সীতাকুণ্ডে একদিন…

আব্দুল ওহাব তমাল

এইতো গত দুইদিন আগেই ঘুরে এলাম সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়, গুলিয়াখালী সী-বিচ ও মহামায়া লেকে কায়াকিং করে। যার মূল আয়োজনে ছিলো অনলাইন ভিত্তিকিএকটি  ভ্রমনগ্রুপ। প্ল্যান ছিলো ২ রাত ১ দিনের।পাহাড়ের ট্রেকিং ছাড়া সবকিছুতেই চেষ্টা করেছি রিলাক্স একটা ট্যুর সম্পন্ন করতে।তাই ঢাকা থেকে আমরা রিজার্ভ হায়েস নিয়ে ১১ জনের গ্রুপ রওনা দিই।রাত ১১ টায় গুলিস্থান থেকে রওনা দিয়ে সকাল সকাল পৌঁছে যাই সীতাকুন্ড বাজারে।সীতাকুণ্ড অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি। এ এলাকা শুধু হিন্দুদের বড় তীর্থস্থানই নয় খুব ভাল ভ্রমনের স্থানও বটে। সীতাকুণ্ডের পূর্বদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড় আর পশ্চিমে সুবিশাল সমুদ্র।সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ৪কি.মি. পূর্বে চন্দ্রনাথ পাহাড়  অবস্থিত। আমরা সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্যে কোন রেস্টুরেন্ট খোলা না পেয়ে সৌদিয়া নামের রেস্টুরেন্টে ঢুকি। তবে খাবার আর সার্ভিস দুইটাই মারাত্নক খারাপ ছিলো। তবুও এতোটুকু ট্রেকিং পথ হিসেবে খেয়ে নেয়া।ব্যাপারটা সত্যিই কষ্টকর ছিলো।ওখান থেকে আমাদের গাড়ি নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের নিচে চলে যাই। চন্দ্রনাথ পাহাড় শ্রেণীভূক্ত ছোট পাহাড় গুলো ব্যাসকুণ্ড থেকে শুরু হয়েছে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে হিন্দুদের কিছু ধর্মীয় স্থাপনাও আপনার চোখে পড়বে। এখানে কিছু নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষও বসবাস করে, যারা ত্রিপুরা নামে পরিচিত এবং এখানে তাদের কিছু গ্রামও আছে। সীতাকুন্ডে অনেকগুলো ঝর্ণা আছে তবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে আপনারা শুধু একটি মাত্র ঝর্ণা দেখতে পারবেন, এস্থান থেকেই পাহাড়ে উঠার পথ দু ভাগে বিভক্ত হয়েগেছে, ডানদিকের  রাস্তা প্রায় পুরোটাই সিঁ‌ড়ি আর বামদিকের রাস্তাটি পুরোটাই পাহাড়ী পথ, কিছু ভাঙ্গা সিঁ‌ড়ি আছে। বাম দিকের কাঁচা পথ দিয়ে উঠা সহজ আর ডানদিকের সিঁ‌ড়ির পথ দিয়ে নামা সহজ,আমার দুইবারের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।তবে চন্দ্রনাথের মন্দিরে পৌঁছাতে আপনাকে সবার আগে আপনার মনোবল আর প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকতে হবে।আমাদের এই ট্যুরে ষাটোর্ধ তিনজন ছিলো। তারা ধৈর্য্য ও মনোবলের দিক থেকে ছিলো সম্পূর্ণ তরুন। ভ্রমনপিপাসু মন নিয়ে দুই জন মন্দিরের চুড়ায় উঠে যায়।আর অন্যজন চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। তবুও শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে উনি আর উঠেননি। পাহাড়গুলো বেয়ে আপনি যতো উপরে উঠবেন তার চারিদিকে তাকিয়ে ততোই মুগ্ধ হবেন। কারন পাহাড় থেকে সীতাকুন্ড শহর ও সমুদ্রের সৌন্দর্য্য দেখতে পাবেন। আর হুটহাট পাহাড়ের যেকোন বাঁকেই ঠান্ডা বাতাস আপনার ক্লান্তিকে অনেকাংশই কমিয়ে দিবে।আমরা উঠার পথে বিরুপাক্ষ্য মন্দিরের ওখানে মিনিট বিশ গল্পগুজব করেও ঘন্টা দুই সময়ের মধ্যে চন্দ্রনাথ মন্দিরের চূড়ায় পৌঁছে যাই। চূড়ায় পৌঁছে এর চারপাশের ভিউ দেখে সবারই আনন্দিত।ওখানে কিছুক্ষণ থেকে সবাই গ্রুপ ছবি তুলে আবার নিচে নেমে আসি। আসার সময়ের পথটা খুব সহজ মনে হলেও খুবই সতর্কতা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন।তারপর সীতাকুন্ড বাজারে আপন রেস্টুরেন্টে মজাদার সব ভর্তা,ভাত,মাংশ,ডাল দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিই।তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই পরের গন্তব্য গুলিয়াখালী সী-বিচের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।সীতাকুন্ড বাজার থেকে নামাবাজারের রাস্তা দিয়েই যেতে হয় গুলিয়াখালী সী-বিচে। মিনিটে ৩০ এর মধ্যে পৌঁছে যাই গুলিয়াখালী বেরিবাঁধ।নেমেই হাঁটতে শুরু করি কাঁদামাখা মাঠ ধরে। ওখান থেকে বোটও যায়। তবে আমরা কাঁদামাখা পথধরেই যাই।হাঁটতে হাঁটতে আমরা মুগ্ধতার সঙ্গে পৌঁছে যাই একদম সমুদ্রের পাশে।মুগ্ধতাতো সেখানে যেখানে জোয়ার-ভাটার খেলার সঙ্গে ছোট ছোট  গর্ত আর পুরো এলাকা জুড়ে সবুজ ঘাসের কার্পেটিং।আর সারি সারি গাছের সৌন্দর্য্যও আপনাকে মুগ্ধ করবে।ওখানে ঘন্টাখানেকের মধ্যে  ঘোরা শেষ করে রওনা দিই মহামায়া লেকে কায়াকিং করার উদ্দেশ্যে।মিনিট ত্রিশেক এর মধ্যেই চলে আসি ঠাকুরদিঘী বাজারে।বাজার থেকে খুব কাছেই লেকের অবস্থান। চাইলে রিক্সা বা হেটেও যেতে পারবেন।বর্তমানে কায়াকিং খুবই জনপ্রিয়। তাই এর অভিজ্ঞতা নিতেই এই যাত্রা। মহামায়া কায়াক ক্লাবের শামিম ভাইয়ের সহযোগীতায় আমাদের জন্যে আগে থেকেই কায়াক রাখা হয়। আমরাও দেরী না করে দিকনির্দেশনা আর সেফটি ইস্যু সম্পন্ন করে শুরু করি কায়াকিং। ঘন্টাখানেক কায়াকিং করতে করতে মহামায়া লেকের সৌন্দর্য্য উপভোগ করি।তারপর পাড়ে চলে আসি।পাড়ে এসে গ্রুপের কয়েকজন মিলে লেকের পানিতে গোসল করে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করি। মেয়েদের জন্যে পাশেই চেঞ্জ করার ব্যবস্থা আছে। তবে সবকিছুই সময়ের উপর নির্ভরশীল। আমরা নিজেদের মতো করে চেঞ্জ হয়ে আবার গাড়িতে উঠি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রওনা দেই ওখান থেকে।  তারপর রাতের ভুড়িভোজ চলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন স্বাধীন রেস্টুরেন্টে।খাবারে মান যথেষ্ট ভাল ছিলো।এই ট্রিপে হাইওয়ের দামী রেস্টুরেন্ট গুলো এরিয়ে গিয়ে মধ্যমানের হোটেলগুলোতে তৃপ্তি নিয়েই খেতে পারবেন সাধ্যমতো।তবে বাসে গেলে ওদের নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টগুলোতেই আপনাকে খেতে হবে।এইটাই সমস্যা। ভেবেছিলাম জ্যামের জন্যে ঢাকায় পৌঁছাতে হয়তো ভোর হবে। তবে রাত সাড়ে বারটার মধ্যেই সবাই ঢাকায় চলে আসি। সবাই নিরাপদেই যার যার বাসা পৌঁছি।সত্যিই সারাদিনে গ্রুপের সবার ধৈর্য্য ও সহযোগিতায় খুবই সুন্দর একটা ট্যুর সম্পন্ন করে আসলাম।আমি এই ট্যুরের সবার কাছে কৃতজ্ঞ।

কিছু দিক নির্দেশনা

যেহেতু ট্রেকিং পথ আছে তাই মানানসই জুতা নিয়ে পাহাড়ে চড়বেন।পাহাড়ে উঠার সময় বাঁশের লাঠি নিয়ে উঠলে আপনার কষ্টটা অনেকাংশেই লাঘব হবে পর্যাপ্ত পানি নিয়ে যাবেন(যদিও উপরে একটু বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে)।আর সঙ্গে স্যালাইন থাকলে ভাল হয়।তাছাড়া যাদের শ্বাসকষ্ট সমস্যা আছে তারা অবশ্যই ইনহেলার জাতীয় কিছু সঙ্গে রাখবেন। নিজের অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া অতিরিক্ত কিছু নিয়ে ব্যাগ ভারী না করাই শ্রেয়।আর অবশ্যই নিজের ব্যবহৃত পানির বোতল ও কোন প্রকার অপঁচনশীল কিছু ভ্রমনস্থানে ফেলে আসবেন না।

কিভাবে যাবেন

নিজেদের গাড়ি নিয়েও যেতে পারেন।তবে নিজেদের গাড়ি না থাকলেও ঢাকা থেকে চিটাগাংয়ের  এসি, ননএসি বাস ছাড়ে সায়দাবাদ বাস ষ্টেশন থেকে। আরামদায়ক এবং নির্ভর যোগ্য সার্ভিস গুলো হলো শ্যামলী, এস.আলম, সৌদিয়া, গ্রীনলাইন, সিল্ক লাইন, সোহাগ, বাগদাদ এক্সপ্রেস, ইউনিক। সবগুলো বাসেই আপনি সীতাকুণ্ডে নামতে পারবেন। চট্টগ্রাম থেকে বাসগুলো মাদারবাড়ী, কদমতলী বাসষ্টেশন থেকে ছাড়ে।তবে আপনি চাইলে লেগুনা দিয়েও আসতে পারবেন।এছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়েঁ আসা দ্রুতগামী ট্রেন “ঢাকা মেইল” সীতাকুণ্ডে থামে, এটি ঢাকা থেকে ছাড়ে রাত ১১টায় এবং সীতাকুণ্ডে পৌঁছে পরদিন সকাল ৬.৩০ থেকে ৭টায়। অন্যান্য আন্তঃ নগর ট্রেন গুলো সরাসরি চট্টগ্রামে চলে যায়। শুধুমাত্র শিবর্তুদশী মেলার সময় সীতাকুণ্ডে  থামে।

চট্টগ্রাম শহর থেকে আপনি নিজ উদ্যোগে পারিবারিক ভাবে সিএনজি অটো রিক্সাতে করে ঘুরে আসতে পারবেন ভাড়া নিবে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আপনি যদি পাবলিক বাসে যেতে চান তবে আপনাকে নগরির অলংকার কিংবা এ কে খান মোড় থেকে বাসে উঠতে হবে ভাড়া নিবে ২০ টাকা প্রতি জন।

কোথায় থাকবেন

আপনি চাইলে চট্টগ্রামে থাকতে পারেন।তবে সীতাকুন্ডতেও কিছু আবাসিক হোটেল তৈরী হয়েছে। সেগুলোও আপনি যাচাই বাছাই করে দেখতে পারেন।আর হোটেলগুলোর মান কেমমন তা নিজে যাচাই করে নেয়াই ভালো। তবে অনেকেই চিটাগাং শহরেই থাকতে চায়। কারন সীতাকুণ্ড থেকে চিটাগাং শহর বেশী দূরে নয়।

চট্টগ্রামে নানান মানের হোটেল আছে। নীচে কয়েকটি বাজেট হোটেলে নাম ঠিকানা দেয়া হলো। এগুলোই সবই মান সম্পন্ন কিন্তু কম বাজেটের হোটেল।

১. হোটেল প‌্যারামাউন্ট, স্টেশন রোড, চট্টগ্রাম : নুতন ট্রেন স্টেশনের ঠিক বিপরীতে । আমাদের মতে বাজেটে সেরা হোটেল এটি। সুন্দর লোকেশন, প্রশস্ত করিডোর (এত বড় কড়িডোর ফাইভ স্টার হোটেলেও থাকেনা)। রুমগুলোও ভালো। ভাড়া নান এসি সিঙ্গেল ৮০০ টাকা, ডাবল ১৩০০ টাকা, এসি ১৪০০ টাকা ও ১৮০০ টাকা।

২. হোটেল এশিয়ান এসআর, স্টেশন রোড, চট্টগ্রাম : এটাও অনেক সুন্দর হোটেল। ছিমছাম, পরিছন্ন্ হোটেল। ভাড়া : নন এসি : ১০০০ টাকা, নন এসি সিঙ্গেল। এসি : ১৭২৫ টাকা।

৩. হোটেল সাফিনা, এনায়েত বাজার, চট্রগ্রাম : একটি পারিবারিক পরিবেশের মাঝারি মানের হোটেল। ছাদের ওপর একটি সুন্দর রেস্টুরেন্ট আছে। রাতের বেলা সেখানে বসলে আসতে ইচ্ছে করবেনা। ভাড়া : ৭০০ টাকা থেকে শুরু। এসি ১৩০০ টাকা।

৪. হোটেল নাবা ইন, রোড ৫, প্লট-৬০, ও,আর নিজাম রোড, চট্টগ্রাম। একটু বেশী ভাড়ার হোটেল। তবে যারা নাসিরাবাদ/ও আর নিজাম রোড এলাকায় থাকতে চান তাদের জন্য আদর্শ। ভাড়া : ২৫০০/৩০০০ টাকা।

৫. হোটেল ল্যান্ডমার্ক, ৩০৭২ শেখ মুজিব রোড, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম : আগ্রাবাদে থাকার জন্য ভালো হোটেল। ভাড়া-২৩০০/৩৪০০ টাকা।

সবার ভ্রমন হোক আনন্দময়,সবসময়।

ছবি-লেখক