সাতচল্লিশ বছর পর ফিরলেন সরোজ দত্ত

নিখোঁজ হওয়া অথবা মৃত্যুর ৪৭ বছর পর আবারো একবার জীবন্ত হয়ে উঠলেন তিনি। সেটা অবশ্য সেলুলয়েডের জীবনে, তথ্যচিত্রে। পশ্চিম বাংলার লেখক, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী সরোজ দত্ত। সত্তরের দশকে ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবের আগুন জ্বেলে দেয়া নকশাল আন্দোলনের অন্যতম নেতা সরোজ দত্ত নিখোঁজ হয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৪ অথবা ৫ আগস্ট রাতে। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায় আত্নগোপন করে থাকা এক বাড়ি থেকে। তারপর আর ফিরে আসেননি সরোজ দত্ত।

কেন ‘নিখোঁজ’ হয়েছিলেন সরোজ দত্ত? ৭১-এর সেই আগস্ট মাসের রাতে পুলিশ গ্রেফতার করার পর  সবকিছুর ওপর একটা যতিচিহ্ন বসে যায়। কিন্তু সঙ্গে থেকে যায় একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নও। তারপর?  সেই তারপরের খোঁজেই সম্প্রতি কলকাতায় নির্মিত হয়েছে টানা প্রায় ২ ঘন্টার তথ্যচিত্র এই ১১৫ মিনিটের ‘SD: Saroj Dutta and his Times’। এই তথ্যচিত্রের পরিচালক পরিচালক কস্তুরী বাসু ও মিতালী বিশ্বাস।  পুরো তথ্যচিত্রটি ১১৫ মিনিটের সরোজ দত্ত ও নকশাল আন্দোলনের একটা যাত্রা৷ অনেকে অভিযোগ করেন এখনো, সরোজ দত্তকে সেদিন ঠাণ্ডা মাথায় কলকাতার গড়ের মাঠে খুন করেছিলো পুলিশ। তারপর ফাইল ক্লোজড। আর ফিরে আসেননি সরোজ দত্ত। তাঁর শেষ পরিণতি আসলে কী হয়েছিলো তা নিয়েও পরিষ্কার শেষ কথা নেই। সেই ধামাচাপা দিয়ে পড়ে থাকা বন্ধ ফাইলটাই যেন সেলুলয়েডে খুলতে চেয়েছেন এই দুই তরুণ পরিচালক।

সরোজ দত্ত তরুণ প্রজন্মেরই৷ তেমনটাই তো হবার কথা। আঠারোর জন্যই সরোজ৷ তথ্যচিত্রে সেই বার্তাই স্পষ্ট হলো৷ শোনা যায় – পুলিশের গাড়িতে করে সরোজ দত্তকে ভোর রাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফাঁকা ময়দানের দিকে৷ যথারীতি এক সময় গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাঁকে বলা হয়েছিল- আপনি মুক্ত, বাড়ি চলে যেতে পারেন। তখন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য হাঁটা দিতেই পিছন থেকে তখন গুলি করা হয়েছিল৷ যদিও দেহ সরিয়ে সরোজ দত্ত ‘নিখোঁজ’বলে পুলিশের তরফে জানান হয়েছিল৷ তথ্যচিত্রে দুই পরিচালিকা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই সরোজের মৃত্যুর শব্দ শুনিয়েছেন।

৪৭-এর তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী বেলা দত্তের স্বামী ছিলেন সরোজ,তখন অমৃতবাজার পত্রিকার সাংবাদিক৷ তথ্যচিত্রে সেদিনের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী বেলা এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। সরোজ দত্তের ছেলে কুনাল দত্ত মাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন সেই ভীষণ বিদ্রোহের কথা৷ সব মনে রেখেই অস্পষ্ট বাংলায় বৃদ্ধা বললেন, ‘সব গয়না দিয়েছিলাম’বলেই শিশুর মতই হেসে ওঠেন। বোমা তৈরি করতেন কীভাবে তাও বললেন৷ তথ্যচিত্র ক্রমশ এভাবেই  জীবন্ত হয়ে উঠেছে। জীবন্ত হয়ে ওঠেন ‘SD’৷

তেভাগা আন্দোলনের আকস্মিক থেমে যাওয়া সূচনা করেছিলো তৎকালীন সিপিএম দলটির ভাঙ্গন পর্ব। তথ্যচিত্রে সব পর্বই চলল সরোজের সঙ্গেই, চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন, কানু সান্যালের সশস্ত্র বাহিনী, ৬০ হাজারের উপরে খালি পেট চাষাদের আন্দোলনের হুঙ্কার৷ সরোজের দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা লেখনী৷ সব মিলিয়েই তথ্যচিত্র তুলে ধরেছে ভারতবর্ষের ধামাচাপা পড়া প্রচণ্ড ইতিহাস ৷ এই ইতিহাসের কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলেন সরোজ দত্ত৷

স্ত্রী’র সঙ্গে সরোজ দত্ত

একে একে গ্রেফতার নকশাল নেতারা৷ সরোজ দত্তও  হোলেন৷ ছাড়া পেলেন ১৪ মাস বাদে৷ জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ‘শশাঙ্ক’ ছদ্মনামে নিয়ে লেখালেখির শুরু। বিপ্লব যেখানে সেখানেই সরোজ দত্তের লেখা৷ এই তথ্যটাও তথ্যচিত্রটি বয়ে এনেছে এখনকার প্রজন্মের কাছে। বিপ্লবী চরিত্রের পাশাপাশি সরোজ দত্তের কধারালো লেখনী এবং বিপ্লবী তত্ত্বের প্রচারেকের পরচয়টাও পাওয়া যাবে এই তথ্যচিত্রে। নানা সময়ে নানান ছদ্মনাম নিয়ে লিখেছেন সরোজ দত্ত। ‘রত্নাকর’, ‘বঙ্গরঙ্গ’, ‘সংশয়’, ‘কোনও বিপ্লবী কবির মর্মকথা’, ‘মধ্যবিত্তের বিপ্লব বিলাসের ’মতো কবিতা থেকে একগাদা লিখিত দস্তাবেজ, যার বর্তমান সংগ্রহশালা সরোজ দত্তের ছেলে কুনাল দত্তের বাড়ি৷ যে বাড়িতে সরোজ দত্ত আজো বেঁচে আছেন প্রতিটি কোণে, বেলা দত্তের অস্পষ্ট বাংলায়৷ তথ্যচিত্রের শেষে কান্না চেপে ছিলেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী ৷ তাঁদের বাড়িতেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন সরোজ দত্ত৷ ৭১-এর ৪ অগাস্ট গভীর রাত, পুলিশ তুলে নিয়ে যায় সরোজ দত্তকে৷ তারপর? তদন্ত ধামাচাপা, ফাইল বন্ধ৷ সরোজ দত্ত আজও নিখোঁজ৷ তাঁর দেহেরও কোনো খোঁজ মেলেনি। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর গোপন বয়ান বলছে, দেহ লোপাটের আগে কাটা হয়েছিল সরোজ দত্তের মাথা৷ তথ্যচিত্র সমাপ্ত হচ্ছে সেই গাছটার শুকনো পাতায়৷ যে গাছ ধরেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন সরোজ দত্ত।

এই হত্যাকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নাম উঠে এসেছিলো মহানায়ক উত্তম কুমারের। ভোরবেলা মাঠে হাঁটতে গিয়ে ঘটনাটা দেখে ফেলেছিলেন তিনি। পরে তাকে তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থ মহল থেকে মিথ্যা সাক্ষি দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। প্রথমে উত্তমকুমার একেবারেই রাজি ছিলেন না৷ বরং বলেছিলেন, আদালতে ডাকলে তিনি যা দেখেছেন সেটাই বলবেন৷ ঠিক ওই সময় কলকাতার প্রখ্যাত এক ছাত্রনেতা মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে টেলিফোনে শাসায়৷ প্রচন্ড ভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে সেইসব কথা উত্তমকুমার আরেক অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তারপর উত্তম কুমার চলে যান বম্বে। দু’মাস পরে ফিরে এসে জানিয়েছিলেন – তিনি কিছুই দেখেননি।

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ কলকাতা ২৪/৭