সাতটি কবিতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইফতি হাবিব অভিন

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

অনুভূতি

 আমি চলে গেলেও কিছু থেমে থাকবে না,

এই পুরনো শহর ঠিক বৃষ্টিতে ভেসে যাবে,

শীতের কুয়াশায় ভিজবে কার্নিশ,

কার্তিকের বাউণ্ডুলে মেঘ চিলেকোঠায় আছড়ে পড়বে অজস্রবার।

সোনালী রোদে গা পোহানো কোনো বিকেল তখনো টুপ করে সন্ধ্যে হয়ে নেমে আসবে,

সাঁঝ প্রদীপের আলোয় রাঙ্গাবে বাতিঘর,

থেমে যাবেনা নগরের একান্ত ব্যস্ততা।

দেখো তো, বয়স বেড়ে যাচ্ছে আজকাল ভালোবাসাগুলোর,

তারাও নতুন হাত খুঁজে নেবে, খুঁজে নেবে পুরনো পথে নতুন অনুভূতি।

সিগারেট হাত বদল হবে,

বিষণ্ণ কিশোর কবিতায় খুঁজবে বিষাদ,

না ঘুমানো কোনো ছদ্মবেশী ছায়ায় খুঁজে নেবে জীবনের মানেগুলো।

আমি চলে গেলেও কেউ চেয়ে নেবে নতুন টিশার্ট, পুরনো হেভি মেটাল গান।

হয়তো রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের খুচরো আলোর পরিমাপ করবে কেউ,

হতে চাইবে কেউ হলুদ হিমু।

ডায়েরী’তে নতুন করে কেউ লিখবে দাঁড়কাকের কথাগুলো,

আঁকবে হুতুম প্যাঁচার বিদঘুটে সাদাকালো অবয়ব।

কিচ্ছু পাল্টাবেনা, সব থেকে যাবে একে একে।

আমি চলে গেলেও, কিছুই থেমে থাকবেনা,

রাতগুলো ঠিক এভাবেই নেমে আসবে।

চৌরাস্তায় সমবেত হবে রাতপ্রহরীর দল,

এরপর একে একে হারিয়ে যাবে, অলিতে-গলিতে….

রূপা ফারজানা

শ্রাবস্তী

ধরে নিচ্ছি তুমি একজন দুঃখচাষী

তাতে আমার কবে কীই-বা এসে গেছে

তোমার ছাদবাগানে থোকা থোকা দুঃখ বিলাপ

চিলেকোঠার টেবিলজুড়ে দুঃখশুমার

আয়নাঘরে বিম্বিত সব দুঃখের আনন।

ধরে নিলাম তুমি একজন দুঃখচাষী

তাতে আমার কবে কীই-বা এসে গেছে

আমি শুধু চোখের ভাঁজে তোমার জন্য

এক অনিকেত স্বপ্ন পুষি।

কারা যেন বলেছিল এক ভয়ানক

যুদ্ধ হবে,

কারা যেন দুঃখগুলো ছিনিয়ে নিতে

তোমার ঘাটে ভিড়িয়েছিল নৌবাহিনীর জাহাজ বহর।

কারা যেন তোমার চোখের নিরেট পাথর খসিয়ে দিতে

দুঃখগুলোর ‌অন্তপুরে লুকিয়েছিল।

কারা যেন হার মেনেছে তোমার কাছে

ঘর পুড়িয়ে তোমার ঘরে আলোর নহর

তোমার প্রাচীন নয় দরজার নগরখানি

দুঃখগুলোই প্রহরা দিত অষ্টপ্রহর।

ধরে নিচ্ছি তুমি একজন দুঃখচাষী

তাতে আমার কবে কী-বা এসে গেছে

তোমার ছাদে, চিলেকোঠায়,

পোড় খাওয়া ঐ নগরজুড়ে

আমিই তবু শ্রাবস্তী আর

আমিই হয়তো সর্বনাশী

আমি শুধু চোখের ভাঁজে তোমার জন্য

এক অনিকেত স্বপ্ন পুষি।

 

রোকসানা শাহ্‌নাজ

ক্যাকটাসের হাসি

শরতের আকাশে গোলাপ চাষীরা

ভুল করে বুনেছিল, কিছু করুণ ক্যাকটাস।

আর কী আশ্চর্য!

সেখানে হেসে উঠলো অজস্র সব বনসাই ফুল।

বনসাই বিলাসীরা দুঃসহ নিলামে কিনতে চাইলো

এক আকাশ ভুল!

বনসাই ফুল।

তারপর—-

এক আকাশ থেকে অন্য আকাশ

এক সীমারেখা থেকে আরেক সীমারেখা,

উড়ে চলল বিষন্ন বনসাই রেণু।

সহসা বাতাসে বেজে উঠলো বিউগল,

সমগ্র ব-দ্বীপ জুড়ে চাষ হলো বনসাই বীজ!

আর সেখানে তেইশটি মোহনায়,

অকারণ চুম্বনে হেসে উঠলো—

অরক্ষিত অর্ধ কোটি করুণ ক্যাকটাস!

 

আফরিন আহমেদ

মাপজোখ 

যারা আজও স্বপ্ন দেখে, তাদেরকে আমার হিংসে হয় খুব।

যারা দুঃস্বপ্নটার সাথে চোর ডাকাত বাবু পুলিশ

খেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তারপর আবার কিভাবে জানি

জিতেও যায়, তাদেরকে আমার সত্যি সত্যি খুব হিংসে হয়!

যারা এখনো কিছু স্বপ্ন বাস্তবে আসবে বলে

বিশ্বাস করে যাপন করে অর্থহীন রাত, রাতের পরের

অর্থহীন দিন, তাদেরকে আমার হিংসে হয়, জানো।

যারা বৃষ্টিতে ভিজতে পারে মনের জলমেঘ সব অকপটে

একপাশে সরিয়ে রেখে, তাদেরকে আমার কী হিংসে যে হয়!

এই দেখো, আমি বৃষ্টিতে ভিজতে পারিনা।

বেশ বয়স হয়েছে তো, তাই না?

ভিজতে গিয়ে পা পিছলে গেলে আর রক্ষা আছে!

বয়স বাড়ার সাথে সাথে জুতার দাম বেড়ে যায়, জানো?

কম্ফোর্টেবল আবার স্টাইলিশও হতে হবে।

অত দামি জুতা পরে বৃষ্টিতে ভেজা যায় নাকি!

বড়জোর বরফের দিনে বৃষ্টি নামলে চুলটা

আলতো ভিজিয়ে ডিএসএলআর এর সামনে এই একটুক্ষণ

সাজানো হাসি হেসে দাঁড়ানো যায়।

আর দেখো অত দাম দিয়ে একটা মাসকারা কিনলাম, তা ওয়াটারপ্রুফ না।

সব ভেজাল ভেজাল।

এই ভেজালের অভ্যস্ত জীবনে তাই

কাউকে কাউকে আমার খুব হিংসে হয়।

তার চেয়ে বরং এই ভিজে নেতিয়ে পড়া  দিনে এয়ারটাইট কোন এক

সুসজ্জিত কক্ষে এসির হামিং বার্ড সাউন্ডের সাথে

আঁচল দুলিয়ে বসে মেপে মেপে কথা বলা,

আর মেপে মেপে হাসা, মেপে মেপে খাওয়া,

আর খাওয়ার চেয়েও মেপে মেপে ফর্ক নাইফ নাড়ানোতেই বয়সটা

স্বাচ্ছন্দে থাকে, হুমমম।

মাপজোখের নিয়ন্ত্রিত জীবনে নিয়মছাড়া মাপছাড়া স্বপ্নবাজ মানুষদেরকে

আমার তাই বড় হিংসে হয়।

যারা মাপের বাইরের পরিমাপেও বিশ্বাস করে এই অবেলায়,

তাদের আমি হিংসে করি।

 

মনিরুল ইসলাম

অন্ধ হয়ে যাই

আমরা তবে অন্ধ হয়ে যাই

চোখগুলো থাকুক বন্ধ

মনের সাথে চোখের সাথে

মিটে যাক সব দ্বন্দ্ব!

 

আমরা তবে মূক হয়ে যাই

সময়ের সাথে স্তব্ধবাক

কিংবা থেমে যাক কোলাহল

স্থবির হোক পাখিদের ঝাঁক!

 

আমরা তবে নিশ্চল হয়ে যাই

দুলুক অমরাবতী ঝালর

নদীর স্রোতে শৈবাল ঘিরে থাক

বাতাসে শুধু মায়াবী চাদর!

 

শওকত আহসান ফারুক

দূরগামী 

জানি তুমি এ’সময়ে অফিসের পথে;
দেহঘড়ি জানিয়ে দেয়,
‘এই উঠো, সাতটা বেজে গেছে, ওঠো…।’
ছেলে স্কুলে যাবে, ওর টিফিন সাজাতে হবে,
গতরাতে বলেছে সে,
‘মা, আমাকে চিকেন ফ্রাই করে দিও, সস্ দিতে ভুলোনা যেন।’
ঘুমঘুম, তুমি ঘুম চোখে এ’সব গুছিয়ে
আটটার গাড়ি ধরতে হলে ব্যস্ত।

‘ইস্ সক্কালবেলা এতো কাজ কেন?
শাড়ির সাথে ব্লাউজ ম্যাচ করতে চলে গেলো
মিনিট পনেরো।
রাগে গা জ্বলছে, উনি এখনও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে,
রাতে তার সব চাই, আমাকে চাই, শরীর চাই,
সোহাগ চাই, চাওয়ার কোন শেষ নাই।

দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছি, ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে,
সময় পালাচ্ছে অতি দ্রুত…
মনের খবর রাখবে, সেই সময় কোথায়।

যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবো,
দেখে নিও,
মনের খবর রাখো না, অথচ তোমার সব ঠিকঠাক চাই!’

লালটিপ খুঁজে পাচ্ছো না এখনও
ঘড়ি তখন আটটা জানিয়ে দিলো।

সব ক্লান্তি মুছে দূরগামী বাসে উঠে,
তুমি আমার কথা কেন, ভাবছ…!!

 

 

অপরাজিতা অর্পিতা

কাঠগোলাপ ও পড়ন্ত বিকেল

 

ব্যস্ততম দুপুর কেটে গেলেই

পড়ন্ত বিকেল জেগে ওঠে কমলা আলোয়,

অহেতুক অস্থিরতায় পাওয়া বিকেলগুলো

প্রাত্যহিক দিনলিপির পাতা উল্টায় ভীষণ নির্লিপ্ততায়,

কাঠ গোলাপের মালা হাতে

মুখ ফুটে কখনো বলা হয়নি

বিগত প্রেমের বিড়ম্বনার কথা।

ঝলমলে তরতাজা কাঠগোলাপে বড্ড মায়া আমার,

পথের ধুলোয় লুটোনো আঁচলের মতো

সামলে রাখতে পারিনি তাদের।

পরাবাস্তব নিরবতায় ভেসে আসে কিছু অস্পষ্ট শব্দ,

অস্থির মনের মতই বেসামাল।

 

দীর্ঘ একটি দিন কাটাবার আবেগ

বোধের ঘরের বন্ধ দরজায় এক ঘেয়ে কড়া নাড়ে,

সন্ত্রাসী শব্দগুলো আছড়ে পড়ে অতিথি পাখির মতো,

কোথায় ছিলো যে তারা এতোদিন, কে জানে!

চোখেরা বুজে আসে ক্লান্তিতে

তবুও তোমায় দেখা যায়না।

সন্ধ্যা নামতেই

ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা কাকের দল হারিয়ে যায়

পড়ন্ত বিকেলের কমলা আলোয়,

ক্লান্তিতে নুয়ে আসে শরীর।

 

কত পথিক, কত গল্প এলো গেলো,

কত পরিচিত ঘ্রাণের আশায়-

কত ক্ষত্রিয় জন্ম কাটলো

কার পদধ্বনি শোনার প্রত্যাশায়-

আমি আর কাঠগোলাপেরা,

চুপিচুপি নিস্তরঙ্গ সময়েও কান পেতে থাকি,

যদি সন্ধ্যে নামার আওয়াজ শোনা যায়!

অলংকরণ: গুগল

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box