সাধারণে অসাধারন সৈয়দ লুৎফুল হক…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

প্রতিদিন সকাল ৬ টায় আমাকে বের হতে হয়। তাই খুব ভোরে আমাকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। আজ একটু বেশী আগেই ঘুম ভেঙ্গেছিলো। জেগেই অভ্যাসবশতঃ বালিশের পাশে থাকা মোবাইলে সময় দেখি। ভোর রাত ৪টা বাজে। আধো ঘুম আধো জাগরনে ফেসবুকে ঢুকতেই দুঃসংবাদ। মুহুর্তে মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। আমাদের প্রিয় চিত্রশিল্পী সৈয়দ লুৎফুল হকভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন।

কি আশ্চর্য, মনের দিক থেকে চিরতরুন,পোষাক -আশাকে তারুন্যকে ধারন করা এমন মানুষটি হুট করে এতো দ্রুত চলে যাবেন কল্পনায়ও ছিলো না।

লুৎফুলভাইয়ের মৃত্যুসংবাদে মনখারাপ করা একটি দিন গেলো। সারাদিনই কাজের ফাঁকে ফাঁকে কত স্মৃতি উঁকি দিয়েছে। কখনো বাস্পরুদ্ধ হয়েছি,কখনো চোখ ভিজে উঠেছে। বাসায় ফিরেও ভাল লাগছে না। কি লিখবো প্রিয়জনের বিয়োগব্যথায়?

লুৎফুলভাইয়ের সঙ্গে যখন পরিচয় হয় তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। সম্ভবত ১৯৮৬ সালের মার্চের কোন একদুপুরে।একদিন দৈনিক বাংলায় তার সঙ্গে নাটকীয়ভাবে আমার পরিচয় হয়। দৈনিকবাংলার শিশু কিশোরদের সাপ্তাহিক পাতা ‘সাতভাই চম্পা’য় আমি নিয়মিত ছড়া লিখি। সেই সুত্রে প্রায় সোমবার দুপুরে সাতভাই চম্পার সম্পাদক আফলাতুন ভাইয়ের টেবিলে ছড়া নিয়ে যাই। এমনই এক সোমবার আমার সঙ্গে ছিলো প্রয়াত ছড়াকার ওয়াদুল গনি চন্দন।

নামের শেষের ডাক নাম ছেঁটে দেয়ার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে চন্দন ও আমি আফলাতুনভাইয়ের ঝাড়ি খেয়ে মুখ কালো করে সিঁড়ি দিয়ে নামছি। সিঁড়ির মুখেই দেখা বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সৈয়দ লুৎফুল হকের সঙ্গে। কাকে যেন বিদায় দিয়ে উপরে উঠছেন তিনি। চন্দনকে আগে থেকেই তিনি চিনতেন। দু’জনেই ময়মনসিংহের মানুষ। সেই কারনে তিনি চন্দনকে স্নেহ করতেন। চন্দনের মুখ কালো দেখে বুঝতে পারেন কিছু একটা হয়েছে।সিঁড়িপথ আগলে স্বভাবসুলভ কন্ঠে জিগেস করেন, কি মিয়া,মুখ বেজার ক্যান? ঝাড়ি কি বেশী হইছে?

লুৎফুলভাইয়ের কথা শুনে আগুনে যেন ঘি পড়লো। ব্যস চন্দনকে পায় কে! প্রিয়মানুষের কাছে আফলাতুনভাইয়ের ওপর জমে থাকা রাগ ঢেলে দেয়।

-আফলাতুনভাই ডাকনাম ছাইটা ছড়া ছাপছে। এইডা একটা কথা হইলো ভাই? আমারে সবাই চেনে চন্দন নামে। ওরে চেনে রনি নামে। আপনি কন এইডা অন্যায় কিনা?

লুৎফুলভাই বুঝে গেছেন পাগল ক্ষেপেছে। তাকে থামানো দরকার।

জিগেস করলেন, খাইছে কিছু। চলো আমার লগে।

লুৎফুলভাই আমাদের নিয়ে গেলেন ঢাকা স্টেডিয়ামের পুর্ব গেইটের ইসলামিয়া রেস্তোরাঁয়। ভাত, মাংস, ডাল দিয়ে পেটপুরে খাওয়ালেন। খেতে খেতে তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় চন্দন। সেই শুরু…।

তারপর তার সঙ্গে দৈনিক বাংলা, প্রেসক্লাব,পুরানা পল্টন, ক্যাফে ঝিল,একুশে টিভির ক্যান্টিনে কত গল্প, কত আড্ডার স্মৃতি। সেইসব ভুলি কি করে?

লুৎফুল ভাই সম্পর্কে এ প্রজন্ম কিছুই জানে না, তাকে হয়তো চেনেও না। তিনি যে কতবড় গুনী একজন মানুষ ছিলেন। তার সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা ভাল করেই তাকে জানেন। লুৎফুলভাই সব সময় প্রচারবিমুখ দুর্লভ মানুষদের একজন। নিভৃতে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার জলরংয়ে আঁকা ছবি যারা দেখেছেন,তারা তাকে এ মাধ্যমের শীর্ষস্থানীয়দের শীর্ষবিন্দু বললেও অত্যুক্তি বা একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না।

তিনি একাধারে শিল্পী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি। তাঁর চিত্রকলা বিষয়ক গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ,কবিতা বোদ্ধা পাঠকের মন জয় করেছে ।চিত্রকলার ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী বিষয় ও জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, যা সহজেই মানুষকে স্পর্শ করে যেমনটি তাঁর লেখা ও কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। দীর্ঘদিন সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে তাঁর নিয়মিত ছবি আঁকার বিষয়টি হয়ে ওঠেনি। সময় পেলেই ছবি আঁকার চর্চাটি অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রথম এককচিত্র প্রদর্শনী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। যদ্দুর মনে পড়ে, সেই প্রর্দশনীতে তার সব ছবি ছিলো জলরংয়ে আঁকা। ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার অলিগলি, বুড়িগঙ্গা, সদরঘাট, জনজীবন। অসাধারন ছিল তার সেইসব কাজ।

দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় গল্প,কবিতার তার ইলাস্ট্রেশানগুলো এখনো চোখে ভাসে।

সৈয়দ লুৎফুল হক ১৯৪৯ সালে ময়মনসিংহ জন্মগ্রহন করেন। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউটে। কর্মজীবনে প্রথমে দৈনিক ইত্তেফাক, মর্নিং নিউজ, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা ও দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টে শিল্প সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি শুধু ছবিই আঁকেননি, কাঠ মেটালের ম্যুরাল, টেরাকোটা ও মোজাইক ম্যুরাল নির্মাণসহ বইয়ের প্রচ্ছদ, নাটক ও সিনেমার শিল্প নির্দেশনা ও পোস্টারের অসংখ্য ডিজাইন করেছেন। গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, দুই পয়সার আলতা, সূর্যদীঘল বাড়ী, সখিনার যুদ্ধ, শুভদাসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রের সফল শিল্প নির্দেশক ছিলেন।

তিনি যমুনা মাল্টিপারপাস ব্রিজের ডিজাইন কনসালট্যান্ট ছিলেন।

নেদারল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রাফিক ডিজাইন, ফটোগ্রাফি ও ম্যানেজমেন্টের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। টেক ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে লিডারশিপ অন সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট, প্রফিটেবল নেগোসিয়েশন ও সুপারভাইজরি ম্যানেজমেন্টের উপর আন্তর্জাতিক সনদ লাভ করেন। সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলোর ডিজাইন করেছেন। ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড হেলথসহ অনেক আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকেই জানেন না, স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলির নকশাঁ তাঁরই করা। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে সংবাদপত্রের ডিজাইন, চিত্রকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হাজার বছরের ঢাকার চিত্রকলা, ঢাকাই মসলিন, বিস্ময়কর আরব চিত্রকলা এবং ছড়ার বই কত কথা কত মজা উল্লেখযোগ্য।মোট ১৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর বই মেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরো তিনটি বই ।

লুৎফুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিলো নব্বই দশকের শেষে। তখন তিনি পুরানা পল্টনে গ্রাফিক ডিজাইন, ড্রাম স্ক্যানের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কস্তুরী হোটেলের পিছনে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ছিলো। তার ছোটভাই প্রতিষ্ঠানটি দেখাশুনো করতেন। আমিও সেই সময় প্রিন্টিং ও সাপ্লাইয়ের টুকটাক ব্যবসা করি। আমার মহল্লার দুই ছোটভাই সজল সেনগুপ্ত ও ইমতিয়াজ তখন সেখানে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে চাকুরি করে। আমি তাদের কাছে যেতাম বিভিন্ন পোস্টার,ব্রোশিয়র ডিজাইনের জন্য। তখনো জানতাম না এ প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমাদের প্রিয় লুৎফুল ভাই। একদিন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মালিক খসরুভাইসহ পোস্টারের কাজ করছি, এসময় দেখি লুৎফুলভাই ঢুকছেন। চোখাচোখি হতে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, অই মিয়া তুমি এইহানে কি করো?

আমার রুমে আসো।

সজলকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে লুৎফুলভাইয়ের ছোট বসার রুমে ঢুকতেই তিনি বললেন, আগে কও চায়ের সঙ্গে কি খাইবা?

আমি কিছু বলার আগেই তিনি বেল টিপে টি-বয়কে বললেন, গরম পেয়াজু, মুড়ি নিয়ে আয়।

সেই বিকেলে পেয়াজু, মুড়ি, চা খেতে খেতে অনেক গল্প করলেন। কখন যে রাত হয়ে গেছে টেরও পাইনি।

এরপরও লুৎফুলভাইয়ের গ্রাফিক ডিজাইন সেন্টারে বহুবার লম্বা আড্ডা হয়েছে। মাঝেমাঝে আসতেন পুরানা পল্টন নিবাসী প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদারসহ আরো অনেকে। সেইসব আড্ডায় আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। তাই একটু বেশী স্নেহ ও প্রশ্রয় পেতাম।

সৈয়দ লুৎফুল হক খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন।কিন্তু পোষাক আশাকে ছিলেন কেতারদুস্তর।সব সময় জিন্সের প্যান্ট পরতেন।কখনোই তাকে জিন্সের বাইরে অন্য কাপড়ের প্যান্ট পরতে দেখিনি। পরতেন রঙিন বাহারি পোশাক। হাতের কব্জিতে দামী ঘড়ি। সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের ক্যাপ না হয় টুপি পরতেন। পোষাকের রংয়ের বাহার দেখে একদিন বলেছিলাম, সিম্পল এক রঙয়ের শার্টে কিন্তু আপনাকে দারুন দেখায়।

হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন,ধুর মিয়া, আমি কি বুইড়া সাদা কালো পরুম ! রংচঙের শার্ট মনকে সজীব রাখে। যতো পারো রঙের ওপর থাকবা, মন দেখবা ভাল থাকবো।

লুৎফুলভাই আড্ডায় জমে গেলে সেই আড্ডা সহজে ছেড়ে আসা যেত না। কালেভদ্রে নানান কাজে প্রেসক্লাব যেতাম। সেখানে বেশ ক’বার তার সঙ্গে আড্ডা হয়েছে। কিন্তু আমার মনজুড়ে আছে পুরানা পল্টনে তার অফিসের আড্ডার কথা। কথা বলতে বলতে উচ্চস্বরে হাসতেন। হাসিতে তাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাতো । সেইসব আড্ডায় তার শৈশব, কৈশোর, যৌবনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন, কর্মজীবন, সিনেমার শিল্প নির্দেশনা ও বিখ্যাত মানুষদের নিয়ে অনেক কথা বলেছেন।

একবার তাকে জোর করে নিয়ে এসেছিলাম আমার প্রযোজিত একুশে দুপুর লাইভ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে একুশে টেলিভিশনের ক্যান্টিনে আমরা দীর্ঘ তিনঘন্টা আড্ডা দিয়েছিলাম। তার সঙ্গে আড্ডা মানে অনেক কিছু জানার ও শেখার ছিলো।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার গর্ব ছিলো। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু কখনো তিনি এ বিষয় ভাঙ্গিয়ে কিছু করেননি। প্রতিদান চাননি। অন্যদের চেয়ে এ ক্ষেত্রে সৈয়দ লুৎফুল হক ছিলেন ব্যতিক্রম ও অন্যন্য ।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি শিল্পকলাবিষয়ক অনেক বই লিখেছেন। আমাদের সৃষ্টিশীলতার জগতকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে গেছেন।

তার হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে কস্ট হলেও ভারাক্রান্ত মনে তবুও বলি, প্রিয় লুৎফুলভাই আপনি অনন্তযাত্রায় ভাল থাকবেন। বিদায় প্রিয়শিল্পী।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box