সিনেমায় দু’চাকার ঝড়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রোমান হলিডে ছবির সেই ভেসপাটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ৩২ লক্ষ আমেরিকান ডলারে।এই ভেসপায় চড়ে রোম শহরে চক্কর লাগিয়েছিলেন গ্রেগরি পেক আর অড্রে হেপবার্ন।  হলিউড কাঁপানো আরেক অভিনেতা স্টিভ ম্যাককুইন। ‘গ্রেট এস্কেপ’ ছবিতে জার্মানদের হাত থেকে পালানোর দৃশ্যে তার দুর্ধর্ষ মটোরবাইক চালনা সিনেমার দর্শকরা আজো মনে রেখেছেন। তার ব্যবহার করা সেই ট্রায়াম্ফ কোম্পানীর বাইকেরও স্থান হয়েছে কোম্পানীর জাদুঘরে। মার্লন ব্রান্ডো চড়তেন বলা যায় উড়তেন এই ট্রায়াম্ফ কোম্পানীর তৈরি ‘থান্ডারবার্ড’ নামের একটি ভয়ংকর আকৃতির মোটরবাইকে।

মার্লোন ব্রান্ডো আর সেই ট্রায়াম্ফ কোম্পানীর মোটরবাইক

ব্রান্ডো অভিনীত বিখ্যাত ছবি ‘দ্য ওয়াইল্ড ওয়ান’-এ তাকে এই বাইকে চড়েই অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিলো।আর বাঙালির ভালোবাসার নায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে সঙ্গে অমর হয়ে গেলো ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় ব্যবহৃত এনফিল্ড মোটরবাইক। এই বাইকে চড়েই উত্তমকুমারের লিপে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ বাঙালি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলো, যার রেশ আজো কাটেনি। এনফিল্ড বাইকে উত্তমের সওয়ারি ছিলেন স্বয়ং সুচিত্রা সেন।

মোটরবাইক নিয়ে সিনেমার দুনিয়ায় বহু গল্প। বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে জড়িয়ে গতির দানব নামে পরিচিত এই মোটরসাইকেলও হয়ে উঠেছে একটি চরিত্র।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সিনেমার চরিত্র মটোরবাইক নিয়ে ‘সিনেমায় দু’চাকার ঝড়।

গ্রেট এস্কেপ ছবির একেবারে অন্তিমে স্টিভ ম্যাকুইন বাইক চালিয়েছিলেন নাজি সৈন্যদের হাত থেকে পালিয়ে যাবার জন্য। সেই দুর্দান্ত বাইক চালনার কথা সিনেমাপ্রেমীদের মন থেকে মুছে যায়নি। সেই দীর্ঘ চেজিং দৃশ্যের শুধু একটি জায়গায় স্টিভ ম্যাকুইনকে বাইকটি চালাতে দেয়া হয়নি। সে দৃশ্যে তার স্টান্টম্যান বাইক নিয়ে এক লাফে অতিক্রম করেছিলেন ৬৫ ফুট দূরত্ব। হলিউডের মারদাঙ্গা এই অভিনেতার বীমা কোম্পানীর প্রতিনিধিরা বিপদের আশংকায় তাকে এমন ঝুঁকি নিতে বাধা দিয়েছিলেন। এছাড়া বাকী দৃশ্যে স্টিভ ছিলেন চালকের আসনে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিনেমাটি নির্মিত হয়ে যাওয়ার পর সিনেমারে প্রয়োজনা সংন্থা বাইকটি বিক্রি করে দেয়।আর সেটি কিনে নেন এক কৃষক। সেই কৃষক তার খামারে গরুর খাবার আনা নেয়া করতেন বাইকটি দিয়ে। কাজ শেষ হয়ে গেলে বিখ্যাত মোটরবাইকটি তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থাকতো তার গোলাঘরে। বহু বছর কেউ আর জানতেই পারেনি দু‘চাকার যন্ত্রদানবের অস্তিত্ব। বেশ কয়েক বছর পর সেই কৃষকের মৃত্যু হয় এবং তার উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে ফার্মটি কিনে নেন ডিক শেফার্ড নামে এক ব্যক্তি। এই ডিক সাহেব-ই বন্ধ গোলাঘরে আবিষ্কার করেন বিখ্যাত বাইকটি।এরপর অবশ্য বাইটির প্রস্তুতকারক কোম্পানী ট্রায়াম্ফ-এর লোকজন এসে সেটি কিনে নিয়ে যায় তাদের মিউজিয়ামে যত্নে রাখার জন্য। গত বছর থেকে এই বাইকটি সাধারণ মানুষের দেখার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

সিনেমায় এই দু’চাকার চরিত্রটি বিখ্যাত হয়েছে আরেক বিখ্যাত অভিনেতা মার্লোন ব্রান্ডোর হাত ধরে। এখানেও সেই ট্রায়াম্ফ কোম্পানীর মোটরবাইক। ব্রান্ডো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন তাঁর নিউইয়র্কের সেই বোহেমিয়ান জীবনের কথা। তখনও পর্দায় ঝড় তুলতে পারেননি তিনি।নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় গভীর রাতে একা একা ঘুরে বেড়াতেন তিনি, সঙ্গী এক বিশালদর্শন বাইক। ব্রান্ডো রাতেরবেলা সেই বাইকটি চালিয়ে বের হয়ে যেতেন অনির্দিষ্ট ভ্রমণে। পেছনে থাকতো কোনো সঙ্গিনী। ঘুরে বেড়াতেন তিনি শহরের নানা অলিগলি। কখনো আবার নিঃসঙ্গ মানুষটি এই বাইকের সিটে হেলান দিয়েই কাটিয়ে দিতেন সময়। কখনো ওই বাইকের সিটে বসেই কিছু লিখতেন। এই বাইক ১৯৫০ সালে পর্দায় দৃশ্যমান হয় ব্রান্ডো অভিনীত বহু আলোচিত ‘ওয়াইল্ড ওয়ান’ ছবিতে।

মার্কিন অভিনেতা জেমস ডীন

বাইকের দুরন্ত গতিকে ভালোবাসতেন মার্কিন অভিনেতা জেমস ডীন।তাঁর অভিনীতি সেই বিখ্যাত সিনেমা ‘রেবেল উইথআউট আ কজ’ একদা বিশ্বজুড়ে তরুণদের ভিন্ন এক উত্তেজনায় মাতিয়ে দিয়েছিলো। সেই ছবিতে অ্যাংগ্রি ইয়াংম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করা ডীন রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। ওই সিনেমায় তার সঙ্গী ছিলো একটি রয়্যাল এনফিল্ড মোটরবাইক। সিনেমার সাফল্যের হাত ধরে বাইকটিও হয়ে যায় একটি ইতিহাসের অংশ। ডীন অবশ্য পরে এক অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যুবরণ করেন। তবে সেবার গাড়ি চালাচ্ছিলেন ডীন, বাইক নয়।

হলিউডের দুই বলশালী অভিনেতা সিলভেরস্টার স্ট্যালন আর আর্নল্ড সোয়ারজনেগার। দুজনেরই ইতিহাস আছে সিনেমার পর্দায় মারাত্নক গতিতে বাইক চালানোর। স্ট্যালন ‘ফার্স্টব্লাড’ ছবিতে চালিয়েছিলেন ইয়ামাহা কোম্পানীর বাইক। এক্স.টি-২৫০ নামের এই বাইক নিজেই চালিয়ে ছবিতে স্ট্যালন টানা তিন মিনিট পাহাড়ী রাস্তা, ট্রেন লাইন আর নানান বাধা অতিক্রম করেন। তিনি কোনো স্টান্টম্যান ব্যবহার করেননি। যেমন করেননি সোয়ারজনেগার ‘টার্মিনেটর-২’ ছবিতে।

জেমসবন্ড ছবিতে মোটরবাই

এই মোটরসাইকেলগুলো পরবর্তী সময়ে ব্যাপক ভাবে বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে এই দুই খ্যাতিমান চালকের কারণে।

পুরুষদের সঙ্গে মারাদাঙ্গা ছবিতে পাল্লা দিয়ে বাইক চালিয়েছেন হালের হলিউড নায়িকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। ‘সল্ট’ ছবিতে তাকে যে বাইকটি বিপজ্জনক গতিতে ব্যস্ত রাজপথে চালাতে দেখা গেছে সেটা ছিলো অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটিও ছিলো সেই ট্রায়াম্ফ কোম্পানীতে তৈরি। জোলি দুরূহ শটগুলিতে নিজেই চালিয়েছিলেন নিজের প্রিয় বাইক।

মারদাঙ্গা সিনেমার সঙ্গে মোটরবাইকের সম্পর্ক গভীর। কিন্তু পর্দায় প্রেমকাহিনির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই মোটরবাইক। রোমান হলিডে সিনেমা যেমন এক অমর প্রেমকাহিনি তেমনি অমর এই ছবিতে ব্যবহৃত ইতালীর ভেসপা কোম্পানীর তৈরি ভেসপাটি। ছবিটি ছেষট্টি বছর পরেও মোহজাল বিস্তার করছে এ যুগের দর্শকদের মাঝেও। সেখানে ভেসপায় চড়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন গ্রেগরি পেক আর হেপবার্ন জুটি। তাদের ব্যবহৃত ভেসপাটিও ইতিহাসে হয়ে উঠেছে মূল্যবান। এক মোটরবাইক সংগ্রাহক পৃথিবীতে শেষ সংস্করণ হয়ে টিকে থাকা ভেসপাটি নিলাম থেকে কিনে নিয়েছেন লক্ষ মার্কিন ডলার ব্যয় করে।

রোমান হলিডে ছবির সেই ভেসপা

প্রেমের সিনেমায় বাঙালির স্মৃতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবি ‘সপ্তপদী’ যেখানে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি গুনগুন করেনি এমন বাঙালির সংখ্যা কম। সেই গানের পুরো দৃশ্যায়ন করা হয়েছিলো একটি এনফিল্ড বাইকে। মহানায়ক তার প্রেমিকাকে পেছনে বসিয়ে বাইক ছুটিয়ে চলেছেন দীর্ঘ এক পথ ধরে। হাওয়ায় উড়ছে তার টাই। বাংলা সিনেমার এক অমলিন দৃশ্য। যদিও পুরো দৃশ্যটিই স্টুডিওর ভেতরে ব্যাকড্রপ ফেলে শুট করা হয়েছিলো কিন্তু তাতেও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বাঙালির আবেগ। এমনি রোমান্টিক দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি মোটরসাইকেল। সেও চরিত্র সেখানে। বলিউডে তৈরি আরেক বিখ্যাত ছবি ‘সোলে’ তে-ও সাইডকার লাগানো এনফিল্ড বাইককে অমরত্ব দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন আর ধর্মেন্দ্র। দুই বন্ধুর গল্পে বাইকটিও হয়ে উঠেছে আরেকটি সিগনেচার।

জেমসবন্ড ছবিতে মোটরবাইকে চেপে নায়কদের আকাশপাতাল এক করে ফেলতে দেখা যায় পর্দায়। এমনি এক বাইক ব্যবহৃত হয়েছে জেমস বন্ডের সাম্প্রতিক সিনেমা ‘স্কাইফল’-এ। খবরে প্রকাশিত হয়েছে ইয়ামাহা কোম্পানীর যে বাইকটিতে করে বন্ড শত্রু তাড়িয়ে বেড়িয়েছিলেন তার ২০টি বিকল্প তৈরি করা হয়েছিলো। কারণ প্রতিবার শুটিংয়ের সময় একটি করে বাইক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলো।

প্রেমে আর দাঙ্গায় মোটরবাইক সিনেমার পর্দায় বেশ বড় একটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। বাইক চরিত্র হিসেবে তার অমিত গতি নিয়ে এখন চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ছুটে চলেছে আরো ইতিহাস তৈরি করতে হয়তো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]