সময়কে ধরে রাখি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফারুক জি আযম। রংপুরের মানুষ। থাকেন ঢাকায়। একটি বেসরকারি কোম্পানীতে কাজ করেন চিফ অফ কর্পোরেট পলিসি হিসেবে। প্রধান শখ ছবি তোলা, বই পড়া এবং উনার ভাষায় ‘সামান্য’ লেখালেখি করা।  ফারুক জি আযমের ব্যক্তিগত লক্ষ্য হলো সময়কে ধরে রাখা। ছবির মাধ্যমে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের যে আবেগ বা একটি ছবির বিষয়বস্তুর পারিপার্শ্বিক যে আবেদন সেটা তুলে ধরতে চান।

ফারুক জি আযম

এক. 

সেই সাতসকালে ঘুম ভেঙে গিয়েছে একটা ছোট্ট স্বপ্ন দেখে। দেখলাম আমি বিলের হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে আছি। আমার কিছুটা সামনেই একটা সাদা শাপলা হাওয়ায় খুব সামান্য করে দুলছে। পানিতে অনেক জলজ উদ্ভিদজাতীয় লতা, গুল্ম ইত্যাদি থাকায় কালো দেখাচ্ছে। স্বচ্ছ পানি। ঠিক তখন আমার হাঁটুর পাশ দিয়ে একটা জলঢোঁড়া সাপ এঁকেবেঁকে চলে গেলো। এটা আসলে স্বপ্নও নয়, আমার ছেলেবেলায় এমন ঘটনা ঘটেছিলো।

আমি চরের মানুষ না হলেও চর আমার পছন্দ। আমি চরে যেতে পছন্দ করি। চরের মানুষের সঙ্গে কথা বলাও আমার পছন্দের। এরকম এক চরে আমি এক রূপসী রমণীকে দেখেছিলাম। কাঁখে পেতলের কলসি আর একহাতে তার চার বছরের ছেলের হাত ধরে সেই রমণী সদ্য কেটে নেয়া ধানের ক্ষেত ধরে যাচ্ছিলেন কোথাও থেকে পানি নিয়ে আসতে। আমিও সেই রমণীর পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। কিছুদূর গেলে পর একটা বাঁশের সাঁকো। তিনি সেটি পার হয়ে গেলেন অনায়াসে। শিশুটি এপারে দাঁড়িয়ে রইলো। মুশকিল হলো আমার। পায়ে শক্ত বুট থাকা সত্বেও আমি সেটি আর পার হতে পারি না। আমি ধীরে ধীরে এগুচ্ছি যখন তখন একটা দৃশ্য আমার দেখতে পাই। এক যুবক দেখি নির্নিমেষ দৃষ্টিতে সেই রমণীকে দেখছে। সেই চোখে নিষ্কাম প্রেম ছাড়া আর কিছু ছিলো না। এই দৃষ্টি আমার চেনা।

একটা ম্যুভি দেখেছিলাম বেশ আগে। ‘Tess’ নামে। রোমান পোলানস্কি’র ছবি। সিনেমাটি তিনি বানিয়েছিলেন Thomas Hardy’র ১৮৯১ সালে রচিত উপন্যাস ‘Tess of the d’Urbervilles’ অবলম্বনে। সিনেমায় আমরা টেস নামে যে মেয়েটিকে দেখি সে অত্যন্ত রূপসী। মাতাল বাবা সংসার চালাতে পারে না। বড় মেয়ে হিসেবে তাই টেস নানা জায়গায় যায় কাজের অন্বেষণে। তখন ইংলন্ডে ভূস্বামীর অধীনে থেকে কাজ করার সময় ছিলো। এরকম এক ভূস্বামীর অধীনে কাজ করার সময় সেই ভূস্বামীর ছেলে মিস্টার ক্লেয়ার আমাদের এই টেস’র প্রেমে পড়ে। একদিন বনের ভেতর দিয়ে টেস এবং তার মতো আরও তিনজন রমনী যারা এই ভূস্বামীর অধীনে কাজ করে তারা যাচ্ছিলো। যাওয়ার সময় তারা বিপদে পড়ে। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে পানি জমে গিয়েছে। রাস্তাটি একটা খাঁদের মতো যার দুপাশ উঁচু আর তাতে বনবাদাড়। তারা যখন এই রাস্তা পার হবে কীভাবে ভাবছিলো তখন সেখানে মিস্টার ক্লেয়ার’র আবির্ভাব ঘটে। তিনি এই সমস্যার সমাধান দেবার জন্য রমণীদের কোলে করে পার করবার প্রস্তাব দেন। রমণীরা অত্যন্ত পুলকিত হয় এ প্রস্তাবে একারণে যে তারা মনে মনে মিস্টার ক্লেয়ার কে পছন্দ করতো। একমাত্র টেস এমন সমাধানে সায় দিচ্ছিলো না। যাই হোক, অন্য রমণীদের সম্মতির পর মিস্টার ক্লেয়ার কোলে করে একে একে রমণীদের পার করে দিচ্ছিলেন। শেষে এলো টেস’র পালা। সে তখনও দ্বিধা করছে দেখে মিস্টার ক্লেয়ার আকুতি নিয়ে বললেন, ‘Tess, I have gone to three quarters of this trouble for your sake alone.’ এরপর টেস মিস্টার ক্লেয়ার’র কোলে চড়ে ঐ জায়গাটুকু পার হলো।

একজন নারী একজন পুরুষকে যে চোখে দেখে, একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে সে চোখে দেখে না। একইরকম ভাবে একজন পুরুষ একজন নারীকে যে চোখে দেখে, একজন নারী আরেকজন নারীকে সে চোখে দেখে না। বোধচালিত এই অনুভূতি চিরন্তন। ভালোবাসা বা প্রেম যাই বলি না কেন সেটা মস্তিষ্কপ্রসূত। মস্তিষ্কে প্রেম যেমন আসে তেমনই আসে কবিতাও। সেই কবিতা কেউ প্রকাশ করে লিখে আবার কেউ বা মাথায় নিয়ে ঘোরে।

সূর্যটাও আজ দারুণ রুদ্ররোষে

উঠলো কপালে তোমায় ভালোবেসে।

এই ছবিটি সুবর্ণচরে গিয়ে তুলেছিলাম। কেন যে আমার কিছু ছবি আমার নিজের কাছেই ভালো লাগে জানি না।

দুই.

সময় আসলে কী? আমরা জানি যে একটা সময় ছিলো যখন আসলে সময় ছিলো না। সময়ের শুরু মহাবিস্ফোরণ থেকে। তারপর থেকে ক্রমপ্রসারমান বিশ্বের সাথে সময় এগিয়ে চলছে। অথবা বলা যায় সময় এগিয়ে চলছে বলেই বিশ্বের এই ক্রমপ্রসারমান অবস্থা। অথবা যে কল্পনাতীত শক্তির জন্ম হয়েছিলো মহাবিস্ফোরণ থেকে, সেটাই যুগপৎ সময় ও শক্তির উৎস। নিজের মতো করে বললাম, আরও সহজ করে কেউ বুঝিয়ে বললে কৃতার্থ হবো।

সময় অপ্রতিরোধ্য। তাকে আটকানো যায় না। কিন্তু শক্তির ক্ষয় আছে। মানে শক্তি একদিন শেষ হয়ে যাবে এটা নিশ্চিত বলা যায়। তাহলে শক্তি যেদিন শেষ হয়ে যাবে, সেদিন কী সময়েরও পরিসমাপ্তি ঘটবে? এই প্রশ্নের উত্তর পদার্থবিদেরা ভালো দিতে পারবেন। আমি সামান্য একজন ছবি তুলিয়ে মাত্র। কিন্তু একটা জায়গা আমার জন্য বেশ আনন্দের, অন্য ছবি তুলিয়েদেরও হয়তো তাই, আমি একটা মুহূর্তকে ফ্রেমে আটকে ফেলতে পারি। কোটি কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে নক্ষত্রের যে আলো আমার চোখের রেটিনা ভেদ করে মস্তিষ্কের চিরঅন্ধকার কুঠুরিতে প্রবেশ করে, তার সাথে সাথে সেই আলোই আমাকে দেখতে সাহায্য করে আমার লেন্সের ভেতর দিয়ে আমি যেদিকে তাকাই।

আমার নিজের তেমন ছবি নেই। আমি মনে করি, আমি যে ছবিগুলি তুলি, তার ভেতরে আমিও থাকি। এই গাঙচিলটিকে আমি যখন দেখছিলাম, তার একটু আগে সেও আমাকে দেখছিলো। তার চোখের মণিতে আমার প্রতিবিম্ব স্থায়ীরূপ নিতে না নিতেই আমি তাকে ধরে ফেলেছিলাম।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]