সিলেটে দুইদিনে পাঁচ

সম্রাট

সম্রাট

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা উঠলে  সিলেটর নাম আসবেই -পাহাড় , ঝরনা , নদী , খাল , হাওর , বিল , বন ,ইকো পার্ক – মিলেমিশে যেন  প্রকৃতির সমাহার।এবারে আমাদের সফর ২ দিনে সিলেটের ৫ টি স্থান।

১ম দিন : রাতারগুল – বিছনাকান্দি – পাংথুমাই

২ম দিন : লালাখাল ও জাফলং

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি….. এমন করেই হয়Lalakhal (1)তো গেয়ে উঠবে আপনার মনটা হঠাৎ । কারণ সিলেট তার লাস্যময়ী সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে আলিঙ্গন করতে ।

সিলেটের প্রকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা করে শেষ করা যায় না, এই সৌন্দর্য শুধুই উপভোগ করার। তাইতো এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে ‘শ্রীভূমি সিলেট’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ঢাকা -উত্তরা থেকে রাত ১১:৩০ আমাদের যাত্ৰা শুরু গাড়ী ছাড়ার কথা থাকলে ও সঠিক সময় হতে কিছু বিলম্ব হলো। আমাদের যাত্রা শুরু হলো রাত ১২:০০ টার একটু আগে (১১:৪৫ মিনিট এ) জোস্নাচাঁদের আলোর বুক চিরে ছুটে চলছি আমরা আঁকা বাঁকা পথ ধরে। মাঝে মাঝে গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখা মিলছে চাঁদ মামার। কখন যে সিলেট চলে আসলাম বুঝতেই পারলাম না – হয়তো মনে প্রকৃতি প্রেমের উৎকণ্ঠা বেশী ছিল সেই জন্যই। অবশেষে ভোর ৫:০০ সিলেট গিয়ে পৌছালাম। বাসস্ট্যান্ড থেকে মাইক্রো ভাড়া করে চলে যাই হোটেল পলাশ , অম্বরখানায়। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ৬ টায় বাহির হই, আগে থেকেই মাইক্রো ঠিক করা ছিল যে সারাদিন সঙ্গে থাকবে। ভাড়া ৫৫০০ (সঙ্গে কিছু বকশিস)

প্রথমদিন শুরু, মিশন রাতারগুল:

৬:৩০ মিনিটে নাস্তা সেরে আম্বরখানা থেকে যাত্রা শুরু সরাসরি রাতারগুলের উদ্দেশ্যে (মোটর ঘাট হয়ে নৌকায়ও যাওয়া যায়) । যে দিকেই তাকাই যেন মনে হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে আমরা, কখনও চা বাগানের ধার ধরে চলছি , আবার কখনো দূরের ওই পাহাড়ের ডাকে ছুটছি – আঁকা বাঁকা পথ ধরে।  যদি ও পথ কিছুটা খারাপ(ভাঙা চূড়া)। আর সেই ভাবনাটা মাথায় ও আসেনি হয়তো ভালো কিছু দেখতে পাবো বলে। যাই হোক ৮:৩০ মিনিটে রাতারগুল চলে আসলাম। মনে ভাসা ছবির সাথে মিলে গেলো সবকিছু। ৬০০ টাকায় নৌকা ভাড়া করে যাত্রা শুরু বনের উদ্দেশ্যে । মাঝি বইঠা বেয়ে গোয়াইন নদী দিয়ে ছুটে চললো। ১০ মিনিট নৌকা চলার পরই দেখা মিললো বহু কাঙ্ক্ষিত রাতারগুলের । জলের মাঝে বন, মনের মাঝে শীতল ছোয়া দিয়ে বললো, ” এসো আমার মাঝে এসো”। প্রকৃতির এ রূপ  অন্য কোথাও আছে-কিনা আমার জানা নেই , আমি নির্বাক প্রকৃতির এ রূপ দেখে। জলের গাছ গুলো ছায়া দিয়ে মায়া করে আগলে রেখেছে রাতারগুলকে। আমরা যদিও কোন সাপ দেখিনি, শুনেছি গাছের ডালে প্রায়ই রঙ্গিন সাপের বিশ্রামের দৃশ্য দেখা যায়। তবে বনের উপরে উড়ে উড়ে খেলা করছিল – শংক্ষচিল , পানকৌড়ি , মাছরাঙ্গা – আর বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল পাখির মধুর গানের গুনগুনানি শব্দ।  যান্ত্রিক কোলাহল মূক্ত এমন মনোরম পরিবেশ মন ও শরীরের সকল ক্লান্তি দুর করে দিল। খুব ভোরে যাওয়াতে দর্শনার্থি কম ছিল । বনের মাঝে থাকা ওয়াচ টাওয়ার থেকে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতে পেরেছি রাতারগুলকে ।Ratargul (6)

বিছনাকান্দি:

এই সময়ের সিলেট এর আকর্ষনীয় জায়গাগুলোর মধ্যে বিছনাকান্দি উল্যেখযোগ্য। বন্ধুরা অনেকেই ঘুরে এসেছে বিছনাকান্দি তাই  ভ্রমন লিষ্ট থেকেও তাই বাদ পড়লোনা ।

পরিকল্পনা মত কাজ, মাইক্রো করে রাতারগুল থেকে চলে আসলাম হাদারপার বাজার – সময় লাগলো ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট । হাদারপার বাজার থেকে হেটেও বিছনাকান্দি যাওয়া যায়, মাঝে ১০ টাকায় নৌকা পারাপার। কিন্তু ১৬০০ টাকায় ট্রলার ভাড়া করে কিছু ঘুরে বিছনাকান্দি আসলাম, দেখতে পেলাম গোয়াইন নদী থেকে সীমানার ওপারের পাহাড় থেকে ঝরে পরছে ৮/১০ টি ঝরনা । এমন দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি । আকাশে অনেক বেশি মেঘ থাকায় ঝরনাগুলো ছিল অনেক প্রানবন্ত। সবুজ পাহাড় বেয়ে ঝরে পরা ঝরনাগুলো প্রকৃতিকে করে দিলো আরো বেশি স্নিগ্ধ এবং মনোরম যেন উপর থেকে কেউ দুধ ঢেলে দিচ্ছ । ৩০ মিনিট এ মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম সপ্নের বিছনাকান্দি। দুর থেকে চোখে পরলো শত শত মানুষের ভিড় । তখনই বুঝে গিয়েছি কাছ থেকে কতো না সুন্দর হবে বিছনাকান্দি।

বিছনাকান্দি

বিছনাকান্দি

ঘাটে ট্রলার থামার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পরি বিছনাকান্দির বালিতে । ছুটে চললাম পাহাড়ের মাঝদিয়ে বয়ে আসা পানির দিকে। খুবই সাবধানতার সঙ্গে অনেক গুলো পাথর পেরিয়ে একদম শেষ প্রান্তে চলে গেলাম । যেখানে মানুষের কোলাহল কম । ইতোমধ্যে ভারতের সীমানায় চলে এসেছি । কে দেখে সীমানার লড়াই। তখন বাস্ত গা ভিজানোতে । প্রবল বেগে বয়ে আসা শীতল পানি আমাদের শরীরও মন কে স্তব্দ করে দিল। গা ভাসিয়ে প্রকৃতির নিরব সৌন্দর্য উপভোগ করলাম অনেকটা সময় ধরে। পানির নিচে থাকা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ছিলে গেছে হাত পায়ের অনেক খানি। অনেক লাফ লাফি করে ফিরে এসে অনেক ক্লান্ত হয়ে পরলাম। ঘড়িতে সময় তখন ৪ টা । ভ্রাম্যমান হোটেল গুলোতে খাবার প্রায় শেষ। ৫০ টাকা করে ডিম দিয়ে ভাত, চাইলে আর একটা খাবার ছিল ছোলা বিড়িয়ানি (শুধু সিলেটে পাওয়া যায়)। খাওয়া দাওয়া শেষে ট্রলার করে হাদারপার ফিরে আসতে ঘড়ি বলে দিল , এখন সময় বিকেল ৫টা । যেতে হবে পাং-থু-মাই , সময় লাগবে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘন্টা। ৫ টা ১৫ মিনিটে রওয়ানা হলাম পাং-থু-মাই এর উদ্দ্যেশ্যে ।

 

 

পাং-থু-মাই :

সিলেট এর নতুন একটা দর্শনীয় স্থান “পাং থু মাই”

এই ঝর্নার নাম ‘বড়হিল ঝর্না’ এবং এই গ্রামের নাম ‘পাং থু মাই’ । গোয়াইনঘাট ডিগ্রী কলেজ থেকে প্রায় ১০কিলোমিটার দূরে ।

হাদারপার থেকে  গোয়াইনঘাট ডিগ্রী হয়ে “পাং থু মাই” আসতে সময় লেগে গেলো ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট, ঘড়িতে বাজে ৬ টা ৪৫। রাস্তা একটু খারাপ তাই একটু সময় লাগলো । দিনের আলো পাওয়া গেলোনা , তাতে কি গাড়ি থামতেই কাদামাটি পার হয়ে এক দৌরে একদম ঝরনার কাছে । ISO  হাই  করে Shutter  speed  কমিয়ে যদি কিছু ছবি তোলা যায় ।

পাং-থু-মাই

পাং-থু-মাই

দ্বিতীয় দিন : লালাখাল

যদি কেউ এই অভিযোগ করে যে বাংলাদেশে দেখার মত স্থান নেই তবে তার এই অভিযোগের জন্য তাকে শাস্তি দেয়া যায়না বরং তাকে জানিয়ে দেয়া যায় যে আমদের এই দেশটিতে দেখার মতো কী কী আছে। বিশ্বাস করুন যদি আপনি যদি বাংলাদেশ ভ্রমনে বের হোন তবে বছরেও শেষ করতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। বাংলাদেশ প্রায় প্রতিটি স্থানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সৌন্দর্য়্যের সমাহার। তেমনই এক নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর বাংলাদেশের লালাখাল ও জাফলং।

লালাখাল

লালাখাল

 লালাখাল:

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে, জাফলং যাওয়ার পথে জৈন্তাপুর উপজেলার সারিঘাটের কাছেই অবস্থিত, স্বচ্ছ নীল পানির নদী ‘লালাখাল’। নির্জন মনকাড়া লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর দুই ধারের অপরূপ সৌন্দর্য, দীর্ঘ নৌ-পথ ভ্রমণে যেকোনো পর্যটকের কাছে এক দুলর্ভ আকর্ষণ। প্রকৃতিকে একান্তে অনুভব করার জন্য স্থানটি বেশ উপযোগী। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা-বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখালজুড়ে।

ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচে লালাখালের অবস্থান। চেরাপুঞ্জি থেকে এ নদী বাংলাদেশে প্রবাহিত।

জাফলং:

পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝর্ণা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য আর কোথায় পাবেন, জাফলং ছাড়া?

এটি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত, একটি এলাকা। জাফলং, সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, এবং এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।

জাফলং

জাফলং

খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপলীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড় টিলা। ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেলপানি,উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদেরদারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে

যেভাবে যাবেন : ট্রেনঃ ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য রাতের ট্রেন কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত ১০টায়। সিলেট পৌঁছায় সকাল ৭টায়। ভাড়া ২৯৫ টাকা।YooniqImages

বাসঃ শ্যামলী,হানিফ, গ্রীন লাইন, সোহাগ, সাউদিয়া, এস আলম, এনা (ঘোড়াশাল-টঙ্গী রুট)। ভাড়া ৪৫০ টাকা।

সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল (কদমতলি) থেকে বাস/মাইক্রোবাস/অথবা ধোপাদিঘীরপাড় ওসমানী শিশু উদ্যানের সামনে থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা/হিউম্যান হলারে (লেগুনা) যেতে পারেন জাফলং। সময় লাগবে দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। ভাড়া ৬০ টাকা। মাইক্রোবাস-২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। সিএনজি অটোরিকশা ১০০০ টাকা।bus

আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে গোয়াইনঘাট বাজার (সিএনজি , বেবি টেক্সি অথবা লেগুনায়)

গোয়াইনঘাট বাজার থেকে মাতুরাতল/আরাকান্দি (সিএনজি , বেবি টেক্সি অথবা লেগুনায়)

মাতুরাতল/আরাকান্দি থেকে ‘পাং থু মাই’ (পাঁয়ে হেটে ৪/৫কিমি)

অথবা: হাদার পার থেকে বোট নিয়ে বিছনাকান্দি ও পাং থু মাই এক সাথে দেখে আসা যায় – বোট ভাড়া ১০০০ – ১৫০০ টাকা

(গোয়াইনঘাটের রাস্তা খুব একটা ভালো নয় , জাফলং হয়ে ও যাওয়া যায় )

থাকার হোটেল :

হোটেলঃ সিলেট শহরে থাকার জন্য অনেকভালো মানের হোটেল আছে। শহরের নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০)।

জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫)। ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৮২৬৩)। লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭)।

আম্বরখানায় হোটেল পলাশ (০৮২১-৭১৮৩০৯)। দরগা এলাকায় হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)। হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)।

জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)। তালতলায় গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮) ইত্যাদি।

ভাড়া ৩০০ থেকে শুরু করে ৩০০০টাকা পর্যন্ত ভাল হোটেলের ভাড়া,দরগাগেটে আরো কয়েকটি ভাল হোটেল আছে।

আবার নলজুড়ি উপজেলা সরকারি ডাকবাংলোঃ পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে এইখানে থাকতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারিদের জন্য প্রতিটি রুম ৫০০টাকা। আর সিভিলিয়ানদের জন্য ১৫০০টাকা।

খাবার রেস্তোরাঃ পানশি, পাঁচ ভাই জনপ্রিয় দুটি রেস্তোরা। এছাড়া আছে উন্দাল সহ সব নামি-দামি খাবার দোকান আছে।

ছবি: সম্রাট ও গুগল