সাজেক ভ্যালী মেঘে মেলে দ্যায় মনের অলিগলি (পর্ব দুই)

লুৎফুল হোসেন

পাঁচ
আমাদের খাবার ব্যবস্থা ছিল রক ক্যান্টিনে। খাবার স্বাস্থ্যসম্মত আর স্বাদুও। মুরগি, সবজি, ডিমের কারি, ডাল, ভাত, খিচুড়ি, বসনিয়া নামের নানরুটি, সাধারণ পরটা; এসবই এখানকার খাওয়া। আর আছে ব্যাম্বু চিকেন, ব্যাম্বু চিকেন বিরিয়ানি, সাধারণ মোরগ পোলাও। মোদ্দা কথা মুরগি, ডিম আর সবজির বাইরে কিছু এখানে পাওয়া যায় না। মুরগি বাদে হাঁস একটু আধটু পাওয়া গেলেও মাছ নেই, বীফ বা মাটন নেই একেবারেই। বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো ফ্রিজ নেই। তাই গরু বা খাসির মাংস নেই এখানে। খাওয়ার পানি পাওয়া যায়। দাম বেশি। সফট ড্রিঙ্কস পাওয়া যায়, দাম কিছুটা তো বেশিই। এছাড়া পাওয়া যায় সিঙ্গারা, পেয়াজু, কলা, চা, কফি, স্যুপ, নুডুলস, সিগারেট এসব। রাতে বার-বি-কিউ এর ব্যবস্থা আছে বেশ কয়েক জায়গায়।
রাতে ঘোরাঘুরি করতে করতে মানুষের সংখ্যা কমে আসতে থাকলেও এখানে ওখানে দল বেঁধে গীটার বাজিয়ে গান গাওয়ার শব্দ ভেসে বেড়ায় মধ্য রাত পার হয়ে আরো অনেক সময়। ভোর না হতেই এক দল ছোটে উঁচু থেকে পাহাড়ে সূর্যোদয় দেখবে বলে। এটাই সাজেকের সেরা আকর্ষণ। সূর্যাস্তের সময়ও পর্যটকরা উদগ্রীব হয়ে থাকে। উঁচুতে উঠে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয় সবাই। গোটা এলাকায় লাল রঙের ব্যবহার আধিক্য আছে। বিশেষ করে অধিকাংশ ঘরের চাল বা ছাউনি দেয়ার ক্ষেত্রে। এই রঙটা খুব উজ্জ্বল হয় ফুটে উঠেছে সবুজ পাহাড়ি সাজেকে। সব কিছুকে আরো দৃষ্টি নন্দন করেছে যেনো রঙের এমন বিপ্রতীপ ব্যবহার।
এক রাতের জন্য আসা মানুষই সম্ভবত বেশি সাজেকে। কেউ কেউ এর বেশিও থাকতে পারে, তবে ছোট জায়গায় দুদিনের বেশি থাকলে কতোটা ভালো লাগবে তা ভাববার বিষয়। কারো কারো লাগলেও সবার মুগ্ধতা দীর্ঘ সময় আটকে রাখবে না সাজেকে। কারণ কোনো একটিভিটি ইভেন্ট নেই যা বাড়তি আকর্ষণ জোগাবে। ট্রেকিং করতে দেখা যায় কাউকে কাউকে, তবে আকর্ষণ করবার মতো খুব বেশি ট্রেকিং ট্রেইল নেই।
প্রতিদিন সকাল সাড়ে দশটায় আর বিকেল সাড়ে তিনটায় একদিকে সাজেক থেকে আর্মি এস্কর্টে পর্যটকদের চাঁন্দের গাড়ি জীপগুলোর কনভয় ছেড়ে যায় খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ঠিক একই রকম সময়ে বাঘাইহাট থেকে গাড়িগুলো ছাড়ে সাজেকের উদ্দেশ্যে। মাঝে মধ্যে দু-একটা সিএনজি ট্যাক্সি, ব্যক্তিগত সিডান গাড়ি আর মাইক্রোবাসও দেখা যায়। তবে রাস্তা কোথাও কোথাও বিপদজনক হওয়ায় এ পথের অভিজ্ঞ চালক ছাড়া কারো ড্রাইভিং-এর ঝুঁকি না নেয়াই শ্রেয়। এখানে মাঝে মধ্যে ক্বচিৎ কদাচিৎ হলেও দুর্ঘটনা ঘটে। আর ঘটলে সেটা ভয়বহ রকমেরই হয়। হাজার ফুট উপর থেকে গাড়ি পড়লে যেমনটা হতে পারে। পাহাড়ি রাস্তায় বেশ কিছু অংশ জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটুকু অংশে ঝাঁকুনিও হয় খুব। এসব মাথায় রেখে সাজেক ভ্রমণের আয়োজন করতে হবে সবাইকে।

ছয়
পাহাড়ে যাবো অথচ বৃষ্টি দেখবো না। তাতে কি আর দেখার সাধ পূর্ণতা পায় ! সেরকম ইচ্ছের কথা বলছিলাম দুপুরে খাবার ওখানে টেবিল খালি হবার অপেক্ষায় বসে থেকে। মাত্র এক দিনের জন্য আসা অনেকেই তাতে ক্ষুন্ন মনে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। বৃষ্টিতে আটকা পড়ে গোনা গাঁথা সময় কে অপচয় করতে চায়! আমার মতোন দু-এক জন পাগল বাদে ! মেঘের তোড়জোড় দেখে করা মন্তব্যটা খেটে গেলো আমাদের টেবিল খালি হতে হতেই।
পাহাড়ের ঢালে বাংলো টাইপের রক ক্যান্টিনে একপাশে আর পেছনে ঝোলানো পাটাতনের বারান্দা। ওখানে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে খায় বেশির ভাগ লোক। আর মাঝখানটায় একটা রুমে খাবার-দাবার রাখা বাড়ার পাশাপাশি খাওয়ার ব্যবস্থা কিছু মানুষের। ঝড় শুরু হতেই খোলা জায়গায় বাতাসের তীব্রতা এমন হলো যেনো ভেঙে পড়বে ঘর যে কোনো সময়। সেই সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। বাইরের অংশে খাওয়া বন্ধ তখন। আমরা বৃষ্টির ছাট থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে ভেতরের রুমটায় খেয়ে এক সিঁড়ি উপরে সামনের বারান্দায় আটকে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বৃষ্টিভেজা হয়ে পিকআপে উঠে হোটেলে এলাম। হোটেলের লবি বলতে ছোট্ট একটু বসার জায়গা। সেটার টানা জানালাটা ছাউনির মতোন উপর দিকে বাড়িয়ে খোলা। সেখান দিয়ে জলে ভেজা বাতাসের সঙ্গে ভারী মেঘ ঢুকে পড়ছে অবিরাম। আফসোস মোবাইল ক্যামেরায় সেই মেঘের আনাগোনাটুকুন ধরে রাখতে পারা গেলো না।
খেয়ালি প্রকৃতির কৃপায় আড়াই ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেলো পুরোপুরি। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম শেষ বিকেলের রেশ ধরতে। ঘুরে ফিরে চলে গেলাম কংলাকে যাবার মুখে সাজেকের শেষ মাথায়। হ্যালিপ্যাডের আশেপাশে খোলা জায়গায় ছাউনি সহ ছাউনি ছাড়া বেশ কয়টা বসার জায়গা ঢালের পাশেই। সেখানে মন জুড়িয়ে ছুটলাম অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। সেখানে আর্মি রেস্ট হাউসের পাশে সুন্দর ল্যাণ্ডস্কেপিং, বসার জায়গা, দোলনা। সূর্যাস্ত দেখলাম চায়ের কাপ হাতে। তারপর সন্ধ্যা নামিয়ে এখানে ওখানে আড্ডার হপিং সেরে ফিরলাম হোটেলে। পোষাক পাল্টে চললাম রাতের খাবারের জন্য। ব্যাম্বু চিকেন আর বসনিয়া।
ডিনার শেষে কেবলি মনে হচ্ছিলো সারা রাত জেগে থাকি এইখানে। কফির খোঁজে আবার ঘুরতে ঘুরতে অন্য মাথায়। পছন্দ হলো ক্যাফে দড়। রোডসাইড ক্যাফে। খোলা আকাশে গাছের নীচে কাঠের বেঞ্চি আর প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। সঙ্গে প্রখর চাঁদের আলো। আশে পাশে কোথাও দরদী গলায় গীটার বাজিয়ে দল বেঁধে গান গাইছে যেন কারা। সেই সুর আরো মোহময় করে তুললো সব কিছু।
এমন রাতও শেষ হয়। আমার জোছনায় ভেজা, কোনো তরুণের মেঘের সমান উদাস হওয়া, হয়তো কোন নতুন দম্পতির মধুচন্দ্রিমা। যার যাই হোক সময় গড়িয়ে যায়। দুপুরে খাগড়াছড়ি পৌঁছে সিস্টেম হোটেলে মাশরুম ভাজা, হাসের মাংসের কালাভূনা, শুটকি ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে রিসাং ঝর্ণা, আলুটিলা গুহা, ঝুলন্ত সেতু, হাজাছড়া ঝর্ণা দেখার ক্রম সাজাই মনে মনে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সব। হয়তো কোথাও কেউ রাত জেগে গল্পের ঝুড়ি মেলে আরো সময় পার করে। তারপর অলস সকালে সূর্যের সন্ধানে আঁধার কেটে বেরিয়ে পড়ে। অলস বসে ডিম পরোটা চায়ে নাশতা সারে। স্থানীয় মানুষদের জীবন যাপন দেখে। আবার কোনো একদিন আসবার প্ল্যান কষে। তারপর সকালের কনভয় ধরতে ব্যাগ গুছিয়ে চান্দের গাড়িতে উঠে পড়ে।
এমন সুন্দর জায়গায় একবার গেলে সবারই বার বার যেতে মন চাইবে। যেতে মানা কি ! মেঘের উপত্যকায় সবুজের ঢেউয়ের সঙ্গে মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভেসে থাকতে কার না ভালো লাগবে ! পাহাড়ে বৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় অনেকে অনেক সময় কাটিয়ে দেয় হয়তো। তবে বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শীতকালে তাই পর্যটকদের ভীড় থাকে বেশি। সেই সময় বিদেশী পর্যটকদের দেখাও মেলে নিয়মিত। গ্রীষ্মে, বর্ষায় পর্যটক সংখ্যা একটু কম থাকে। তবে দেখতে দেখতে আবাসন সুবিধার বৃত্ত যেমন বড় হচ্ছে বছর জুড়ে পর্যটকদের আসা-যাওয়াও তেমনি বাড়ছেই। (শেষ)

ছবিঃ লেখক