সিটি অব ট্রিজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামীমা জামান

এ শহর আমার নয়। কিছুদিন এখানে আছি।তবু শহর যেটা পারে ,আপন করে নিতে সামান্য মানুষ হয়ে সাধ্যি কি সে উদাত্ত আহবান ফেরাবার। উত্তর আমেরিকার সোনার রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া।তার ই রাজধানী এই আধুনিক ঐতিহাসিক শহর স্যাক্রামেন্টো ।আমেরিকার ক্যাপিটল সিটিগুলো যেমন হয় , একটু গ্লামার কম,ডিসেন্ট ,দরকারী সব অফিস আদালত,সরকারী প্রতিষ্ঠান এ ঠাসা জরুরী শহর।স্যাক্রামেন্টোর চেহারাও তাই।এখান থেকে খুব সহজেই যাওয়া যায় আশপাশের বিনোদন কেন্দ্রিক শহরগুলোতে। হাইওয়ে ফিফটি ধরে ঘন্টা দুয়েকের ড্রাইভিং এ পৌঁছানো যাবে সানফ্রান্সিসকো ।তারো আগে দেখা মিলবে ছোট্র শহর ডেভিস ,ডক্সিন,ভ্যালেহোর। অন্যদিকে রোজভিল এর পথ হয়ে রিনো দিয়ে প্রবেশ করা যাবে পাশের রাজ্য নেভাডায় ।

১৮৪৯ সালে গোল্ড রাশের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের জনপদ গড়ে ওঠে।অস্ট্রেলিয়া ,চীন ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার ভাগ্য ফেরাতে চাওয়া মানুষগুলো দলে দলে ছুটতে থাকে আমেরিকান রিভার এর তীরে।এই শহরে।বনিকেরা ভীড় করতে থাকে ।গড়ে ওঠে স্বর্ণকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ।ওল্ড স্যাক্রামেন্টো আজো সেই নিদর্শন গুলো ধরে রেখেছে তার পুরাতন চেহারায়।আজকাল মানুষ সেদিকে স্রেফ বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই যায়।নদীর উপরে আজো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ডেল্টা কিং। তার ই পাশে জাঁদরেল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সোনালী টাওয়ার ব্রিজ । এ শহরের প্রতীক ।এ নদীতে এখন আর বনিকদের যাতায়াত নেই ।কালেভদ্রে দু এক খানা ইয়ট ভেসে গেলে ড্র ব্রিজ তার স্বভাব অনুযায়ী ইয়টগুলোর যাত্রাপথ কে সুগম করে দিতে নিজেকে বিভক্ত করে আবার মিশে যায়।

ওল্ড স্যাক্রামেন্টো থেকে ডাউন টাউনের দিকে যেতেই সুউচ্চ বিল্ডিং গুলোর স্থাপত্য শৈলী নজর কাড়ে। ডাউন টাউনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ক্যাপিটল বিল্ডিং, শ্বেত শুভ্র রাজকীয় চেহারা নিয়ে। ভিতরের কক্ষগুলো যথারীতি সম্ভ্রান্ত।বছর দুয়েক আগেও এর করিডরে তৎকালীন গভর্নর হলিউড কিংবদন্তী আর্নল্ড শোয়ারজেনেগার এর পদচারনায় আকর্ষিত ছিল কৌতূহলী জনমন।স্টেট ক্যাপিটল বিল্ডিং এর প্রাঙ্গণে বিচিত্র সব গাছের দেখা মেলে ।প্রায় সব প্রজাতির গাছ এখানে রাখা হয়েছে এমনকি কলাগাছ কিম্বা বাঁশঝাড় পর্যন্ত। এই পার্ক এর একদিকে রয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত আমেরিকান বীরদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য ।আরো অনেক ভাস্কর্যের দেখা মেলে ডাউন টাউনেই।অতি পরিছন্ন শহরের বাকে বাকে কফিপ্রেমীদের জন্য কফি শপের অভাব নেই। স্টারবাক্সের কফির স্বাদ নিতে হলেও বেশি দূর যেতে হবেনা,মোটামুটি সব এলাকাতেই ছড়িয়ে আছে এর শাখা।

 সানফ্রান্সিসকোর  ফ্যাশনেবল হাওয়া এ শহরেও ঝড় তোলে ।তাইতো গাছপালা ঘেরা নিঝুম কোন রাস্তাতেও ট্যাটু হাউস মিলে যাবে। চারিদিকে এত্ত এত্ত গাড়ি।ছুটছে।মানুষের দেখা নেই। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই বললেই চলে। দু একটা বাস যে ন্যাটোমাস থেকে ডাউনটাউন এর দিকে যায় দেখি সব ই প্রায় খালি। ন্যাটোমাস।খুব চমৎকার নেইবারহুড।অথচ দুহাজার সালের আগেও এখানে ধু ধু প্রান্তর।আজ কি নেই এখানে।একটা বাড়ির সামনে ঠিক কি প্রজাতির ,কটি গাছ থাকবে তাও স্থপতির নকশার বাইরে নয়। যেন সৃষ্টিকর্তার নিপুন হাতে গড়া স্বর্গোদ্যান ।

  বিগ টমেটো স্যাক্রামেন্টোর অন্যান্য ডাক নামের মধ্যে একটি হল সিটি অব ট্রিজ।কেন নয়? আমেরিকার এই কুলেস্ট সিটির শরীর জুড়ে যে কেবলই রং বেরং এর গাছ।সারি সারি।গোছানো ,পরিপাটি। তবে কিঞ্চিত অগোছালো ডিসকভারি পার্ক এর বুনো সৌন্দযে ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে পিঠ ঠেকিয়ে নিখোঁজ হওয়া যায়।হয়তো কবিও। এখানে ঠিক এই জঙ্গলের চেহারা অনেকটা কোথাও কেউ নেই টাইপ। খানিকটা ভূতুড়ে ।রোজ সকালে হাটতে বেরোলে আমি আসলে ঘোরের মধ্যে থাকি।রাস্তায় আমি আর গাছেরা ছাড়া যে তখন কেউ নেই। কেবল কদাচিৎ দু একজন তাদের নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথীকে দড়ি বেঁধে পটি করাতে ব্যস্ত।এ শহরে আমাকে যারা পরম মমতায় আপন করে নিয়েছে সেই গাছেদের নান্দনিক রুপে মোহিত আমার কেবলই মনে হয় আমি গাছ হব।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]