সিকিমের সিকি আধুলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

এক.
দশ বছর ধরে দুজনে সাকসেসফুলি একটাও কাক বা চিল বসতে দিইনি বাড়ির ছাদে…দশ বছর ধরে কতবার তালাক,ডিভোর্স,সেপারেশন, উকিল,হাইকোর্ট ইত্যাদির জুজু পরস্পরকে দেখিয়েছি তারও ইয়ত্তা নেই…তবু একদিন এসেই গেলো যেদিন এক ছাদের তলায় পাকাপাকি থাকার দশ বছর পুরো হলো…এই দশ বছর পূর্তির বিশেষ দিনটা একটু অন্যরকম ভাবে,বাড়ির ছাদে কাক চিল বসতে দিয়ে কাটাবো ভেবেছিলাম…তাই কাছাকাছির মধ্যে অফবিট,নির্জন,শান্ত একটা এমন জায়গা চেয়েছিলাম যা নয়নাভিরাম হবে এবং যেখানে টুরিস্টদের ভিড় থাকবেনা…পেয়েও গেলাম…কীভাবে??…সেটা পরে বলছি…

এন জে পি থেকে ত্রিশে জানুয়ারীর সকালে কমল রাই এর গাড়িতে যখন চেপে বসলাম ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁয়েছে…ঠান্ডায় জমে যেতে যেতে কুয়াশার চাদরে মোড়া ছোট্ট পাহাড়ি জনপদে এসে যখন পৌঁছালাম তখন শনশন বাতাস যেন কেটে দিচ্ছে চামড়া..ঘড়িতে দুপুর দুটো…বিনোদজির ছিমছাম হোমস্টেতে পা রেখেই স্বাতি কে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলাম,এত্ত সুন্দর,পরিষ্কার,সুসজ্জিত মনের মতন একটা প্রপার্টিতে আমাদের বিশেষ দিনটা উদযাপনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে….

ছোট্ট সবুজ পাহাড়ি ঘর,সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা লন আর হরেক বাহারি, মনোহর ফুলে ঢাকা একটুকরো স্বর্গ যেন!!!….ঘরে ঢুকেই মন খুশ!!!….সুন্দর ছিমছাম ঘরখানা ফুল,বেলুন ইত্যাদি দিয়ে সাজানো গোছানো আমাদের জন্যেই…পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম উইথ গিজার দেখে তো আহ্লাদ চরমে উঠলো….

হোমস্টের মালিক বিনোদজি আর তার পরিবারের উষ্ণ অভ্যর্থনা জাঁকিয়ে ধরা ঠান্ডাটাকে আরামদায়ক করে তুললো নিমেষেই…সুন্দর কানা ওঠা কাঁসার থালায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুসুর ডাল,আলুভাজা,মিক্সড ভেজ,রাইশাক ,পাপড়ভাজা আর ঘরে তৈরী মুলোর আচার জমিয়ে দিলো দুপুরের খাওয়া!!!…

রান্নাঘরখানা দেখার মতন…পরিচ্ছন্নতা এবং রুচির অনবদ্য অনন্যসাধারণ সমাহার!!!

খেয়েদেয়ে উঠেই আমরা নিষিদ্ধ কাজটা সেরে ফেললাম!!!….মানে স্নান…হ্যাঁ,গিজারের উষ্ণ গরম জলে স্নান সারারাত এবং দিনের জার্নির ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলো এক লহমায়!!!!…ড্রেস পরে বেড়িয়ে পরলাম পায়ে হেঁটে…আলাপ হলো পপিরানির সঙ্গে…পপিরানি কে??….বলবো…পপিরানির জন্যে পুরো একটা গোটা এপিসোড বরাদ্দ রয়েছে…

আহা!!! কী অপূর্ব পাহাড়ি জনপদ!!!….শান্ত,নির্জন,কয়েক ঘর মাত্র লোকের বাস!!!…কোলাহল নেই,গাড়ির আওয়াজ নেই,আছে কেবল পাইন বনের থেকে আসা বাতাসের শন শন শব্দ আর হরেক কিসিমের নাম না জানা পাখির ডাক!!!…তখনও জানিনা,সামনের নাতিদীর্ঘ পাহাড়িয়া যাপন কী শেখাবে আমাদের!!!

সত্যি বলছি ,ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছোট্ট,মনোরম হ্যামলেটটিকে অপার্থিব ,আউট অফ দিস ওয়ার্ল্ড মনে হচ্ছিলো…মনে হচ্ছিলো এই জায়গাটুকু ছাড়া এ জগতের আর বাকিসবটুকুই মিথ্যা,অনিত্য…হাওয়ায় হাওয়ায় যেন অব্যক্ত প্রীতির অনুরণন…যেন শাশ্বত,চিরন্তন অনুরাগের অবাধ অনিবার্য অনাবিল বিচরণ উদার অনিরুদ্ধ প্রকৃতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে !!!…এলোমেলো হাওয়ায় ফেলে আসা অতীতের গন্ধ আর অনাস্বাদিত আগামীর আহ্বান— এক ই সঙ্গে!!

বেলায় স্নান করায় শীত চেপে ধরলো!!!… সন্ধ্যায় হোমস্টেতে ফিরে দেখলাম,বাইরের ছোট্ট রান্নাঘরটিতে মাটির উনুনে দিশি কুক্কুট রান্না শুরু হয়ে গিয়েছে…বিনোদজির স্ত্রী মীরা বৌদির সঙ্গে আলাপ হলো,আলাপ হলো বিনোদজির মা আন্টি আর মেয়ে এ্যালিস এর সঙ্গে…ওর নাম দিলাম পুচকি…শুনেই লজ্জায় লাল হয়ে মায়ের পিছনে লুকিয়ে পড়লো…জানলাম ওনাদের চোদ্দ বছরের ছেলে চেন্নাই গিয়েছে খেলতে!!!….

রাতে খেলাম রুটি ডাল ভাত সবজি আলুভাজা পাপড়ভাজা আর চিকেন…আন্টি পুরো সময়টা সামনে বসে তদারকি করতে লাগলেন আমাদের খাওয়াদাওয়ার…শীতে প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম…বিনোদজি তাই দেখে ঘরে রুম হিটারের ব্যবস্থা করে দিলেন….ইয়াব্বড় আর ইয়াম্মোটা কম্বলের তলায় ঢুকেও পায়ের পাতা দুটো দুদিনের বাসি মড়ার পায়ের মতন ঠান্ডা হয়ে রইলো…সায়ন্তনের পায়ে ছোঁয়া লেগে গেলেই,”বাবাগো!!মাগো!!” বলে প্রাণঘাতী আর্তনাদ করে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বাড়ির লোকজনকে মিসগাইড করছিল….গেস্টের মতন গেস্ট বটে–বাড়ির লোকজন এমনটাই ভাবছিল হয়তো!!!– (ক্রমশঃ)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]