সাদ ভাইয়ের মতো মানুষের জন্যেই বেঁচে থাকবেন বঙ্গবন্ধু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রূপ রেজা

(নর্থ ওয়েলস,ব্যাঙ্গর, ইংল্যান্ড থেকে): আজকে আমি একজন অন্য রকম মানুষের কথা বলার জন্যে লিখছি। আমি লেখক না। তাই সুলিখিত ধারাবাহিক ভাবের প্রবাহ আমার কাছে আশা করা ঠিক হবে না। অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকাও অস্বাভাবিক নয়। আমি কেবল এই মানুষটির প্রতি আমার ভালবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ এর কারনে লিখছি।

ছবির এই ভদ্রলোকের নাম সাদ উদ্দিন । আদি বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। গত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে ইষ্ট লন্ডন এর বাসিন্দা। আমি ডাকি সাদ ভাইসাব। বছর তিনেক আগে কর্মসূত্রে আমার সঙ্গে তার পরিচয়। নর্থ ওয়েলস এর পুথেলি Pwlheli ( ওয়েলশ উচ্চারণ খুবি গোলমেলে) বলে এক ছোট্ট শহরে আমি কাজ করতাম এক বাঙালি রেস্তোরাঁতে। সেখানেই আমার সঙ্গে পরিচয়। আমার সহকর্মী । ছোটখাট মানুষ । বয়স ষাটের মত। হাসি খুসি সহজ সরল লোক। প্রথম দিনেই আমার সঙ্গে বেশ জমে গেল সাদ ভাইসাবের। আমাকে নাকি তাঁর পরিচিত এক সামরিক

লেখকের সঙ্গে সাদভাইসাব

কর্মকর্তার মত লাগে। তাই ডাকেন ‘কর্নেল সাব’ । জানলাম সেই ষাটের দশকে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে এসেছিলেন এই দেশে। সেই থেকে আছেন। তিন মেয়ে দুই ছেলের পিতা। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে তাদের মায়ের সঙ্গে লন্ডনের বাড়িতেই থাকে। ওখানেই কাজ করে।

রেস্তোরাঁতে ভিড় না থাকলে আমাদের আড্ডা হয়। কখনও কিচেনে শেফদের সৌজন্যে নাস্তা খেতে খেতে সবাই আড্ডা দেই। আমি বাদে সবাই বৃহত্তর সিলেট জেলার মানুষ । সপ্তাহে দু’দিন আসে স্থানীয় তরুনি ডেমি। আস্তে আস্তে বুঝতে পারি সাদ ভাইসাব স্বাধিনতার পক্ষের লোক। এই দেশে দেখেছি শুঁড়িখানা গুলোতে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। নো পলিটিক্স নো ফুটবল নো রিলিজিয়ন । উটকো ঝামেলা রুখতে পাব মালিকদের অলিখিত আইন। তেমনি আমারও আছে। তবে ফুটবলের জায়গায় ক্রিকেট। আমি সাধারণত চুপ করে বাকি সবার মতামত শুনতেই পছন্দ করি এসব আড্ডায়।

দীর্ঘদিন এদেশে থেকেও সাদ ভাইসাব খুব একটা স্বছল মানুষ নন। নিজে কয়েকবার ছোটখাট ব্যবসা করতে যেয়ে বেশ কিছু টাকা কড়ি খুইয়েছেন। তবু প্রায় প্রতি বছর দেশে যান । মাস দু’মাস কাটিয়ে আসেন। আমি কিছু দিনপর কাজ ছেড়ে দিলাম ঠিকই কিন্তু সাদ ভাইসাবের সঙ্গে সম্পর্কটা রয়ে গেল। ট্রেনে করে লন্ডন যেতে হলে ব্যাঙ্গর Bangor (আমি যে ছোট্ট শহরে থাকি) থেকে যেতে হয়। আগের রাতেই আমাকে ফোন করে জানিয়ে দেন কখন আসবেন। তারপর ট্রেন আসা পর্যন্ত স্টেশনে বসে কফি খেতে খেতে আড্ডা চলে। আবার লন্ডন থেকে ফেরার সময় সেই একই রুটিন। আর হাতে করে নিয়ে আসেন কখনো আমার অতি প্রিয় এক প্যাকেট মুড়ি কিংবা দেশি চানাচুর। কখনো দেশি দোকানের মিস্টি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সাদ ভাইসাবের বয়স আঠার উনিশ। লন্ডন জুড়ে সব সভাসমিতিতে অংশ নিয়েছেন। নিজেদের এলাকা ব্রিক লেইনে পাকিস্তানি তরুনদের সঙ্গে হাতাহাতি মারামারি করেছেন, ওদের সঙ্গে সব লেনদেন বর্জন । বাঙ্গালীদের বাধা দিয়েছেন পাকিস্থানী দোকান থেকে কেনাকাটা করতে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদা তুলেছেন শরণার্থীদের জন্যে । সাদ ভাইসাবের কাছেই প্রথম শুনি মানবাধিকার কর্মী পাকিস্তানি তারেক আলির কথা। তারেক আলি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত হোয়েও বাংলাদেশের স্বাধিনতার পক্ষে রেডিও টিভিতে পত্রিকায় বক্তব্য বিবৃতি দিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি এই তারেক আলি আবার ছিলেন কুইন এর গায়ক রক স্টার ফ্রেডি মার্কারির ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

বাহাত্তরের জানুয়ারিতে কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করলেন যাবেন জয় বাংলায়। মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে। লন্ডনে অস্থায়ী হাইকমিশন থেকে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বিশেষ অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। জুলাই মাসের চার তারিখে নামলেন তেজগাঁ বিমান বন্দরে। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি। নিজের দেশের মাটি। ত্রিশ লাখ শহিদ আর দু’লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের মুল্যে কেনা। এক অজানা আবেগ আর সুখে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে। সবার দু’গাল বেঁয়ে নামছে আনন্দশ্রু ।

সাদ ভাইসাব

যাবেন সিলেট। অপেক্ষা করছেন ফ্লাইটের জন্যে। হঠাৎ শুনলেন বেশ শোরগোল । উৎসুক হয়ে দেখলেন বঙ্গবন্ধু আসছেন। হেলিকপ্টারে করে যাবেন চট্টগ্রাম । বিলাত থেকে আসা সবাই দেখতে চান, কথা বলতে চান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। বিমান কর্মকর্তারা জানাতেই বঙ্গবন্ধু রাজি হয়ে গেলেন। লাইন ধরে একে একে সবাই হাত মেলাবেন স্বাধীন বাংলার রূপকার জাতির জনকের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু ধন্যবাদ দিলেন সবাইকে । বললেন দেশের দুর্দশার কথা। দেশে বন্যা হচ্ছে। খাদ্যাভাব। দেশের মানুষের জন্যে ভীষণ উদ্বিগ্ন তিনি । তরুন সাদ ভাইসাবের বুকের মধ্যে যেন হাতুরি পেটাচ্ছে । এর আগে লন্ডন এ দেখেছেন কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু কে অনেক দূর থেকে। কিন্তু এত কাছে ! বঙ্গবন্ধুর হাতে হাত রাখবেন ! হাস্যমুখ সাবলীল বঙ্গবন্ধুকে মনে হল কত চেনা কত আপন। মুহূর্তে সবাইকে আপন করে নিলেন তিনি। মনে হলো যেন অনেক দিন ধরেই সবাইকে চেনেন । ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর সামনে এসে দাড়ালেন তরুন সাদ ভাইসাব।হাত মেলালেন জাতির জনকের সঙ্গে। তার তরুন করতল আর কোনদিন ভুলবে না সেই স্পর্শ । আজও যেন অনুভব করতে পারেন সেই মুহূর্ত সেই ক্ষণ । জাতির জনকের হাতে হাত রেখে মনে মনে করলেন এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা । যতদিন বাঁচবেন বাঙ্গালী বাংলাদেশি পরিচয়ে বাঁচবেন ।

কিছুদিন পর সিলেট থেকে সংগ্রহ করলেন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলদেশের পাসপোর্ট । সেই থেকে আজ পর্যন্ত সাদ ভাইসাব তার বাংলাদেশি পরিচয় ত্যাগ করেননি। স্ত্রী সন্তান সবার ব্রিটিশ পাসপোর্ট । বঙ্গবন্ধুর হাতে হাত রেখে করা সেই গোপন প্রতিজ্ঞা আজো বুকে লালন করে বেঁচে আছেন এই ছোটখাট কিন্তু ভীষণ শক্তিধর মানুষটি । গর্বের সঙ্গে বহন করেন তার পরচিয় ; “ আমি বাঙ্গালী , আমি বঙ্গবন্ধুর লোক”। তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট । বদলে কোনদিন কিছু চাননি। বরং নিজের কষ্ট করে কামানো টাকা থেকে দেশে নানা কাজে সাহায্য করেন এখনও । করতে চান আমৃত্যু ।

আমরা যারা প্রবাসী তারা জানি এসব দেশের পাসপোর্টের জন্যে কত মানুষ কত ত্যাগ স্বীকার করে। কিন্তু আমরা জানি না বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা এ সব সাদ ভাইসাবদের কথা। আমার কাছে সাদ ভাইসাবও যেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ।  আমার দারুণ সৌভাগ্য এমন একজন মানুষকে আমি চিনি, জানি, কফির কাপ হাতে আড্ডা দেই, হাসি ঠাট্টা করি।

সাদ ভাইসাবরাই বঙ্গবন্ধুর সৈনিক । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শক্তি । সাদ ভাইসাবের মতো মানুষের জন্যেই বেঁচে থাকবেন বঙ্গবন্ধু। বেঁচে থাকবে প্রিয় বাংলাদেশ। লাল সালাম ।জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হাসিনা।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]