সিকিমের সিকি আধুলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

দুই.

সকাল সকাল উঠে পড়লাম…স্নান করাটাকে ম্যামথ টাস্ক মনে হচ্ছিলো যদিও সকালের দিকে তাপমাত্রা রাতের মতন কম ছিলনা…”আভি নেহি তো কভি নেহি” জপতে জপতে স্নান করে এলাম এবং এই দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায় ডিস্টিংশান সহ পাস

মেলাঙ্কলিক

করে রীতিমতন গর্ব হচ্ছিলো…লেপ কম্বলের তলায় শীতে জর্জরিত মানুষটাকে দেখে মায়া লাগছিলো…যাইহোক কটেজের দরজা খুলতেই মন ভালো হয়ে গেলো,লনের সবুজ ঘাস জুড়ে সোনাগলা নরম রোদের লুটোপুটি…কাঞ্চনজঙ্ঘার অভিমান কাটেনি যদিও… তুষারাবৃত ধবল শৃঙ্গগুলি পরম যত্নে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি….

আটটা বাজতে না বাজতে বিনোদজি হাঁক পাড়লেন,”ব্রেকফাস্ট রেডি হ্যায়”…তাওয়ায় সেঁকা মোটা মোটা,নরম,গরম আটার রুটি,কড়াইশুঁটি আলু দিয়ে টক ঝাল মিষ্টি দম আর গরমাগরম ওমলেট সহ ব্রেকফাস্ট সারা হলো…তারপর বাড়ির গরুর দুধ দিয়ে তৈরি ধোঁয়া ওঠা ঘন মালাই চা আর চকোলেট পেস্ট্রী….

উত্তরাখন্ড ট্রিপে আমরা পনেরোদিন ধরে শুধু একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় দৌড়ে বেড়িয়েছি,বিশ্রাম পাইনি…তাই এবার ঠিক করেছিলাম এমন জায়গায় যাব যেখানে দিনকয়েক বিশ্রাম পাব,যেখানে চাইলেই পায়ে হেঁটে হারিয়ে যেতে পারবো অনুপম,অবাধ প্রকৃতির মাঝে….

প্রসঙ্গত,এই একত্রিশে জানুয়ারী দিনটাই আমাদের বিয়ের দিন…যাইহোক,সকাল সকাল হাঁটতে বেরোলাম হাত ধরাধরি করে…গন্তব্য অজানা…পুচকি আর আন্টিজি কিছুক্ষণ সঙ্গ দিলেন পাহাড়ি চড়াই পথে…জানতে পারলাম আন্টিজির একমাত্র মেয়ে গত মার্চ মাসে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে দুরারোগ্য ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই এ হেরে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে!!…মন খারাপ হয়ে গেলো…কত তুচ্ছ,ভঙ্গুর জীবন আমাদের!!!…মৃত্যুর কাছে কত অসহায় আমরা!!!…তবু কত জটিল হিসেব,কত অবিশ্বাস,কত আত্মশ্লাঘা,কত অপমান,কত প্রতিশোধ,কত দীন হীন যাপন আমাদের!!!!….

পাহাড়ি পথে প্রায় চার কিলোমিটার চড়াই পেরোলাম…পথে কী দেখার ছিলো যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তার একটাই উত্তর হয়, “নেচার,ভার্জিন নেচার অ্যান্ড নাথিং এলস”…ছোট ছোট কয়েকটা ঘর নিয়ে ততোধিক ছোট জনপদ ছিলো কিছু,ছিলো পাইন বনের মধ্য দিয়ে সর্পিল,নির্জন,আলো ছায়া মোড়া রাস্তা,ছোট্ট নাম না জানা চার্চ আর মাঝে মাঝে পাহাড়ের ধাপে ধাপে জীবনের দীর্ঘ যাত্রা শেষ করে চিরনিদ্রায় শায়িত মানুষদের শেষ আশ্রয়,গুটিকয় কবর…নিজের শ্বাসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম প্রকটভাবে…

পাহাড়িয়া

বেঁচে রয়েছি,সঙ্গে রয়েছে গ্রাসাচ্ছাদনের ক্ষমতা,রোজ নতুন ভোর দেখতে পাচ্ছি,কিছু স্বপ্ন রয়েছে,কিছু ভেঙ্গে গেছে,কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি,কিছু কোনোদিনও পাবনা–নিজেকে বড্ড ভাগ্যবতী মনে হচ্ছিলো….পাহাড় প্রতিনিয়ত বড় হতে শেখায়,উদার হতে শেখায়,শেখায় সরলতা আর দেয় অপার মানসিক শক্তি….সামনে প্রতিকূল পথের দিকে তাকিয়ে ভয় না পেয়ে পিছনে তাকিয়ে কতখানি কঠিন,দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে এলাম তা দেখে তুখোড় আত্মবিশ্বাস আর তুমুল সাহস সঞ্চয় করে জীবনকে প্রণতি জানাবার সুযোগ কে দেয়???….পাহাড়,আর কে!!!

ঠিকানায় ফিরে এলাম দুপুর দেড়টায়….গরম ভাত, কালা ডাল,আলু পেঁয়াজের চচ্চড়ি,আচার,রাইশাক,
পাপড়ভাজা দিয়ে পেটপুজো সারলাম দুজনে….সেরেই আবার পথে নামলাম…এবার উল্টোপথে…মেঘ এসে ঢেকে দিলো রাস্তা,যেমন বারবার দিয়েছে… জীবনের চলার পথে কতবার মনে হয়েছে,এই শেষ,আর রাস্তা নেই,আলো নেই…তারপর একসময় মেঘ কেটে গেছে আপন খেয়ালে…

মেঘের রাজ্যে ঢুকে পড়লাম মনে হল,মায়াবী পাহাড়ের মনভোলানো এই রূপ অতুলনীয়,শব্দ কম পড়ছে লিখতে গিয়ে…সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগলো আর বেড়ে চললো শীতের দাপট,পোশাক ভেদ করে কনকনে হাওয়া যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো আমূল…সন্ধ্যায়,ঠান্ডায়,দশ বছরের ধেড়ে বিয়ের দিনকে কোলে নিয়ে ঘরে বসে কীভাবে কাটাবো ভাবতে ভাবতে কটেজে চলে এলাম…ওমা,এসে দেখি চরম ব্যাপার!!!…

আমাদের অ্যানিভার্সারি পালন করার জন্যে নামচি থেকে মীরা বৌদির বাড়ির লোকজন এসে হাজির!!!…বিনোদজির বাড়ির কেউই হিন্দি বলতে পারেন না ভালো করে,আমরা বোর হচ্ছি ভেবে ওরা ওদের নিয়ে এসেছে,ওরা হিন্দি না জানলেও ওদের মধ্যে দুজন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে,তাই বোর
হওয়ার অবকাশ রইলো না আর….

এই বিশেষ সন্ধ্যায় আমি একজন খুব ভালো বন্ধু পেলাম,টিয়া আইয়ার ফ্রম নাগাল্যান্ড,মীরা বৌদির ভাইয়ের বৌ…নামচিতে ওনার নিজের রেসিডেনসিয়াল স্কুল রয়েছে…গল্পগাছা তুমুল জমে উঠলো…সুন্দর কেক চলে এলো আমাদের অবাক করে,কেক কাটাও হলো….গরম গরম বাঁধাকপির পাকোড়া আর মালাই চা সহ সান্ধ্য আড্ডা জমে উঠলো…

শেডিং সাম ক্যালোরিজ

বাড়ি থেকে এত দূরে,মাত্র একসন্ধ্যার পরিচিত লোকজনের মাঝে একটিবারের জন্যেও মনে হলোনা এরা অনাত্মীয়…ভাষাগত,সাংস্কৃতিক,জীবনশৈলীজনিত ফাঁক ফোকরগুলি চাপা পড়ে গেল বন্ধুতা এবং আন্তরিকতার প্রলেপে…টিয়া ফ্রম ওয়েস্টবেঙ্গল মেট টিয়া ফ্রম নাগাল্যান্ড অ্যান্ড বিকেম গুড ফ্রেন্ডস ইন নো টাইম!!!…বাংলা ভাষায় টিয়া এক প্রজাতির পাখি,আর নাগাল্যান্ডের টিয়ার নামের মানে “লাকি”!!!

এক টেবিলে বসে সকলে একসঙ্গে রাতের খাওয়া সারলাম…ভাত ,ডাল,আলু ব্রকোলি স্কোয়াশ বেল পেপার ক্যাপসিকাম সহ মিক্সড ভেজ,পাপড়ভাজা,দিশি মুরগির কষা আর আচার দিয়ে ডিনার সারা হল….

দশ বচ্ছর খুব বেশি নয়,দশ বচ্ছর খুব কম ও নয়….একসঙ্গে একছাদের নীচে প্রেমে অপ্রেমে বুড়ো হবো –এই মতলবে আমাদের একঙ্গে থাকা শুরু হয়েছিল….দশবছর তো নয় যেন অনুপল,চোখের পলক ফেললাম আর কেটে গেল!!…চরম দুঃখ কষ্ট অপমানের দিন মাস বছরগুলোতে, টালমাটাল সময়েও এই সম্প‍র্কটুকুই অনাহত ছিল কেবল…এটুকুই ছিলো আমাদের একমাত্র পুঁজি,আমাদের একমাত্র সম্বল,অলখ সম্পদ…

অনিবর্তিত অনুচ্চারিত ভালোবাসার বৃষ্টিতে সিঞ্চিত থাক সমস্ত ভালো- বাসার ভিত….স্নেহ সহানুভূতি,পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঊনকোটি তন্তু দিয়ে বোনা সেই আশ্রয় বাঁচিয়ে রাখুক বিশ্বাসে,শ্রদ্ধায়,নিবিড় বন্ধনে—এটুকুই….(ক্রমশঃ)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]