সিলেটে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অনির্বান রায়

১৯১৯ সালের ১১ অক্টোবর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবকাশ যাপনের জন্য আসামের তৎকালীন রাজধানী শৈলশহর শিলং এলেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী।
সিলেট ব্রাক্ষসমাজের তৎকালীন সম্পাদক গোবিন্দ নারায়ন সিংহ কবিকে সিলেট পদার্পণের নিমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলেন। কিন্তু বাধ সাধলো তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা।

সিলেটে

ভৌগলিক দিক দিয়ে সিলেট শিলং এর কাছাকাছি হলেও সিলেট পর্যন্ত সরাসরি রাস্তা ছিলো না। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত সড়ক ছিলো। চেরাপুঞ্জি থেকে খাসিয়ারা ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতি প্রচলন ছিলো। কিন্তু এ ব্যবস্থা মানবাধিকারের লংঘন বলে কবি সরাসরি নাকচ করেন এবং সিলেট থেকে প্রেরিত নিমন্ত্রণ বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।

কবির নেতিবাচক উত্তর পেয়ে গোবিন্দ নারায়ন সিংহ , আনজুমানে ইসলাম, মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংঘটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কয়েকটি টেলিগ্রাম পাঠান। আবেগঘন টেলিগ্রামগুলো কবির হৃদয়কে প্রভাবিত করে। তিনি সিলেট আসার দীর্ঘ অথচ বিকল্প পথ গৌহাটী থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে সিলেট পৌছানোর পথে সিলেট আসতে রাজি হন।

৩১ অক্টোবর কবিগুরু শিলং থেকে গৌহাটী অভিমুখে যাত্রা করেন। সময়টা ছিলো ১৩২৬ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের মাঝামাঝি । সেখানে কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিশাল আয়োজন করা হয়। দিন তিনেক সেখানে অবস্থান করে কবি ৩ নভেম্বর গৌহাটী থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ

সিলেট থেকে একটি প্রতিনিধিদল কবিগুরুকে এগিয়ে আনতে বদরপুর পর্যন্ত যায়। ট্রেন কুলাঊড়া জংশনে পৌছালে তাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানো হয়। কবি ও তার সহযাত্রীরা কুলাঊড়াতে রাত্রিযাপন করেন
কুলাউড়া জংশনে তাঁদের রাত্রিবাস করতে হলো ট্রেনে। পরদিন [১৮ কার্তিক : ৪ নভেম্বর] সকালে সিলেটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার পর পথে মাইজগাঁও, বরমচাল, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রভৃতি স্টেশনে ট্রেন থামলে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এসে তাঁকে সংবর্ধিত করেন।’
সুসজ্জিত বোটে রবীন্দ্রনাথ এবং বজরায় রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী সুরমা নদী পার হয়ে চাঁদনিঘাটে উপনীত হন। “চাঁদনিঘাট পত্র-পুষ্প-পতাকা মঙ্গলঘটে সুসজ্জিত, ঘাটের সবগুলো সিঁড়ি লাল শালুতে মোড়া”।’ সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চাঁদনীঘাটকে পত্র-পুষ্প পতাকা, মঙ্গল ঘট আর লাল শালু দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়।

কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য অভ্যর্থন পরিষদ গঠন করা হয়। সভাপতি নিযুক্ত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ। ৫ নভেম্বর সকালে ট্রেন সিলেট স্টেশনে পৌছালে কবিগুরুকে রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন করা হয়। অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ, মৌলভী আব্দুল করিম, রায়বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, এহিয়া ভিলা, কাজী বাড়ি ও মজুমদার বাড়ী, দস্তিদার বাড়ির অভিজাত ব্যক্তিবর্গ। সিলেট মহিলা সমাজের পক্ষে অভ্যর্থনা জানান নলিনীবালা চৌধুরী।
শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি মৌলভী আব্দুল করিমকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি সুসজ্জিত ফিটন গাড়িতে করে শহরের উত্তর-পূর্বাংশে ছোট টিলার উপর পাদ্রী টমাস সাহেবের বাংলোর পাশে একটি বাড়িতে যান। এখানেই কবির থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
কবি সিলেট শহরের চৌহাট্টার গোবিন্দ সিংহের বাসভবনে (বর্তমানে এটি সিংহবাড়ি হিসেবে পরিচিত) অতিথি হিসেবে ওঠেন। আর নয়াসড়কের মিশনারি বাংলোয় তার থাকার ব্যবস্থা হয়।

নয়াসড়কের মিশনারি বাংলোটির অস্তিত্বই নেই। বর্তমানে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ওই বাংলোতে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, মহাত্মা গান্ধীও রাতযাপন করেন। ওই বাংলাতো বসেই সিলেটকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ

পরদিন ৬ নভেম্বর সকালে লোকনাথ টাউনহলে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী যিনি সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন । তাছাড়া ছিলেন সৈয়দ আবদুল মজিদ ( কাপ্তান মিঞা ) যিনি পরবর্তীতে আসামের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী হন ।
এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আব্দুল মজিদ। সৈয়দ আবদুল মজিদ যদিও খুব ভালো ইংরেজি ও উর্দু জানতেন কিন্তু শুদ্ধ বাংলাতে ভাষণ দিতে পটু ছিলেন না । তাই তিনি উর্দুতে ভাষণ দেন । প্রায় পাঁচ হাজার লোক সভায় উপস্থিত ছিলেন ।

অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন নগেন্দ্রচন্দ্র দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিনন্দনের জবাবে বক্তৃতা প্রদান করেন যা পরে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙালির সাধনা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। টাউন হলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি ‘ বাঙ্গালীর সাধনা’ শীর্ষক দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা করেন। পরে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করে ‘Towards the future’ নাম দিয়ে মডার্ণ রিভিয়ু পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
ঐদিন কবিকে ব্রাহ্ম সমাজ থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয় । সেখানে কবি ” বীণা বাজাও হে মম অন্তরে ” গানটা গেয়েছিলেন ।

তারপর উপনিষদ থেকে আবৃত্তি পাঠও করেছিলেন ।

বলা হয় যে কবি টেবিলে পাতা সুদৃশ্য মনিপুরী চাদর দেখে মনিপুরী হস্ত শিল্পে আগ্রহী হন । মণিপুরীদের রাখাল নৃত্য কবিকে মুগ্ধ করে ।

এরপর কবি শহরের উপকন্ঠে মাছিমপুর এলাকায় মনিপুরী পল্লীতে যান। কবির সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী রমনী কর্তৃক পরিবেশিত রাসনৃত্য মুগ্ধ হন। পরে তিনি মনিপুরী গ্রাম থেকে কিছু চাদর কেনেন । এখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিগুরু পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে মনিপুরী নৃত্য চালু করেছিলেন।

সিলেটে

সেই উদ্দেশ্যে ১৯২০ সালে কবিগুরু তৎকালীন সিলেট জেলার কমলগঞ্জ থানার বালিগাও গ্রামের মণিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জী, ত্রিপুরা থেকে গুরু বুদ্ধিমন্ত সিংহ ও আসামের গুরু সেনারিক সিংহ রাজকুমারকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান প্রশিক্ষক হিসেবে। বলা হয়ে থাকে মণিপুরি নৃত্য কে মণ্ডপ প্রাঙ্গন থেকে বের বিশ্বমণ্ডলে স্থান করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মণিপুরী নাচ শেখাবার উদ্দেশ্যে ১৩২৬ সন থেকে ১৩৩৬ সন এই দশ বছরের মধ্যে তিন তিনবারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে সবশুদ্ধ ছয়জন মণিপুরী নৃত্যশিক্ষককে আনিয়েছি শান্তিনিকেতনে।
পরদিন সাত নভেম্বর দুপুরে মুরারিচাঁদ ছাত্রাবাসে কলেজের ছাত্র-শিক্ষকমন্ডলী কবিগুরুকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। অভিনন্দনের উত্তরে কবি সুদীর্ঘ বক্তব্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই বক্তব্য শান্তিনিকেতন পত্রিকার ১৩২৬ সালের পৌষ সংখ্যায় ‘আকাঙ্ক্ষা’ নামে প্রকাশিত হয়।

এমসি কলেজের সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ১৪ বছরের একটি বালক সে বক্তব্য শোনে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখেন ‘আকাঙ্ক্ষা উচ্চ করতে হলে কি করা প্রয়োজন?’ রবীন্দ্রনাথ উত্তরও দিয়েছিলেন। এরপর তৈরি হলো গুরু শিষ্য পরম্পরার নয়া ইতিহাস। সে বালকটি ছিলো সৈয়দ মুজতবা আলি , শান্তি নিকেতনে কলেজ পর্যায়ে প্রথম “বিদেশী” ছাত্র।
সিলেট তখন ছিলো “বাংলার রাষ্ট্র সীমা থেকে” দূরে আসামের সঙ্গে। এটি রবীন্দ্রনাথ কেও আহত করেছিল,তাই তিনি সিলেটে বসেই লিখেছিলেন ‘মমতাবিহীন কালস্রোতে/ বাংলার রাষ্ট্র সীমা থেকে/ নির্বাসিতা তুমি/ সুন্দরী শ্রীভূমি…।’

পরদিন আট নভেম্বর কবিগুরু সিলেট থেকে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন।
এই ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’তে ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন। আগমনের ২২ বছর পর কবিগুরুর মৃত্যুর পরপরই সিলেটবাসী শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৪১ সালে কবি-প্রণাম নামে একটি স্মারক প্রকাশ করেছিলেন। সে স্মারকে প্রথমবারের মতো কবির স্বহস্তে লেখা কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছিলো।

তত্কালীন সিলেটের জামতলা এলাকার ‘বাণীচক্র ভবন’” হতে নলিনীকুমার ভদ্র সংকলনটি প্রকাশ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এটি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন নলিনীকুমার ভদ্র, অমিয়াংশু এন্দ, মৃণালকান্তি দাশ ও সুধীরেন্দ্রনারায়ণ সিংহ।

ছবি: গুগল

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]