সিকিমের সিকি আধুলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

চার.

নতুন ভোর মানেই নতুন আশা,নতুন নতুন সমস্ত চাওয়া পাওয়া….পরদিন সকালে উঠেই দিলখুশ!!!…ব্রেকফাস্ট মেনু হোমমেড মোমো!!!…আহা!!!…

সাতসকালে পেটপুরে মোমো খেয়ে সেজেগুজে বিনোদজির গাড়িতে উঠে বসলাম,গন্তব্য টেমি টি গার্ডেন…সিকিমের একমাত্র চা বাগান…

তেরে দোয়ার বয়ঠা

আহা!!!সবুজ গালিচায় মোড়া বিস্তৃত চা বাগানে তখন মেঘের কারিকুরি…পায়ে পায়ে চা বাগানের মধ্য দিয়ে উপরে উঠতে লাগলাম…মন আর চোখের ক্যামেরার মতন শক্তি পৃথিবীর আর কোনো ক্যামেরার নেই….প্রকৃতির মনোহর রূপখানি ধারণ করার ক্ষমতা একমাত্র স্মৃতির রয়েছে…তাতে ধুলো জমে,মলিন হয়ে আসে কিন্তু সময়ে সময়ে নাড়াচাড়া করলেই তা পরিষ্কার,সজীব ও সতেজ হয়ে ওঠে….আমৃত্যু!!!…

চা বাগান ঘুরে এলাম নামচি মার্কেটে… ব্যাঙ্ক ধর্মঘট থাকায় সায়ন্তন এটিএমের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লো…আমার সুবিধাই হলো,পায়ে হেঁটে বাজার ঘুরতে বেড়িয়ে পড়লাম….হরেক কিসিমের খাবার দাবার,জামা কাপড়,জুতো,পানীয় ইত্যাদির দোকানপাট…ঘুরতে ঘুরতে একটা কেক এর দোকানের সামনে পা আটকে গেল…ফ্রেশলি বেকড কেক,পেস্ট্রী,ব্রেড এর গন্ধে ম ম করছে চারপাশ…ঢুকে পড়লাম সেখানে…পছন্দ মতন চকোলেট অ্যান্ড পীনাট পেস্ট্রী কিনে প্যাক করতে করতে সায়ন্তনের টাকা তোলাও শেষ….

ফিরে এসে লাঞ্চ করলাম কটেজে…গরমাগরম হোমমেড সিম্পলসা খানা চাঙ্গা করে দিলো…একটু রেস্ট নিয়ে উঠে বিকেল বিকেল পৌঁছে গেলাম একদিন আগে আবিষ্কার করা পাহাড়ের গায়ে আমাদের গোপন ঘাঁটিতে…শীতের কনকনে বাতাসে,খোলামেলা প্রকৃতির মাঝে নিরালায় বসে উপভোগ করলাম পানাহার…বাঁধাকপির পকোড়া ভেজে দিয়েছিলো ওরা,সঙ্গে বিয়ার…

এই বিকেলটা আমাদের ট্রিপের সেরা সময় ছিলো….উই সেড চিয়ার্স টু দ্য লাইফ উই আর লিভিং টুগেদার,টু দ্য পাথ উই আর ট্রিডিং টুগেদার….

আট্টে কা মোমো

পাথরের ওপর শুয়ে,বিস্তৃত খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনে গুনে ক্লান্ত হয়ে গেলাম…একটানা ঝিঁঝিঁপোকার ডাক,নাম না জানা রাতচরা পাখির ডাকের মাঝে বেমালুম ভুলেই গেলাম কাটিয়ে আসা জীবনের কথা… যেন অতীতের অস্তিত্ব নেই,যেন এই মুহূর্তটুকুই সত্যি কেবল!!…বুঝতে পারলাম “যো গুজারি না সাকি হাম সে,হাম নে ওহ জিন্দেগী গুজারি হ্যায়”!!

কয়েক পাত্র বিয়ারের পর আমরা ভাবলাম দাসত্বের জীবনের চেয়ে অনিশ্চিত জীবন ভালো…উই প্ল্যানড,সাম ডে,সামহোয়্যার উই য়্যুড রিজাইন ফ্রম এভ্রিথিং দ্যাট ইজ পুলিং আস ব্যাক!!!….অ্যান্ড অনলি দেন য়্যুড উই লিভ দ্য লাইফ অফ আওয়ার চয়েস…অ্যামিডস্ট ন্যাচারাল ওয়াইল্ডারনেস…. “লোটাস ইটার” এর উইলসনের মতন …হয়তো তা হবে বা হবেনা,তবু সেই নির্জন, পাতাঝরা সন্ধ্যাটি দুচোখে মায়াকাজল পরিয়ে দিল… এক স্বপ্নিল ,অবাস্তব জীবনের নেশা ধরিয়ে দিলো…সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত মায়াবী জীবনটিতে পৌঁছে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছাটুকুই আমার এই ভ্রমণের সেরা পাওনা!!!….

অনেক রাতে,অন্ধকার পাহাড়ি পথ বেয়ে প্রায় তিনকিলোমিটার পথ হেঁটে এসে পৌঁছলাম কটেজে….মনখারাপ হল…পরের সকালেই পাহাড়কে বিদায় বলার পর্ব যে!!!….রাতে ছানা দিয়ে তৈরি অপূর্ব স্বাদের মিক্সড ভেজ আর কষা মাংস দিয়ে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি কম্বলের তলায় আশ্রয় নিলাম…

পরের দিন সকালে দরজা খুলেই মন ভিজে গেলো,সঙ্গে চোখ ও….পপি আমার কটেজের দরজার সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বসে…ও বুঝতে পেরেছিলো ওদিন আমরা বিদায় জানাব ওকে…

এখানে বলে রাখি,পপি বিনোদজির পোষ্য নয়…ও একটু দূরে থাকে…একজনার বাড়ি থেকে খেতে দেয়,তাদের বাড়ির সিঁড়ির তলায় বা ছাদে থাকে….প্রথমদিন ওকে দেখার পর আদর করছিলাম…তারপর থেকে রোজ দুবেলা ও কটেজে এসেছে আমাদের কাছে….পাহাড়ি রাস্তায় পায়ে হেঁটে যেখানে গিয়েছি সঙ্গে গিয়েছে,পাঁচ ছয় কিলোমিটার রাস্তা!!!…আমরা বসলে ও বসেছে,আমরা হাঁটলে ও হেঁটেছে…এমনকী রাতে এসেও দেখে গিয়েছে আমরা ঠিক আছি কিনা….সারা বিকেল আমাদের সঙ্গে খেলা করেছে,সঙ্গ দিয়েছে…

পপি এভাবেই বিদায় জানালো

সিকিম থেকে ফেরার সময় আমি আর সায়ন্তন দুজনেই চোখের জল ফেলেছি পপির জন্যে…নিঃশব্দে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে ও আমাদের এবারের সিকিম ভ্রমণ স্মরণীয় করে তুলেছে…মাম্মুকে (আতাই) বাড়িতে রেখে গিয়ে মন খারাপ ছিল,কিন্তু পপির সঙ্গ আমাদের ভরিয়ে দিয়েছে…পপির ছ সাত বছর বয়স…পরেরবার গেলেও দেখা পাব কিনা জানা নেই…পপি,আমাদের পাহাড়ের মেয়ে,তুই ভালো থাকিস সোনা…কোথাও না কোথাও তো দেখা হবেই,হয়তো রেনবো ব্রীজের ঐ পারে!!…

সকাল সকাল স্নান করে,পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে এসে,জলখাবার খেয়ে(আটার মোমো,ময়দা সহ্য হয়না বলে),বাড়ির লোকজনকে বিদায় জানালাম….আন্টিজি আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলতে লাগলেন,আমার ও চোখ ভিজে গেলো!!!….বিশ্বজুড়ে মায়েদের ভালোবাসার ভাষাটুকুন এক ই তো হয়!!!

চারদিন এই অনাত্মীয় মানুষগুলোর আতিথেয়তায়,আন্তরিকতায় একবারের জন্যেও মনে হয়নি বাড়ি থেকে এত দূরে রয়েছি…এনাদের সৎ,পরিশ্রমী এবং সাধারণ গ্রাম্য জীবন এই কদিনে অনেককিছু শিখিয়ে দিলো হাতে ধরে…অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো…জীবনের ব্যাপ্তি আরেকটু বিস্তৃত হলো…ভিন্ন ভাষা এবং সংস্কৃতি আরেকটু উদার,আরেকটু সহনশীন হতে শেখালো নিশ্চয়ই…আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলো আমাদের নিজেদের জীবন ও জগতে ফিরে আসার যাত্রা….

নিজের শিকড়ের কাছে বারবার ফিরে ফিরে আসার আরেক নামই তো জীবন!!!!….

ও হ্যাঁ,আমাদের গন্তব্যের নাম –সাদাম,দক্ষিণ সিকিমের অপরূপ ছোট্ট এক পাহাড়ি গ্রাম…যেতে হলে যোগাযোগ করে নিতে হবে আমার বন্ধু স্বাতী রায় এর সঙ্গে…(সমাপ্ত)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]