সময় ফুরায় না…

‘আমার দিন ফুরালো’। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা।শীতের বেলা ফুরিয়ে আসে। আলো কমে আসে বিকেলবেলা। কেমন একটা আবছায়া নেমে আসে চারপাশে। কুয়াশার হালকা চাদর ছড়িয়ে যায়। তখন ক্যালেন্ডারের পাতার দিকেচোখ রেখে চমকে উঠতে হয়! এই তো একটা নতুন বছরের সূচনা হয়েছিলো আর কত দ্রুত পৌঁছে এলাম একেবারে অন্তিমে। এই লেখা প্রকাশিত হচ্ছে বছরের একেবারে শেষে। বছরটা ফুরিয়ে ফেলতে হাতে থাকবে কিছু ঘন্টা আর মিনিট। দুই শীতের মাঝখানে কত ঘটনা, কত যোগ আর বিসর্জন;তিন’শ পয়ষট্টি দিনের নৌকা একটা ঘাট থেকে ছেড়ে চলে যাবে অন্য আরেক ঘাটে। অতিক্রান্ত সময়টা ছিলো অসুখে ক্ষত বিক্ষত, মৃত্যুতে ছাপানো, সংকটে অস্থির আর আশায় উদ্দাম। একেকটা সময় বোধ করি এরকমই হয়। সময়ের চলার একটা নিজস্ব গতি আছে। সেই গতির ধাক্কায় বহু ঘটন-অঘটন শেষে এসে এক কিনারায় দাঁড়ায়। নতুন একটি বছরের সংখ্যায় আমরা সেই সময়কে চিহ্নিত করি। কিন্তু সময় তোসেই একই গতিতে প্রবাহমান।

ডিসেম্বর মাস ফুরিয়ে গেলো। ২০২১ সালের পরিবর্তে আমরা লিখবো ২০২২ সাল। আরও একটা বছর পৃথিবীর বুকে কাটিয়ে ফেললাম! চারিদিকে এত মৃত্যুর হাতছানি, অনিশ্চয়তার বেড়াজাল টপকে আরেকটি নতুন ক্যালেন্ডারের ঘেরাটোপে নিজেকে আটক করা! আবার নতুন করে সব প্রতিবন্ধকতা টপকে চলার সূচনা করা।

এই সংখ্যায় প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে বছর ফুরানো শেষ সংখ্যায় রইলো ‘সময় ফুরায় না’।

অতিমারির ক্ষত সারেনি এখনও। গত এক বছরে হাসপাতালগুলো মানুষের মৃত্যু গুনেছে। চিকিৎসকরা জীবন রক্ষার জন্য কোমর বেঁধে লড়েছেন। মানুষও আশায় বুক বেঁধে সাহস নিয়ে লড়াই করেছে অচেনা এক অসুখের বিরুদ্ধে। বছরটাকে কোভিড-১৯ রোগের প্রতি উৎসর্গ করা উচিত না জীবনের প্রতি? প্রাণ ফুরিয়ে যাওয়াকে সমর্থন করে না। যতক্ষণ বুকের মধ্যে ধুকপুক আছে ততক্ষণ আশা আছে। আমাদের এই পোড়া দেশে সামর্থের খামতি আছে, অর্থের টানাটানি আছে, কিন্তু আশার শেষ নেই। সেই এক আশা! সে বাঁচে। সে বাঁচায়।তাই বোধ হয় অসুখের পরিবর্তে জীবনের উদ্দেশ্যে সময়টাকে উৎসর্গ করা উচিত।

বছরের শুরুতে কোভিড-১৯ রোগের প্রতাপ ছিলো। মুখ ঢাকা মাস্কের দিন আমাদের তখনও ফুরায়নি। কিন্তুসব ভয় আর উৎকন্ঠাকে এক পাশে ঠেলে মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিলো। আশা ভেঙেছে, ঘর ভেঙেছে, প্রিয়জনের মৃত্যু ছন্নছাড়া করে দিয়েছে মনের গভীর। তবুও মানুষ পেছন ফিরে তাকাতে চায়নি। তাদের তো সামনে এগিয়ে চলতে হবে।

২০২১ সালে কোভিড-১৯ রোগের টিকা দিতে উৎসাহিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। প্রচুর সংখ্যক মানুষ মাস্ক পরেননি, আবার বহু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনেও চলেছেন। দেশজুড়ে দুর্নীতি হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিকুল অর্থনৈতিক অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন প্রাণপনে। আবার কিছু মানুষ গা ভাসিয়ে দিয়েছে অপকর্মেও।রাজনীতির মাঠে এক ধরণের শূন্যতা প্রতিবাদের মুষ্ঠিকে পেছনে টেনে ধরেছে। তবুও সময় এগিয়ে চলেছে। ২০২১ সালে আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করেছি।

এবার শীত এখনও তেমন তার সংসার ছড়িয়ে বসেনি এই জনপদে। তবুও পথে বের হলে মানুষকে দেখা গেছে ঝকঝকে কোনো আউটলেটে অথবা পথের পাশে ভ্যান গাড়িতে শীতের কাপড় কেনাকাটায় ব্যস্ত হতে। বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রও করা সম্ভব হয়নি তেমন ভাবে। শীতের সূচনায় সবজির বাজারও ছিলো উত্তপ্ত। কিন্তু তবুও সতেজ শাক অথবা সামান্য সবজিতে সন্তুষ্ঠ হয়েছে মানুষ। সাধারণ মানুষ বড় অল্প প্রপ্তিতেই সন্তুষ্ট হয়। সংসার নিয়ে সামান্য খেয়েপড়ে বাঁচার অভ্যাস তাদের।দিন ফুরিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারলেই তাদের আনন্দ।

হয়তো নতুন ঘটনাপ্রবাহের মুখোমুখি হতে চলেছি আমরা। এরই নাম ভবিষ্যত। সব নিশ্চিত করে জানা নেই কারুর। অনাগত সময়কে কে চিত্রিত করতে পেরেছে? তবুও আমরা এগিয়ে যাব। প্রতিকূলতাকে জয় করবো, জীবনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখবো। তাই বছরের অন্তে এসে বলাই যায়-আশার জয় হোক।হয়তো দিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু সময় ফুরায় না।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
ছবিঃ গুগল।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box