সামসু’র ভাইগ্না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সা’দ জগলুল আববাস

চিনবার পারলাম না। যাউকগা, মগর ঐ পোলাডা কেঠা, চশমা পড়া  চাদ্দর গায়ে…হ ঐযে, মোচঅলা ?”

তারপর সরাসরি আমার দিকে চেয়ে প্রশ্ন, “ আপনে হাসবার লাগছেন কেলা?”

আশির  দশকের প্রথম দিকের  কোন একটা একুশে বই মেলা চলছে, বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গনে ! তখনো  ফেব্রুয়ারির বইমেলা এখনকার মতো এতো প্রসারিত হয়নি। বটগাছটার আশেপাশে আর একাডেমী দালান ঘিরে বইয়ের স্টলগুলোর জায়গা হয়ে যেতো।

বইমেলায় আমার নিয়মিত যাওয়া আসা ছিলো। বিশেষ করে ছুটির দিন গুলোয় ।

সেদিনও ছুটির দিন ছিলো! আমার ছোট ভাই “উন্মাদ” নামে একটা রম্য পত্রিকার সঙ্গে জড়িত  পত্রিকার সম্পাদক আহসান হাবিব, আমার আরেক ভাইয়ের বন্ধু ।

মেলায় উন্মাদের একটা স্টল ছিলো; স্টলে উন্মাদ পত্রিকা ছাড়াও আহসান হাবিবের বড় ভাই, হুমায়ুন আহমেদ এবং জাফর ইকবাল সহ অন্যান্য নামকরা কবি সাহিত্যিকদের বই বিক্রি হতো । সে সুবাদে স্টলে তাঁদের আড্ডাও হতো অটোগ্রাফ দেয়ার ফাঁকে…সেই আড্ডাই আমার বইমেলায় প্রধান আকর্ষণ ছিলো । তাঁদের উপস্থিতির কারণে স্টলে ক্রেতা ছাড়াও ভক্তদের ভিড় হতো, বিশেষ করে উঠতি বয়সী ছেলে মেয়েদের । হুমায়ুন আহমেদের ভক্তই থাকতো বেশি ।

তখন বিকেল প্রায় ৫ টা, ফেব্রুয়ারির প্রথম; শীতের আমেজ কিছুটা রয়ে গেছে, রোদও পড়ে আসছে, বিকালের আলোতে ভরে গেছে পশ্চিম মুখো স্টলটা। আমি এসেছি মিনিট বিশেক হবে, স্টলে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলাম, ছোট ভাই এবং আহসান ক্রেতা ও ভক্ত সামলাতে ব্যস্ত ! আমার বেশভূষা মোটা মুটি  প্রতিথযশা লেখকদের মতোই, পাঞ্জাবির উপর শাল চাপানো, অগোছালো  কিঞ্চিত লম্বা চুলের কয়েকটা এসে পড়ে কপালের উপর দিয়ে চশমার ধার ঘেঁষে ( জ্বি, ঠিকই ধরেছেন, বড় বড় নামি দামী কবি সাহিত্যিকদের মতো ) । ঐ দিন হুমায়ুন আহমেদ ছাড়াও আরও ক’জন লেখক ছিলেন, তাঁদের নামগুলো ঠিক মনে করতে পারছিনা ( হ্যাঁ, বয়সতো এখন একেবারে কম  হলোনা, অনেক বছর আগের  ঘটনা ; স্মৃতি কিছুটা বেঈমানি করতেই পারে। )

আমার সামনেই আমার উন্মাদ ভাই দাঁড়ানো ( ওকে আমরা ঐ নামেই ডাকতাম ), একটা কপোকথন কানে এলো……

  • কি বই লাগবে আপনার ?
  • মামু, একটা উন্মাদ কিনবো ! একটা কিশোর কণ্ঠ শুনে ওদের দিকে মনোযোগটা চলে গেলো, আমার চেয়ে ৬/৭ বছর বড় প্যান্ট শার্ট পরিহিত এক ভদ্রলোক, মুখে পান আর গলার মাফলার জড়ানো… সাথে ১৪/১৫ বছরের একটা ছেলে…ফর্সা , কোঁকড়ানো চুল, বেশ মনকাড়া মুখটা )
  • উমাদ ? হেইডা কি ,বাইগ্না ?
  • উমাদ না মামু, উন্মাদ !
  • মাইনে কি?
  • পাগল
  • কি কস বাইগ্না? পাগলগো বই? কন তো দেহি বাইজান, বাইগ্না কি কইবার লাগছে? কি জালা …ঐ তুই পাগল গো বই পরবি কেলা?
  • মামু, এটা পাগলদের বই না…কার্টুন বই!( স্বাগতঃক্তি… মর জালা…আজকালকার পোলাপান)
  • জাউকগা, বাইগ্নারে এউগা উন্মাদ বই দেন, নয়াটা দিয়েন ভাইসাব!
  • এই যে নেন, গত পরশু বেরিয়েছে ।

উন্মাদ হাতে পেয়ে ছেলেটা মহা খুশি,ওখানেই পাতা উল্টানো শুরু করে দিলো । ভাগ্নের খুশি দেখে ভদ্রলোক হাতে ধরা কৌটা খুলে আরেকটা পান বের করে মুখে পুরে দিলেন । মামা ভাগ্নের কীর্তি দেখে আমিও মোহিত,আমার মুখেও মিটি মিটি হাঁসি ছিলো মনে হয় !

  • বাইসাব, এওগা বাত জিগামু- পানের রসে টইটুম্বুর মুখে আবার প্রশ্ন !
  • জ্বি, বলেন!
  • ঐ যে আপনা গো গদিতে বইয়া রইছে , হেরা কেঠা? ( কথাটা শুনে আমার হাঁসি সামলাতে অনেক কষ্ট হলো )
  • উনারা কবি, সাহিত্যিক ! এই বইগুলো দেখছেন্‌,এগুলো তাঁদের লেখা বই ! ভদ্রলোক এবার বেশ গম্ভীর মুখে একটা বই নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন;বইটা ছিল হুমায়ুন আহমেদের , পেছনের মলাটে তাঁর ছবি।
  • এই পিকচারটা ঐ মিয়ার না ? ঐ যে কোণায় বহা?
  • জ্বি!
  • কি নাম?
  • হুমায়ুন আহমেদ, খুব নামকরা সাহিত্যিক মানে লেখক! দেব বইটা?
  • কি যে কোন বাইসাব, বলে পিচিক করে রক্তের মতো চকচকে লাল পানের রস স্টলের ধার ঘেঁষে ছুঁড়ে দিলেন!
  • চিনবার পারলাম না। যাউকগা, মগর আপনের পিছে বহা ঐ পোলাডা কেঠা, চশমা পড়া চাদ্দর গায়ে…হ ঐযে মোচঅলা?”
  • আপনে হাসবার লাগছেন কেলা? সরাসরি আমার দিকে প্রশ্নটা এলো! আমি একটু অপ্রস্তুত;
  • কই, হাসছিনাতো!
  • হুম…অশিক্ষিত দেইখা মজা লইতাছেন? গলায় এবার একটু রাগতঃ সুর…কিছুক্ষন চুপচাপ পান চিবালেন আর ছেলেটার দিকে চেয়ে রইলেন! ভাগ্নে আপন মনে উন্মাদ পড়ে যাচ্ছে…সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাতি গুলো আগেই জ্বলে ছিলো,এর মাঝে হুমায়ুন আহমেদ ও আর দুজন বিদায় নিয়েছেন;আমি আঁটকে গেছি ঢাকাইয়া ভদ্রলোকের কথোপকথনের জালে… মনটা বলছে এর পর কিছু একটা আছে )
  • আইচ্ছা, ঐ যে কইলেন সাত্তিক না কি জানি, হেরা কি লেহে? আবার ভাইয়ের দিকে প্রশ্ন!
  • গল্প, কবিতা, উপন্যাস , প্রবন্ধ( পরিস্কার বুঝতে পারছি আমার ভাইয়ে ধৈর্যের বাঁধে ফাটল দেখা দিচ্ছে…আমি নিবিষ্ট মনে শুনে যাচ্ছি আর মনে মনে বলছি…আরেকটু চলুক )
  • অ… দারুন এক সবজান্তার ভঙ্গী ভদ্রলোকের কথায়!
  • যাউক গা ,আরেক খান কতা জিগামু বাইসাব?
  • মামু , চলো- বাচ্চাটা তাড়া দিল।
  • খাড়া… আইচছা ঐ যে কইলেন হেরা লেখক লেহে,মগর কি লেহে ?
  • বললাম তো …গল্প, কবিতা- ভাইয়ের কণ্ঠে পরিস্কার বিরক্তি!
  • মাইনে, গপ লেহে?কন কি? আমাগো মায়েরা , নানি দাদীরা তো আমাগো গপ কইত…রাজা রানির গপ কইয়া কইয়া ঘুম পারত..মুহে মুহে হুইন্যা কইত …লেকবার তো দেহি নাইক্যা ! লেহনের কি অইল? আইচছা বাইসাব, আপনে কি আমারে বুদ্ধু সামঝাইতাসেন নাহি? হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে ভদ্রলোক নিজে থেকেই বলা শুরু করল-

কাইল রাইতে সামসু পুরা পেটি মাল টাইন্যা কান্দন আর বইনের গপ। কন তো দেহি কি জালা! বেচারা সামসু! গোলমালের সেসের দিকে হের বইনেরে মিলিটারি হেগো নারিন্দার বাড়িত্থন উঠাইয়া লইয়া গেলো গা…দুইদিন পর রাইতে বইনরে কোনার বিরানির দোকানটার সামনে ফেলাইয়া দিয়া গেলো ……মাল পেটে যাওনের লগে লগে বইনের কথা কইয়া কান্দন সুরু করে! বেবাক রাইতে একই গপ । সামসুর লগে আমারও কান্দন আহে …হের বইনেরেতো আমিও  বইন মানি। বাইসাব কি রাগ করতাসেন নাকি?  ছোটভাই নিরুত্তর …অন্য ক্রেতাদের দিকে তার মনযোগ দেয়াতে হয়তো শুনেও নি..এদিকে উনি বলেই যাচ্ছেন…আমার মুখের হাঁসি তখন উধাও… হঠাৎ উনি  সরাসরি আমার দিকে তাকালেন,

  • কন ত দেহি বাইজান …বইনের গপ কইয়া ডেইলি রাইতে কান্দন ! বাইজানও কি লেহেন নাহি?
  • জ্বি না…!
  • অ; একটু আশাহত হলেন মনে হচ্ছিলো…হয়তো ভেবেছিলেন … তাহলে উনি তাঁদের সাথে কেন বসে আছেন !
  • চা খাবেন? আমার প্রশ্ন শুনে ছোটভাই আমার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে ফিরে তাকালো, প্রচুর ক্রেতা তখন , ভদ্রলোককে কে চা খাওয়াবে ?
  • নাহ বাইজান, চার অব্বাস নাইক্যা বলে আরেকটা পান মুখে চালান করে দিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে চিবুতে লাগলেন।
  • মামু, চলো যাই, রাত হয়ে গেছে, মা বকবে।
  • হ, চল বাইগ্না , বইনের ঝাড়ি খায়নের কাম নাই…তোর সামসু মামুও বইয়া থাকবো !
  • আহি বাইসাব, অনেক পেঁচাল পাড়লাম , মনে কিছু নিয়েন না , সালামালাকুম !

রাত তখন ৮টা বেজে গেছে,আমারো উঠতে হবে! আমি তখনও হতভম্বের মতো মামু ভাগ্নের চলে যাওয়া কষ্টের দিকে চেয়ে রইলাম !

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]