সাকুরা, বলছি তোমাকে…

‘চলে যেতে যেতে’ আসলে স্মৃতি নির্ভর রচনা। একটা শহরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা গল্প। সেই একটি শহর যেখানে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। শহর ঢাকার প্রেমে পড়ে আছি একটা জীবন। পেছন ফিরে তাকালে দেখি কতকিছু যে হারিয়ে গেছে জীবন থেকে, স্মৃতি থেকেও। ছোট চায়ের দোকান, বইপাড়া, আড্ডা, অদ্ভূত সব মানুষ, রাস্তা, গলি। মনে হয় সবকিছুর এবার পাট উঠলো বোধ হয়। যাবার সময় হলো আমারও। তাই চলে যেতে যেতে লিখে রাখি সেই হারানো গল্পের খানিকটা। এখন থেকে প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ছাপা হবে এই ঢাকা শহরের নানা গল্প। আর সেসব গল্পের আড়ালে একজন মানুষের বেড়ে ওঠার কাহিনি।

সিগারেটের ধোঁয়ায় ভারি হয়ে আছে ঘরের ভেতরের বাতাস।আলো অন্ধকারে এখানে-ওখানে জোনাকি পোকার মতো জ্বলছে সিগারেট। হয়তো জ্বলছে বসে থাকা খদ্দেরদের হৃদয়ও। গ্লাসের তরলে ফেলা বরফের শব্দ, মৃদু সুরে বাজতে থাকা গজল, খাবার আর মদের ঘ্রাণ-সব মিলেমিশে সাকুরা বারের এক সন্ধ্যার দৃশ্য। ক্রমশ বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরের অন্যতম পানশালা ‘সাকুরা রেস্তোরাঁ অ্যান্ড বার’।ঢাকা শহরের পেছনে ফেলে আসা ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এই পানশালার কথা বলতে হবে অনিবার্য ভাবেই।একটি শহরের গল্পে থাকতেই হয় পানশালার গল্প। কারণ পানশালা যে ধরে রাখে কান্না, বেদনা আর আনন্দের স্মৃতি।
শহর ঢাকার কবি, লেখক, সাংবাদিক আর শিল্পীদের এক সময়ের নির্বাচিত অন্ধকার ছিল এই সাকুরা। এখনো আছে কি না জানি না, কারণ আমি আর যাই না শাহবাগ মোড় থেকে কিছুটা দুরে ভি.আই.পি সড়কের ধার ঘেঁষে দাঁড়িযে থাকা ক্রিম রঙ করা ওই দোতলা বাড়িটাতে।আসলে আর যাওয়া হযে ওঠে না। সময়ের প্রবাহে সেই চেনা মানুষেরাও তো কোথায হারিয়ে গেছে, হয়ে গেছি সবাই বিচ্ছিন্ন। আমি বলি, গন উইথ দ্য উইন্ড, হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেছে তাদের কোন অজানায়।
আমি সাকুরায প্রথম পা রাখি আশির দশকের গোড়ার দিকে। তখন এই পানশালায় দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেশ কয়েক দফা চমৎকার আড্ডা বসতো। আমি সাংবাদিকতা আর কাব্যচর্চার সূত্রে ওই বিচিত্র আড্ডাধারীদের টেবিলে যুক্ত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। সৌভাগ্য বললাম এ জন্য যে, যাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসার অধিকার আদায় করে নিয়েছিলাম তারা এখন বাংলাদেশের সাহিত্য জগত, সাংবাদিকতা আর গানের ক্ষেত্রে নক্ষত্র-খ্যাতি পেয়ে গেছেন। দুপুরবেলা ওই পানশালার একটা টেবিলে বসে থাকতেন প্রয়াত কবি রফিক আজাদ, আমাদের প্রিয় রফিক ভাই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন রফিক ভাই, তার দৃষ্টি বারের পাশে বেশ অনেকটা খোলা জায়গা ছুঁয়ে হারিয়ে গেছে কোন অজানায়। মাঝে মাঝে রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডার লোভে দুপুরবেলা ঢুকে পড়েছি সাকুরায়। খুব বেশী কথা বলতেন না কবি। ছোটখাট সামান্য কথার বাদাম ভাঙ্গা পর্যন্তই। তাতে থাকতো সাহিত্য, প্রেম আরো কত কী। রফিক আজাদের সঙ্গে এই শহরের আরও কয়েকজন খ্যাতিমান মানুষ বসে থাকতেন ওই টেবিল ঘিরে।
সাকুরার অসামান্য বার টেন্ডার জামান। আমার সঙ্গে জামানের সম্পর্কের বয়স আঙুল গুনে পয়ত্রিশ বছরে পা রেখেছে। জামানের বয়স বেড়েছে, বেড়েছে আমারও। জামানের সঙ্গে এই পরিচয় এক দিনে তৈরী হয় নি। কিন্তু আজ লিখতে বসে মনে হলো, আশ্চর্য, জামান কোথায় থাকে এই শহরে, কেমন করে তার দিন কাটে এই আচ্ছন্ন পানশালার বাইরে তা আমার আজো জানা হয় নি।কিন্তু সাকুরায় হঠাৎ কখনো ঢুকে পড়লে জামানের সঙ্গে দেখা করে আসি। কত ফাঁকা সন্ধ্যায় বন্ধুবিহীন টেবিলে বসে গল্প করেছি জামানের সঙ্গে!

এই শহরে নিজেদের জীবন হাতের মুঠোয় রেখে অন্যের জীবন নিযে যারা খেলতে ভালোবাসতো তাদের আনাগোনাও নিযমিত ছিল এই পানশালায়। এই কঠিন চোয়ালের যুবকদের সঙ্গেও আমার পরিচয়ের একটু সূত্র ছিল।এমনো দিন গেছে এই শহরে দুপুরের পালাবদলের সময় আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি ওই পাণশালায়। তারপর সন্ধ্যার পালা শুরুর আগে জেগে উঠে বের হয়ে গেছি যে যার মতো।
মানুষের হারানো ভালোবাসার স্মৃতিও জড়িয়ে থাকে পানশালায়। সাকুরা বারও এমন অনেক ঘটনার নিঃশব্দ সাক্ষী। দেশ বরেণ্য এক সঙ্গীত শিল্পীকে এই পানশালায় একা বসে কাঁদতেও দেখেছি। সংসারের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।দেখেছি কোন এক কবিকে সন্ধ্যার মুখে বসে আকন্ঠ। পরে শুনেছি তার প্রেমিকার বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে কোন এক নাগরিক গৃহে। সাকুরার টেবিল থেকে উঠে সেই কবি চলে গিয়েছিলেন সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে। তারপর বিয়েবাড়ির দরজা থেকে ফিরে এসেছিলেন আবার সাকুরার আশ্রয়ে।   
সাকুরা বারে পরটা আর গরুর মাংসের ভুনার স্বাদ এ জীবনে জিব থেকে যাবার নয়। তরুণ বয়সে পকেট খুব বেশী অর্থের আনুকূল্যে থাকতো না বলে খুব বেশী খেতে পারতাম না সেই অপূর্ব খাবার। মাঝে মাঝে বন্ধুরা চাঁদা তুলে খেতাম পরটা আর ভুনা মাংস।
অনেক কবিকে দেখেছি সাকুরায় বসে লিখতে। আরেক প্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে এক সন্ধ্যায় দেখেছিলাম একটা টেবিলে মোম জ্বালিয়ে বসে লিখতে। সাকুরায় এমন অনেক সময় গেছে যখন এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে কবি, লেখকরা ছুঁড়ে দিতেন অসামান্য লাইন। পরে অনেকের লেখায় পাওয়া গেছে সেই ছেঁড়াখোড়া লাইনের অস্তিত্ব। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, একটা শহরের অনেক গল্প জড়িয়ে থাকে একটি পানশালাকে ঘিরে। সাকুরাও ছিল তেমনই এক জায়গা। রাজনীতি থেকে শুরু করে অনেকের ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি আজও বোধ হয় সেই বদ্ধ ঘরের হাওয়ায় কান পাতলে শোনা যাবে। কোন কোন বৃষ্টির রাতে সাকুরায় আটকা পড়ে আমরা গেয়েছি সমেবেত কন্ঠে গান। বাইরে বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে শহর আর আমরা জড়ানো গলায় গাইছি গান…অদ্ভূত সব মনে-পড়া গল্প।
পানশালা মানেই গোলমালের জায়গা। মাঝেমধ্যে এই শান্ত পানশালার হাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠতো সংঘাতে। তখন পাশের দেয়ালের একটি চোরা দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে হতো লাগোয়া রেস্তোরাঁয়।সেইসব পলায়নের রাতে সাকুরা হয়ে উঠতো বিপজ্জনক আর রহস্যময়। এরকম একাধিক বিপজ্জনক রাতে আমিও আটকে পড়েছি সাকুরায়। পালিয়ে গেছি চোরা দরজা দিয়ে।
সেই চোরা দরজা দিয়ে আমাদের সময়টাই যেন পালিয়ে গেছে।সময় পালিয়েই যায়। শুধু পেছনে রেখে যায় স্মৃতির পালক। আজও জামান আছে সাকুরায়, আছে সেই চেয়ার টেবিলগুলো। লোকমুখে  শুনি ভীড় হয় সন্ধ্যাবেলা। হয়তো ফাঁকা দুপুরে কোন কবি বসে থাকে একলা টেবিলে উদাস হয়ে। বন্ধ বাতাসে ভাসে সিগারেট, খাবার আর পানীয়র ঘ্রাণ। দূরে বসে ভাবি আশ্চর্য সময়ের গল্প।সময়ের পাতা পেছনে উল্টে দেখতে ইচ্ছে করে সেইসব সন্ধ্যাগুলোকে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল