সিমবায়োসিস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

আফরিন আহমেদ

মনসুর আলী সাহেব বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।

হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। মনসুর আলী সাহেব।

সাধারণত গল্পের মূল চরিত্রের নামটা একটু ক্যারিশমাটিক হলে পরে নাকি গল্প ভালো চলে। কিন্তু আমাদের আজকের গল্পের মূল চরিত্রের নাম মনসুর আলী। বয়স  সাতচল্লিশ।  অবশ্য দেখে মনে হয় পঞ্চাশের কাছাকাছি। ধূসর চুল টেকো মাথায় দেখা না গেলেও, গোঁফ দাড়িতে রূপালী আনাগোনা শুরু করে দিয়েছে দিব্যি।

এ বছরের প্রথম বরফ পড়ছে। মনসুর আলী সাহেব খালি গায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।  এখানে বারান্দাকে বলে ডেক বা প্যাটিও। কাঠের তৈরি  হলে ডেক। আর সিমেন্ট দিয়ে বানানো হলে প্যাটিও। সে হিসেবে মনসুর আলী সাহেব ডেকে দাঁড়িয়ে বছরের প্রথম ফ্লারিস উপভোগ করছেন।

অবশ্য উনার মুখভঙ্গি দেখে ব্যাপারটাকে উপভোগ বলে মোটেই মনে হচ্ছে না। বরং কিঞ্চিৎ বিরক্ত বলেই বোধ হচ্ছে। তবে বিরক্ত  কিনা তা বলাও তো মুশকিল। এক দুজন মানুষ এর সঙ্গ ছাড়া তাঁর কপালে ভাঁজেরা খেলা করে নিত্য।

প্রত্যেকটা বরফ অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেলেদুলে তালে তালে অনেকটা স্লো ব্যালে ড্যান্সের মত করে মাঠে আর ডেকে এসে পড়ছে। কখনো কখনো চকিত কারোর কারোর শুভ্র পোশাকে কী একটা দ্যুতি যেন দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে।

এরা এদেশের মানুষের মতন স্বভাব পেয়েছে। যস্মিন দেশে যদাচার এই প্রবাদটা এরা বোধ হয় জানে। এত সাড়ম্বরে সবাই নেচে নেচে পড়ছে, কিন্তু পুরা ব্যাপারটা ঘটছে নিঃশব্দে।

আর এই জিনিসটাই মনসুর আলী সাহেবের বিরক্তির অন্যতম কারণ। উনি একা থাকতে পছন্দ করেন, নির্জনতা উনার খুব প্রিয়। এত পছন্দ যে উনি ইচ্ছে করে শহর থেকে বেশ দূরে নির্জন একটা পাহাড়ি  জায়গায় বাড়ি ভাড়া করেছেন। কিন্তু তারপরেও তুষারকন্যাদের নিঃশব্দ ব্যালে ড্যান্স উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। আজ দশ বছর ধরে এই চেষ্টাটা উনি অনেকবার করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই আশ্চর্যজনক ভাবে পরাজিত হয়েছেন, মেনে নিতে না পেরে।

হ্যাঁ, মনসুর আলী সাহেব এদেশে এসেছেন দশ বছর হয়ে গেল। উনি বছরের এই সময়টাতে খুব ভয়ে ভয়ে থাকেন, কখন উনাকে বছরের প্রথম তুষারপাত দেখতে হয়।

আর দশ বছর ধরেই তুষারপাত দেখলেই উনি কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় করে আনমনা হয়ে নিজের দেশের বৃষ্টির কথা ভাবেন।

উনাদের বাড়ি পাকা দালান। তাও কল্পনায় উনি টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ শুনতে পান। মায়ের হাতের খিচুড়ি আর ডিমভাজা, বা ভরসন্ধ্যায় ঝাল ঝাল চানাচুর মাখা আর পিয়াজুর কথা মনে করে, নিজের সঙ্গে নিজে অভিমানে একবেলা বার্গার না খেয়ে থাকেন।

এই অতিসাধারণ গল্পটি মোচড় খেয়ে ওঠে পরের প্যারায়।

উচ্চতর ডিগ্রি, প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও, মনসুর আলী সাহেবকে আচমকাই টিনের চালের ঝুম বৃষ্টি আর চানাচুরমাখা খাওয়ার জন্য হলেও নিজের দেশে ফেরত চলে যেতে হয়। সে অনেক রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ।  গল্পলেখক অত রাজনীতি বোঝেটোঝে না। তাই আপাতত ব্যাপারটা ওই মারপ্যাঁচ শব্দ পর্যন্তই থাকুক।

মনসুর আলী সাহেব দু‘বছরেও সেই মারপ্যাঁচ এর গিট্টু খুলতে পারলেন না। উনি বরাবরই হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষ হয়তো। এ ব্যাপারেও অবশ্য মতভেদ আছে। ওই যে, যে বিশেষ দুই একজনের সামনে উনার কপাল মসৃণ খেলার মাঠ হয়ে যায়, তাঁরা আসলে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন এই হাল এর বিষয়ে।

আজ হালখাতা খোলার দিন। আকাশ কালো করে তর্জন গর্জন চলছে মেঘেদের। মনসুর আলী সাহেব আজও খালি গায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।

হ্যাঁ, এবার ডেক বা প্যাটিও নয়। বারান্দায়ই। বড় ফোঁটায় ফোঁটায় নৃত্য শুরু করেছে বৃষ্টিকন্যারা। মনসুর আলী সাহেব আজ একটু নির্জনতা খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। মেঘেদের ঢাকঢোল তবলা বাঁশির সুর ছাপিয়ে, নৃত্যরত ঘুঙুর আড়াল করে, মনসুর আলী সাহেব খুব সঙ্গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

সেই দীর্ঘশ্বাস অত দীর্ঘ নয় যে, তা গিয়ে পৌঁছবে নিঃশব্দ ব্যালে ড্যান্সারদের চিঠির বাক্সে!

ছবি: মাসুদুল হাসান রনির ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]