সাদা মেঘ, সবুজ পাহাড়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে হিমালয়ের আকাশে বর্ষাশেষে ঝুলে থাকা মেঘেরা যতটুকু উড়ে বেড়ায় সেগুলোতে আর বর্ষণ ক্ষমতার কিছু অবশিষ্ট থাকেনা। এই হালকা মেঘমালা বিচ্ছিন্নভাবে নানান আকৃতি নিয়ে ভেসে বেড়ায় আকাশে, তাড়া করে ফেরে একে অপরকে, শেষে সূর্যাস্তের সময় পশ্চিমাকাশকে অপরূপ সাজে সাজিয়ে দিয়ে একসময় মিলিয়ে যায়।
আমার মতে এটাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সময় পাহাড়ে। বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ের গাত্র এখনো পান্নারঙের উজ্জ্বল সবুজ; কড়কড়া সতেজ বাতাস, শীতের কামড় এখনো এক-দু’মাসের ওধারে। এসময়ে যারা পায়ে হেঁটে উন্মুক্ত রাস্তা ধরে বেড়াতে চান তাদের জন্য তখনো রয়েছে ঝরনা, স্রোতস্বিনী, নিচে শিলাস্তরে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকাজলপ্রপাত, এ সবই জীবন্ত। বছরের বেশিরভাগ সময় এগুলো শুকিয়ে যায়। গত মে মাসে দেখা গিরগিটিটা এখন আর নেই গ্রানাইট পাথরের উপরে, তবে পাথরনুড়ির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতের এখানে ওখানে পাথরের উপরে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে একটা ফুটকিওয়ালা ফর্কটেইল পাখি।সিকাডা জাতের ঝিঁঝির কানফাটানো উৎকট শব্দপীড়নের পরিবর্তে এখন ক্রিকেট গোত্রের ঝিঁঝি ও ঘাসফড়িঙের ভদ্রচিত আওয়াজ।
আপনি বোধহয় জানেন যে সিকাডা শরীরের সঙ্গে তার পা দ্রুতগতিতে ঘসে এই শব্দ করে, ঠিক যেভাবে তারের সঙ্গে ঘসে ঘসে বেহালার ছড় শব্দ তৈরি হয়। এ অনেকটা অর্কেস্ট্রার সুর বাঁধার মতো, সিম্ফনি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনা। কানে একটু কালা রুবি খালা সিকাডা ঝিঁঝির আওয়াজ উচ্চগ্রামে চড়লেই কেবল তা শুনতে পান। তাঁর বাসা একটা বোর্ডিং স্কুলের কাছে। একদিন যখন তাঁকে বললাম যে আমি স্কুল থেকে আসা সমবেত কয়ার সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছি, তখন তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, বাছা। এরা পা দিয়ে এই আওয়াজ করে, তাইনা?’
ওই কথা মনে হলে আমাকে মানতেই হয় যে ওই স্কুলের কয়ার সঙ্গীত দূর থেকে শুনতে কিছুটা কিচির মিচিরের মতো লাগে বটে।
এই সময়টাতে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে বেশি জংলা ফুল ফোটে।
পাহাড়ের কিনারা ফুল ও ফার্নে ছাওয়া। বিছিয়ে থাকা বুনো আদার গাছ, ক্লেমাটিস ফুলের জটলা, ইয়ারো ফুল ও লতার বিস্তার, সঙ্গে লেডিজ ম্যান্টেল লতা। ধুতুরা ফুটে আছে সর্বত্র তার কাঁটাওয়ালা ফল সহ। জংলা উডবাইন আছে যার ডাঁটা দিয়ে গাঁয়ের ছেলেরা বাঁশি বানায়।
আরয়ড রয়েছে ছড়িয়ে এখানে সেখানে। দেখতে মজার হওয়ায় এরা বেশ দৃষ্টি কাড়ে -ফনা তোলা সাপের মাথার মতো লাগে বলে একে কোবরা লিলি নামেও ডাকে লোকজন। এই ফুলের লম্বা জিভের মতো ফলে মাছিরা এসে বসে। পুরুষ ফুলের গোড়ার দিকে জমে থাকে এক ধরনের মাদক তরল, যার আকর্ষণে মাছি আসে। এতে করে পরাগায়ন সহজ হয় এই ফুলে। অ্যালকোহলে আসক্তি শুধু মানুষেরই নয়। জানা গেছে রডোডেনড্রনের রস পান করে ভালুকরা মাতাল হয়, বাম্বলবি বা ভ্রমরদেরও পানাসক্তির কথা শোনা যায়।
আরো দর্শনীয় একটা কোবরা লিলি আছে যার নাম হলো ‘সাওরোমোটাম গুটাটাম’ ( কোনো উদ্ভিদবিদের কাছ থেকে মানেটা জেনে নেবেন)-এক পাতার এই গাছের ফুলের রয়েছে একটা বেগুনি অবগুণ্ঠন। এক সময় বীজ হয়ে তা মাটিতে সেঁধিয়ে যায়, বর্ষার পরে একসময় একগুচ্ছ লাল ফল নিয়ে তা মাটি ফুড়ে বেরিয়ে আসে। স্থানীয়রা মনে করে যে এই লাল ফল-দর্শন হলো বর্ষাবসানের নিশ্চিত আলামত, আবহাওয়া বিভাগের ভবিষ্যতবাণীর চাইতে তা অনেক নির্ভুল। এখানে যমুনা ও ভাগীরথীর মধ্যবর্তী জায়গাটাতে আমরা ওই ফল দেখার পক্ষকাল পর থেকে আসন্ন সুন্দর আবহাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে যাই।
তবে হিমালয়ের যে কোনো ফুলের মধ্যে কোমেলিনা আমার মন কাড়ে বেশি। এটার কারণ এই ফুলের নিখাঁদ নীল বর্ণ-ঠিক যেন গাঢ় নীলাকাশের পরিষ্কার প্রতিফলন।বর্ষা শেষে হঠাৎ যেন উদয় হয় এই ফুল সপ্তাহ দুয়েকের জন্য, এরপর সব মিলিয়ে যায় পরবর্তী বর্ষা না আসা পর্যন্ত।
প্রথমবার কোমেলিনা দর্শনেই আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই, এর রূপ-শোভা উপভোগের সময় বাকি পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে থাকে। এই ফুলের কমনীয়তা আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে যে আমি অপরাপর বাস্তবতা বিস্মৃত হই।
তবে আমার মন্ত্রমুগ্ধভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়না। ট্রাকের কর্কশ হর্ন আমাকে রুঢ় বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে, আমি নিজেকে হিল-স্টেশন থেকে বের হয়ে আসা প্রধান সড়কের উপর আবিষ্কার করি। ডিজেল পোড়া গন্ধ আর একরাশ ধুলা আমার বোধকে নাড়া দিয়ে ভিন্ন বাস্তবতার সংকেত দেয়। এই অকস্মাৎ আগ্রাসনে ক্ষণিকের জন্য কোমেলিনার কথা ভুলে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই তাকে যখন আবার দেখি তখন প্রধান সড়ক রেখে ছোটো রাস্তা ধরি।
সহসাই আমি শহরের হট্টগোল পিছনে ফেলে আসি। রুবি খালা কী যেন বললেন সেদিন শহর সম্পর্কে? ‘পাঁচ মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো এক জায়গায়, ওরা তোমার মাথার উপরেই একটা হোটেল বানিয়ে ফেলবে।’
বাইবেল চরিত্র লট্, তাঁর স্ত্রী না লবনের স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলো পালিয়ে আসার সময়তার প্রিয় শহরের দিকে ফিরে ফিরে চাইবার জন্যে? আমার মনে হলো পিছনে ফিরে তাকালে আমি হয়তো সিমেন্টের স্তম্ভে রূপান্তরিত হবো। উপত্যকায় দেবসারি নামে এক গাঁয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম আমি। ‘ডেভেলপার’ আর বড়ো পয়সাওয়ালারা সহসা এখানে আসবেনা, কারণ এখানে গাড়ি চলার উপযোগী রাস্তা হয়নি।
একটা চায়ের দোকান হাতছানি দিচ্ছে। এইসব পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার পাশে এরকম চায়ের দোকান ছাড়া কী চলে? ছোটোখাটো সরাই, এরা খাবার ও রাতের আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, একসঙ্গে বারো জনেরও।
একটা বান্ নিয়ে যুদ্ধ করি আমি, দেখে মনে হয় আজাদির আগে তৈরি। পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে পাথরের মতো শক্ত, তবে মিষ্টি চায়ে ডুবিয়ে খেতে মন্দ লাগছেনা।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]