আছে। তাছাড়া বেশ বড় একটা খোলা জায়গা মানে উঠোন আছে। আর সেখানেই আয়োজন করা হয়েছিলো এই অনুষ্ঠানের, দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা অব্দি। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো কবিদের। টেবিল পাতা ছিলো, যেখানে বই ও লিটল্ ম্যাগাজিন ছড়ানো ছিলো। যেসব লিটল্ ম্যাগাজিন বা ছোট পত্রিকা অ্ংশ নেয় তার মধ্যে ছিলো সাঁকো, অতন্দ্রপথ, যুগসাগ্নিক, জোড়াসাঁকো, নান্দীমুখ, গঙ্গানন্দিনী, শুভাবরী, পদার্পণ, বিকল্প নির্মাণ ও আরো কিছু পত্রিকা। আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রার একজন মুখ্য সদস্য অভিজিত চন্দের বইওউড়ো চিঠি বেরিয়েছে সদ্য। সেগুলোও ছিলো সেখানে।    

সেদিন দর্শক সংখ্যাও কম ছিলো না। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অব্দি অনেকেই বসে কবিতা ও গান শুনেছেন। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন বর্ষীয়ান কবি কেষ্ট চট্টোপাধ্যায়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, কলকাতা গ্রুপের মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে আমাকেও দু’চার কথা বলতে হলো। আমার বলা শেষ হলে কেষ্ট চট্টোপাধ্যায় আমার পরিমিতিবোধের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। তাঁকে বলা হলো না, আমি বলতে চাই-ই না। কিন্তু সেটাই আমাকে করতে হয়। সুতরাং যত কম বলা যায়, ততো ভাল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রোতা-দর্শকরাও তাতে খুশি হন। এরপর শুরু হয় কবিতা পাঠ। প্রায় এক’শজনের মতো কবি ছিলেন। তার মধ্যে অনেক নারী কবিও ছিলেন অনেক। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন লিপিকা চট্টোপাধ্যায় এবং বরুণ চক্রবর্তী। এঁরা দু’জনও কবি। আর যাঁরা স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন, তাঁরা হলেন শর্মিষ্ঠা মাঝি, অচিন্ত্য সুরাল, নাসরিন নাজমা, বৈজয়ন্ত রাহা, শংকর পাল, রাজিনা খাতুন প্রমুখ।

সবশেষে ছিলো ধামাইল গান ও নাচ। কলকাতায় সিলেটের অনেক আদি অধিবাসী বাস করেন। আপনারা হয়তো জানেন এখানে খুব বড় করে সিলেট সম্মেলন হয়। এই গ্রুপটা আমাদের সঙ্গে আছে। শ্রীভূমি নামে এই সংগঠন ধামাইল গান ও নাচ নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। সেদিনের অনুষ্ঠানেও অংশ নিলো। ধামাইল গান তো ছিলোই। সেই সঙ্গে ছিলো নাচ। কিশো্রী মেয়েদের সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিলো, কলকাতার সদস্যদের মধ্যে সোমা, শর্মিতা, সুবর্ণা, স্বাগতা, দীপক। সব মিলিয়ে সেটি ছিলো একটি আনন্দময় উপস্থাপনা এবং সকলেই সেই কবিতার ছন্দ ও সুরের মায়া উপভোগ করেছেন। ঢাকুরিয়া সুইমিং ক্লাব প্রাঙ্গণ জমজমাট হয়ে উঠেছিলো।

ঘটনাচক্রে সেদিনটি ছিলো স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তী। যদিও আমাদের অনুষ্ঠানের মূল সুরের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না, কিন্তু কবিদের অনেকেই সম্প্রীতির কবিতা কথাটা ভুলে গিয়ে তাঁকে উদ্দেশ্য করেই কবিতা পাঠ করেন। পরে আমাদের সংগঠনের যে মূলমন্ত্র, তার সঙ্গে মিল রেখে যাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করলাম, সেই মাস্টারদা সূ্র্য সেনকে স্মরণ করলাম। ওই দিনটি ছিলো তাঁর প্রয়াণ দিবস। উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান মঙ্গল শোভাযাত্রা, কলকাতার সভাপতি সাগর চৌধুরী। তিনি তাঁর স্বরচিত কবিতা দিয়েই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানলেন।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]