সহজ মানুষের গান…

রবিশঙ্কর মৈত্রী

শেষ প্রহরের আরোহণ অবরোহণ
প্রসাদদা বললেন, `আরেকবার আপনার গমন ভ্রমণ আরোহণ অবরোহণগুলো বলুন রবিদা।‘
আমরা তখন নতুন বন্ধু। সম্বোধনের আড় ভাঙেনি তখনও। আমি আবার শুরু করতে গিয়েও থামলাম। কালিকাপ্রসাদ বললেন, `আপনি আমাকে তুমি করে বললে গল্পটা দারুণ জমে যাবে। আমি আপনার কথাগুলো খুব সহজ করে নিতে পারব।‘
আমি বললাম, `আপনিও তবে দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছে আসুন।‘

ঢাকায় তখন ব্রাহ্মমুহূর্ত। সুন্দরবনের হোটেলের পশ্চিম দিক থেকে কাঁঠালবাগানের কোনো এক মসজিদের মাইকে আজান দিলেন মুয়াজ্জিন।
প্রসাদ বলল,
`ভোর হল উঠে জাগো মুসাফির, আল্লাহ রসুল বোল।‘
আমি বললাম,
‘কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি,
মর্মে মর্মে সেই সুর,
বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইলো প্রাণ,
নাচিল ধমনি।
কী মধুর আজানের ধ্বনি’।

আজান শেষ হল। আমি আবার শুরু করলাম—
` আমি তখন ঢাকায় স্থায়ী হচ্ছি মাত্র। সেই সময় আমি একবার বাড়ি থেকে ভোরবেলায় একটু ঘুরপথে ঢাকার পথে রওনা হলাম। বাড়ি থেকে তিন মাইল উত্তরপুবে নলিয়াগ্রাম স্টেশন। ভাটিয়াপাড়া থেকে রাজবাড়িগামী ট্রেন এল, স্টেশনের সকালবেলাটা ব্যস্ততায় ভরে উঠল। ট্রেনে উঠে সিটে না বসে দরজা ধরে দাঁড়াতেই শুনি এক বাউলের গান—মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

বাউলশিল্পী আড়কান্দি স্টেশনে কামরা পাল্টালেন। আমিও তাঁর পিছু নিলাম। বহরপুরে তিনি আরেকবার কামরা বদল করলেন।
কামরায় কামরায় তিনি দোতারা বাজিয়ে লালনের গান বিতরণ করে চলেছেন—বাড়ির কাছে আরশিনগর, মিলন হবে কতো দিনে, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, জাত গেল জাত গেল বলে, সময় গেলে সাধন হবে না ।
বাউলের সঙ্গে তাঁর নাতিই বোধহয়, অনুমান করি। ছোট্ট ছেলেটির হাতে করতাল, ঝোলায় তার কাঁসার বাটি। একেকটি গান শেষ হলেই বাটি বাড়িয়ে ধরছে সে যাত্রীদের সামনে। আমিও সর্বমোট খুচরো বারো আনা শব্দ না করে বাটিতে আলতো করে রেখে দিই।
কালুখালি জংশনে এসে আমাদের ট্রেন ইঞ্জিন ঘুরিয়ে রাজবাড়িমুখী হতে বেশ সময় নিল। আমাদের বাউল ফকিরও রাজবাড়ি ছেড়ে আসা কুষ্টিয়াগামী ট্রেনে উঠেই মিলিয়ে গেলেন চোখের পলকে।
আমি কেমন নিস্ব হয়ে রাজবাড়িগামী ট্রেনেই বসে রইলাম। কালুখালি থেকে ট্রেন ছাড়ার একটু পরেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। সারিন্দার করুণ সুরের হু হু বাতাসে আমাদের কামরা যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। কোথা থেকে কে বাজায় সারিন্দা ? মাথা তুলে খোঁজার চেষ্টা না করেই শুনতে থাকলাম সেই চিনচিনে ব্যথার সুর। সারিন্দার কান্না আমাকে আড়ষ্ট অভিভূত করে তুলেছে। ট্রেনের সকল শব্দ ঢেকে গেছে সারিন্দার বিলাপে। সারিন্দা বাদক একটু বিরতি নিয়েই গান ধরলেন,
আমি বন্দি কারাগারে
আমি বন্দি কারাগারে
আছি গো মা বিপদে
বাইরের আলো চোখে পড়ে না মা
আমি বন্দি কারাগারে।
এই শিল্পী ট্রেনের কামরা বদল করলেন না। মুজিব পরদেশীর গানের পরে একের পর এক বিচ্ছেদী গান গাইতে লাগলেন তিনি। গান গেয়ে যাত্রীদের মন ভিজিয়ে কিছু পয়সাও দরকার যার, কিন্তু আজ তার সেদিকে মনই নেই। রাজবাড়ি থেকে ট্রেন বদল। সারিন্দা বাদককে অনুসরণ করে দৌলতদিয়ার ট্রেনে উঠে পড়লাম।
লোকাল ট্রেন ছুটে চলেছে ঘাটের দিকে। শিল্পী এবার আরো বেশি বেদনাবিধুর কণ্ঠে গান ধরলেন, বিজয় সরকারের গান–পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে…। গানের সঙ্গে সারিন্দার হাহাকারে যাত্রীদের বুকের মধ্যে হুহু করে কী এক অজানা বিরহবাতাস ঢুকতে লাগল। মাঝবয়সী একজন শীর্ণকায় দেহাতি মানুষ নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। শিল্পীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। দশাধারী যাত্রী একটু পরেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন শিল্পীর বুক থেকে।
কিছুক্ষণের জন্য ট্রেনের কামরায় নির্জনতা নেমে এল। শিল্পী এবার কাঁথার ঝোলা সবার সামনে এগিয়ে ধরে বললেন, যার যা ইচ্ছা দ্যান, আপনাগের দানধ্যানেই তো এই ফকিরের সংসার চলে।‘
ফকিরের ঝোলার মধ্যে কেউ চার আনা দিলেন, কেউ কেউ আট আনা। ফকির আবার সারিন্দায় সুর তুললেন। জসীমউদদীনের বিচ্ছেদী গানে গোয়ালন্দ দৌলতদিয়াগামী যাত্রীদের উদাস করে তুললেন তিনি–
আমার হাড় কালা করলাম রে
আমার দেহ কালার লাইগা রে
আমার অন্তর কালা করলাম রে
দুরন্ত পরবাসে।

মন রে, ওরে হাইলা লোকের লাঙ্গল বাঁকা
জনম বাঁকা চাঁদরে, জনম বাঁকা চাঁদ।
হায়রে, তার চাইতে অধিক বাঁকা
আমি যারে দিছি প্রাণরে, দুরন্ত পরবাসে।।

ট্রেন কখন দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছে গেল বুঝতেই পারিনি। ট্রেন থেকে নেমে দ্রুত হেঁটে আরিচার লঞ্চে উঠে পড়লাম। লঞ্চ পদ্মার গভীর জলে গিয়ে গতি বাড়াল। মাস্টার কেবিনের সামনে থেকে আবারও সেই সারিন্দার সুর। সেই শিল্পী। সেই ফকির। কিন্তু তাঁর বাজনার ধরন এখন বদলে গেল। জলের ঢেউয়ের সঙ্গে সারিন্দাও যেন আনন্দনৃত্য শুরু করল। লোকশিল্পীর অযত্নের লম্বা চুল হাওয়ায় উড়তে লাগল। সারিন্দা বাজাতে বাজাতে তিনি হঠাৎ গলা ছেড়ে গাইতে লাগলেন—
কল কল ছল ছল নদী করে টলমল
ঢেউ ভাঙে ঝড় তুফানে তে ।
নাও বাইও না মাঝি বিষম দইরাতে ।।

গগনে গগনে হুংকারিয়া ছুটে মেঘ
শন শন বায়ু বয় চৌদিকে ।
মাঝী নিমিষে গুটাইও পাল সামলে ধরিয়া হাল
তাড়াতাড়ি দিও পাড়ি বৈঠা তে ।।

বদরে বদর বলি কিনারে কিনারে চলি
ভাটি গাঙে ভাটিয়ালী গাইও ।
মাঝি থাকিলে জোয়ার বেশি লগি মাইরো তাড়াতাড়ি
বেলাবেলি ফিরা আইস ঘাটে তে ।।

এই গান আমি বহুবার শুনেছি। কিন্তু সেদিন পদ্মা পাড়ি দিয়ে যমুনার জল কেটে আরিচা ঘাটে পৌঁছবার কালে আমি জীবনের নতুন ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলাম।’’
কালিকাপ্রসাদ ভাবছিল, আমি বোধহয় আরও কিছু বলব। সে যেন নালিশের চোখে চেয়ে বলল, থামলে কেনো ? আমি প্রসাদকে বলি, ‘বলো তো সারিন্দার বাজনা হঠাৎ বদলে গিয়েছিল কেনো ?’
প্রসাদ বলল, ‘ওই যে গানের মধ্যেই তো তুমি বললে–বদরে বদর বলি কিনারে কিনারে চলি
ভাটি গাঙে ভাটিয়ালি গাইও।’
প্রসাদ বুঝিয়ে দিল—‘রেলপথ বদলের সঙ্গে সঙ্গে গানের কথা আর সুরও বদলে যায়। পথ পাল্টে গেলে ভাব রসও পাল্টে যায়। ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরে যায়, বাউল ফকিরও গন্তব্যে অটুট থেকে তার সুরের পথ ধরে লালনের বাড়ি চলে যায়। ট্রেনের কামরায় নতুন শিল্পী ওঠে। ট্রেন ঘাটের দিকে যেতে থাকে, শিল্পীও সারিন্দায় বিদায়ের সুর বাজাতে থাকে। ঘাটে পৌঁছেও আমাদের যাত্রা শেষ হয় না। জলপথে আবার চলতে হয় নতুন ছন্দে আনন্দে। জোড়া গাঙ পার হয়ে আবারও আমরা কিনারা খুঁজি। মাটি ছুঁয়ে আবার আমরা সংসার বাঁধি।’

সেই রাতে প্রসাদের আর ঘুমানো হল না। আরটিভির স্ট ‍ুডিওতে গিয়ে দোহারের কয়েকটা গান রেখে যেতে হবে। কালিকাপ্রসাদ তৈরি হবার আগে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমাদের নিরঞ্জনদা সারিন্দা বাজান। তিনি দিনে দিনে বার্ধক্যবরণ করছেন। নিরঞ্জনের পরে কে বাজাবেন সারিন্দা ? সারিন্দা ছাড়া কি দোহারের গান হবে ?’
আমি বললাম, ‘বিদেশের ভায়োলিন বাংলায় বেহালা। সারিন্দার পরিবর্তে বেহালায় চলবে না ?’
প্রসাদ হেসে বলল, ‘শাহ আবদুল করিমের দেশে বেহালাকে বলে বেলা। ওটা আসলেও ঠিক ভায়েলিন বা বেহালা থাকে না ভাটিবাংলার দেশে। ভাটির শিল্পীরা বেহালাকে অনেকটা সারিন্দার মতোই বাজান। কিন্তু রুহি ঠাকুর, রণেশ ঠাকুর কিংবা বশিরউদ্দীনদের বেলা আর সারিন্দা তো এক নয়।”

সেইসব রাত সেইসব দিন কবেই গেছে চলে। কিন্তু সেইসব কথা সুর নতুন করে ঘুরেফিরে আমার প্রাণের কাছে ক্রমশই ঘন হয়ে উঠছে।
আজ আমি কাকে আরেকটি গল্প শোনাব ? কে শুনবে প্যারিসের গান, প্যারিসের ভায়োলিন আর চেলোর গল্প ? প্যারিসের পথে পথে, মেট্রোর ল্যান্ডিংয়ে, পাতালপুরীর ট্রেনের গভীরে যে ভায়োলিন বাজে, দক্ষিণ ফ্রান্সের আলেসে নিমে মোঁপেলিয়ে শহরে কিংবা উজেসের গ্রামে সেই ভায়োলিন অন্য কথা বলে। স্থান কাল প্রকৃতি আর জীবনভেদে ভায়োলিনের একই তারে ভিন্ন ভিন্ন সুর বাজে। পাখিও আকাশের রঙ বুঝে তার ওড়াউড়ির ডানাভঙ্গি বদলে ফেলে।

মন মজালে ওরে বাউলা গান
প্রসাদ আমার জন্যই সেই বিকেলেটা ফাঁকা রেখেছিল। সেদিন আমরা দুজনে মাটির ভাঁড়ে চা নিয়ে কোলকাতার রবীন্দ্র সদন চত্বরে কোনো এক লোহার বেঞ্চিতে বিকেল থেকে ভর সন্ধে অব্দি বসেছিলাম। আমাদের সামনে দিয়ে কিছু মানুষের চলাচল ছিল। কালিকাপ্রসাদকে দেখে কিছু কিছু মানুষের থমকে-থামা ছিল সারাটি বিকেল।

শহরে গঞ্জে গ্রামে কতো না উৎসবে দোহার মঞ্চ মাতায়। সকল গানকে সহজ করে সকলের কানেপ্রাণে পৌঁছে দেয় দোহার। দোহারের কাণ্ডারী কালিকাপ্রসাদকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে কিছু মানুষ দাঁড়াবেন, দম নিয়ে কিছু ভাববেন বলবেন–এটাই স্বাভাবিক।
টেলিভিশনের পর্দায় সময়ে অসময়ে বারবার দোহারের প্রাণগুলো স্বরূপ পায়। কালিকাপ্রসাদের মুখ দেখে, তাঁর ঝাঁকড়া চুলের ঢেউ দেখে কেউ কেউ চলা থামিয়ে চমকে যাবেন—এটাও অস্বাভাবিক নয়।
সেই বিকেলে কজন অনুরাগী ভক্ত সাহস করে এগিয়ে এসে কালিকাপ্রসাদের স্বাক্ষরও গ্রহণ করেছিলেন।
সেদিনই কথা হয়েছিল আমাদের ভাটির পুরুষ মরমী লোকসাধককে নিয়ে। সেদিনও শাহ আবদুল করিমের কথা বলতে গিয়ে প্রসাদ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। গুনগুন করে গেয়ে উঠেছিল—
যা দিয়েছো তুমি আমায়, কী দেব তার প্রতিদান
মন মজালে ওরে বাউলা গান
আমার মন মজালে ওরে বাউলা গান
অন্তরে আসিয়া যখন দিলে তুমি ইশারা
তোমার সঙ্গ নিলাম আমি সঙ্গে নিয়া একতারা
মন মানে না তোমায় ছাড়া তোমাতে সঁপেছি প্রাণ
মন মজালে ওরে বাউলা গান ।।

কী করে পাব তোমারে তাই ভাবি দিন-রজনী
মনের ভাব প্রকাশ করি কথায় দিয়ে রাগিণী
এস্কে দিল-দরিয়ার পানি ভাটি ছেড়ে বয় উজান
মন মজালে ওরে বাউলা গান ।।

কত গান গেয়ে গেলেন যারা মরমী কবি
আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি
বিপন্ন মানুষের দাবি করিম চায় শান্তির বিধান
মন মজালে ওরে বাউলা গান ।।

কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে শাহ্ আবদুল করিমের দেখা হয়েছিল। কথা হয়েছিল করিমের সন্নিকটবর্তী হয়ে। লালন হাসন রাধারমণের পরে নতুন এক প্রাণবাজানিয়া গানের ধারা সৃষ্টি করেছেন বাউল আবদুল করিম। করিমকে নিয়েই প্রসাদের এবং দোহারের তথা বাংলা লোকগানের নবজাগরণ।

প্রসাদ সেদিন জানতে চেয়েছিল, তুমি কি বাউলকে স্বচক্ষে দেখেছ ?
প্রসাদকে বলি, ‘আমি কয়েকবার শাহ্ আবদুল করিমকে দেখেছি। কখনও খুব কাছে থেকে, কখনও-বা সামান্য দূরে দর্শক আসনে বসে করিমের কথা আর গান শুনেছি । একবার তাঁকে আমরা আমার কর্মস্থল বাংলাভিশনে এনেছিলাম। তাঁকে নিয়ে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্রের স্ক্রিপ্টও তৈরি করেছিলাম। করিমের গানযাপনের প্রামাণ্য আমরা তৈরি করেছিলাম প্রাইভেট টেলিভিশন বাংলাভিশনের জন্য।’

কালিকাপ্রসাদ আমার দুহাত চেপে ধরে সেদিন অনেকক্ষণ চুপ হয়ে বসেছিল। গভীর আগ্রহ নিয়ে আমার কাছ থেকে বাউল সম্রাটের ঘ্রাণ খোঁজার চেষ্টা করেছিল। আমি প্রসাদকে থেমে থেমে বলেছিলাম, ‘আমি উজানধলের জলের গন্ধ পেয়েছি। উজানধল যেন হাওরের উপরে ভাসমান এক উজ্জ্বল সবুজ গ্রাম । প্রতি বর্ষায় হাওরে নদীতে নতুন জল আসে আর উজানধলও যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। শাশ্বতবাংলার জলজ ঘ্রাণে শাহ করিমের মনে নতুন ছন্দের ঢেউ ওঠে। ভাটিবাংলায় বর্ষার প্রসন্ন প্রবাহে নতুন গান বাঁধেন আমাদের চিরায়ত লোককবি করিম।
চারণকবি শাহ্ আবদুল করিমের কর্মের ক্ষেত্র উজানধল গ্রাম। ভাটিবাংলা যেন আক্ষরিক অর্থেই গানের দেশ। এখানে গান আপনিই যেন গীত হয় জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। এই অথৈ জলের ঢেউয়ে একদিন গানের নাও ভাসিয়েছিলেন আবদুল করিম।
ভাটির মানুষ গান ভালোবাসেন। রাখাল বালক আবদুল করিমও ছোটবেলা থেকেই গানের মানুষ ছিলেন। তিনি শিশুকাল থেকেই মাটি আর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন।’

প্রসাদকে সাহস করে জিজ্ঞেস করি, ‘কোলকাতার মানুষের কাছে তোমরা করিমের গান প্রিয় করে তুললে কী করে? নাগরিক মানুষ সহজ সুরের মাটির ঘ্রাণ-গান নিতে পারে ?’
প্রসাদ সেদিন বলেছিল, ‘নগরও তো এক অর্থে মানুষের গ্রাম। আমরা যে যেখানে থাকি, সেই জায়গার দোষ গুণে বেড়ে উঠি। জায়গাভেদে আমাদের সুখের ধরন বরন বদলে যায়। কিন্তু আমাদের সকলের দুঃখ এক ও অভিন্ন। পৃথিবী গ্রামের সকল মানুষই অন্তরের গভীরে সহজ মানুষ। সহজ মানুষের আনন্দ বেদনাও একসুরে গাঁথা।‘

প্রসাদের কাছ থেকে সঠিক জবাব আমি পেয়েছি সেদিন।
কালিকাপ্রসাদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র ছিল। সে ভাটিবাংলার উত্তর জনপদ থেকে কোলকাতায় এসে নাগরিক মানুষের মনটাকেই সহজ করে তুলেছে মাটির গানে প্রাণের গানে মুগ্ধমোহিত করে। প্রসাদ তার শিল্পীজীবনে খুব বড়ো ঝুঁকি নিয়ে নিজের পায়ের তলার মাটিকে শক্ত করে তুলেছে দোহারকে সঙ্গে নিয়ে।

আজ মনে মনে ভাবি, নাগিরক মানুষের অহংকার অবিশ্বাস আর ব্যক্তিস্বাধীনতার ছদ্মবেড়া ভেঙে কালিকাপ্রসাদ প্রাচীরবিহীন মুক্ত মানুষের গানের জগৎ রচনা করেছে। কালিকাপ্রসাদ মুক্তমনের সুসহজ মহাপ্রাণ সংগীতকার।

গভীর শীতের রাতে গানালাপ
রাজীব দাসের ঘুম কাড়তে চাইলাম না। জানতাম, সকালের ফ্লাইটে কোলকাতায় পৌঁছেই তিনি অফিস করবেন। রাজীবদা শুভরাত্রি জানালেন।

রাজীব দাস, সাধারণ চেহারা, গড়নও তাই। তাঁর কথা বলবার ধরনেও বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু মৃদুহাসির মানুষটা হারমোনিয়ম ধরলেই ভীষণ বদলে যান। আসলে খুব সাধারণ মানুষও মঞ্চে উঠে অন্যভিন্ন সুরের যাদুকর হয়ে উঠতে পারে।

রাজীবের সঙ্গে প্রসাদ সিলেটী ভাষায় কথা বলে। প্রসাদ আর রাজীবের সিলেটী মাত্ শুনে আমার মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। দোহারের সবার কথাই হচ্ছিল সেই রাতে। দেশ টিভির লাইভ অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা ক্লাবে কালিকাপ্রসাদের বিশ্রামের সময়েও আমি ভাগ বসিয়েছিলাম।

`তোমরা ইলেকট্রনিক কোনো বাদ্যযন্ত্রই বাজাও না। যখন হাজার হাজার দর্শক শ্রোতার সামনে যাও, একটুও আড়ষ্ট হও না ? ভয় পাও না ? এখন তুমুল আওয়াজের অন্ধকারে দর্শক শ্রোতারা মাতম করতে পছন্দ করেন। লালন রবীন্দ্র নজরুলের গানেও বাদ্যযন্ত্রের বাড়াবাড়ি থাকে। তোমরা কেনো শরীর মন নিবেশ করে হাতেগড়া বাদ্যযন্ত্রেই ডুবে থাকো ?‘
প্রসাদ বলেছিল, `মানুষের কানের অসুখ বাড়িয়ে অপরাধী হবে কেনো ? দর্শক শ্রোতার প্রাণের সুখ আর আনন্দকে বাড়িয়ে তুলতে দোহারের অকৃত্রিম বাদ্যযন্ত্রই যথেষ্ট।‘
দোহারের পোশাকে অন্তরের রঙ, দোহারের বাজনায় দেহঘড়ির স্পন্দন, দোহারের গানে প্রাণের আরাম বিরাম।

প্রসাদের সামনে বসে দোহারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলে নিজেরই অস্বস্তি বাড়ে। তবু প্রসাদকে বলেছিলাম, `তোমরা রবীন্দ্রনাথের গানকেও লোকগান করে তুলেছ। যে মানুষগুলো ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া জারি সারি শুনত, তারাও আজ তোমাদের সঙ্গে গলা মেলায়—
রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে
তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে
অশ্রুজলের করুণ রাগে।।
রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে,
সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে, গভীর রাতের জাগায় লাগে।।
কালিকাপ্রসাদ আমার কথায় যেন একটু লজ্জা পেয়েছিল ; কথাটা তার ভালোও লেগেছিল। সে আড়মোড়া ভেঙে বলে উঠেছিল, `কোনো গানেই গোত্র বর্ণ জাত অভিজাতের সিল থাকে না। গানের কোনো জাতপাত নেই। যেমন প্রকৃত ঈশ্বরের কোনো ধর্ম নেই, মানুষের ধর্মই ঈশ্বরের ধর্ম। রবীন্দ্র নজরুলের গানকেও বিশেষ শ্রেণির মধ্যে আটকে রাখা মানে সর্ব সাধারণের প্রাণের আনন্দলাভের অধিকারকেই অস্বীকার করা। আমরা সকল মানুষের জন্য গান গাই। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের কাছে যতোটা নিষ্ঠা ভক্তি পায়, শাহ্ আবদুল করিমের গানও ততোটুকু ভালোবাসায় ভরিয়ে দিই। আমরা সকল প্রকার বিভেদ থেকে তফাত থাকি। রাজনীতির মানুষরা বিভেদ তৈরি করে ; আর আমরা সেই বিভেদ দূর করে সাম্যের গান গাই।‘

গানালাপের ভার আর বাড়াইনি সেই শেষ রাতে। তারপর আরও কতো দিন কতো রাত কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে নানান কথায় মজে থেকেছি। গানের তত্ত্ব তথ্য নিয়ে আলোচনা করে বন্ধুযাপনক্ষণটুকুকে ক্লাসরুমের বদ্ধ বাতাসে বন্দি করতে চাইনি।

প্রসাদকে ঘিরে আমার স্মৃতিঘোর
কালিকাপ্রসাদ যেদিন দেহাতীত হয়ে গেল; সেদিন থেকে আমি দেহাতি মানুষের গান শুনতে গেলেই অস্থির হয়ে পড়ি। কীর্তন ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া এমনকি রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে গেলেই দেখি সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রসাদ। ভাবপ্রধান কোনো গান শুনতে গেলেই দুচোখের জল আটকে রাখতে পারি না।

সেই কবে থেকে আবদুল করিমের গান মানেই আমার কাছে দোহারের গান। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই– গভীর শীতের রাতে মৌলভীবাজারে দোহারের মঞ্চে নাও ছেড়ে উড়ে চলেছে কালিকাপ্রসাদ।
শাহবাগে দাঁড়িয়ে আছে প্রসাদ। শহিদ মিনারে ফুল দিচ্ছে কালিকা। রবীন্দ্র সদনের সিঁড়িতে বসে আছে কালিকাপ্রসাদ। তারা মিউজিকের আজ সকালের আমন্ত্রণে সকালজুড়ে আছে কালিকা।
কোলকাতা বুক ফেয়ারের মাঠে প্রসাদ। উত্তরপাড়া থেকে শো শেষ করে গভীর রাতে সল্ট লেকে গেস্ট হাউজে দেখা করতে এসেছে কালিকা। সন্তোষপুর জোড়া ব্রিজ থেকে আমাকে তার বাড়ির পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কালিকাপ্রসাদ।

ব্যক্তিগত স্মৃতির ঘোর থেকে বেরুতে না পারলে কারো হাতে মহৎ রচনা আসে না। প্রসাদকে নিয়ে আমি কিছুই লিখতে পারছি না।

কিছু গান সৃষ্টি হয়, কিছু গান বানানো বাঁধানোও হয়। কালিকাপ্রসাদ ব্যক্তিগত জীবনের অনেক উপরের একজন সংগীতস্রষ্টা।
সৃষ্টিশীল মানুষের যাপিত জীবনের আহার বিহার সুখ দুঃখ নিয়ে নাড়াচাড়া করলে সংসারের ফুল ফল লতাপাতার মধ্যেই সীমিত থাকতে হয়। কিন্তু কালিকাপ্রসাদ সংসার করেও সংসারবিবাগী মহাবাউলের ভাবশিষ্য। কালিকাপ্রসাদ প্রকৃতির দীক্ষা গ্রহণ করে, মরমী কবি ও লোকসাধকদের গুরু মেনে, মানুষকেই ভজনা করে. তার অন্তরের গানই নিবেদন করে ওপারের দেশে চলে গেছে।

আজও যে-কোনো ভাষার গান শুনলেই মনে হয় দোহারের গান শুনছি। শুনছি প্রসাদের গান। আলেস আজ বার বার শুনছি ক্রিথোপের (Chrithope Maé) গান;
সুখ তুমি কোথায়? কোথায় সুখ?
কিন্তু ফরাসি ভাষার শব্দ সুর ছাপিয়ে কানে বাজছে– প্রসাদ তুমি কোথায়? কোথায় প্রসাদ?
Il est où le bonheur, il est où?
Il est où?
Il est où le bonheur, il est où?
Il est où?

Where is happiness where is it?
Where is he?
Where is happiness where is it?
Where is he?

প্রসাদ তুমি কি প্যারিসে এলে? তুমি কি এলে আলেসে? হয়তো এসেছ, আমি দেখতে পাইনি। হয়তো না এসেও তুমি এলে। অথবা এসেও তুমি এলে না। শাহ্ আবদুল করিমের গানের মতোই—
আইলায় না আইলায় না রে বন্ধু
করলায় রে দিওয়ানা…
আইলায় না আইলায় না রে বন্ধু
করলায় রে দিওয়ানা
সুখ বসন্ত সুখের কালে
শান্তি তো দিলায় না রে বন্ধু
আইলায় না রে।

আমি তোমারই নাম গাই
আলেস শহরের মাঝখান দিয়ে লো গারদোঁ নদ পাহাড়ের ঝর্নাজল নিয়ে বেয়ে গেছে দক্ষিণ দিকে। লো গারদোঁ নদের জলে নৌকা নেই, আজ অব্দি দেখিনি।

আলেস শহর ছাড়িয়ে ব্লাকিয়ে সন্দ্রাস গ্রামের দিকে নির্জন জলের কিনারে গিয়ে মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে থাকি। সহসা বৃষ্টি নামে। উত্তরের পাহাড় থেকে আচমকা তুমুল জল এসে লো গারদোঁ পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয়, এই বুঝি উজান থেকে ভাটির দিকে ভুবন মাঝি আসবে এক্ষুনি। মাঝির হাতে বৈঠা আর নৌকার মাস্তুলে লগি থাকবে নিশ্চয়ই। সান্দ্রাস থেকে আমিও ভুবন মাঝির নৌকায় উঠে যাব। লগি দিয়ে ধাক্কা মেরে মাঝে মাঝে আটকেপড়া নৌকাটাকে মধ্যনদে নিয়ে যাব। যেতে যেতে একদিন ঠিক ভূমধ্য সাগর পেয়ে যাব। ভূমধ্য থেকে একদিন ঠিক কৃষ্ণ সাগর আরব সাগর ভারত সাগর পাড়ি দিয়ে, বঙ্গোপসাগর ধরে পদ্মাজলে পৌঁছে গিয়ে, দুলে দুলে আমি তোমারই গান গাইব–

আমি আকাশ ও রোদের দেশে ভেসে ভেসে বেড়াই
মেঘের পাহাড়ে চড়ো তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।
ভালবাসা করে আশা তোমার অতল জল
শীতল করবে মরুভূমি,
জলে ডাঙ্গায় কেন ডুবতেও রাজি আছি আমি
যদি ভাসিয়ে তোল তুমি,
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই
আমার নাম গাও তুমি ।।

লেখক: কালিকাপ্রসাদের বন্ধু,, আবৃত্তিকার,ফ্রান্সে নির্বাসিত।