সুকুমার রায় : জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন

বাঙালির প্রিয় আর সরস সময় সৃষ্টি করেছিলেন যে মানুষ সেই শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সুকুমার রায় ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। কালাজ্বরে ভুগে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান এই ক্ষণজন্মা। উল্লেখ্য যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। তাঁদের আদি নিবাস ছিলো ময়মনসিংহ জেলার মসুয়ায়। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও যন্ত্রকুশলী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তাঁর পিতা এবং অস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর পুত্র। সুকুমার রায় বাঙালি শিশুসাহিত্যিক ও ভারতীয় সাহিত্যে ননসেন্স-এর প্রবর্তক। তিনি একাধারে শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, লেখক, ছড়াকার, নাট্যকার। তিনি একদিকে বিজ্ঞান, ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ছড়া, রচনা ও ছবি আঁকায় মৌলিক প্রতিভা ও উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। মৃত্যুর এত বছর পরও তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম শিশুসাহিত্যিকদের একজন।

বড় মানুষের ছেলে, বড় মানুষের বাবা, নিজেও বড় মানুষ। কে তিনি ? বাংলা ভাষায় তেমন আছেন একজনই। তিনিই সুকুমার রায়। আগেই বলেছি তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলে, সত্যজিৎ রায়ের বাবা। শিশু-কিশোর পাঠকদের কাছে সুকুমার রায় একটি প্রিয় নাম। তাঁর ‘আবোল তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’ ও অন্যান্য অতুলনীয় লেখার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আশ্চর্য জগৎ নির্মাণের পাশাপাশি লেখাগুলির আশ্চর্য ক্ষমতা ছিলো শিশু-কিশোর পাঠকমনে নৈতিকতা ও সামাজিক শিক্ষার ইশারা দেওয়ায়। বিখ্যাত ‘সন্দেশ’ পত্রিকা বেশ কয়েক বছর সম্পাদনা করেছেন সুকুমার রায়। আর এটিকে কেন্দ্র করেই ঐ সময় সুকুমার রায়ের সাহিত্য প্রতিভা পূর্ণ বিকশিত হয়েছিলো। সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন প্রধানত খেয়াল-রসের কবিতা, হাসির গল্প, নাটক ইত্যাদি শিশুতোষ রচনার জন্য। ছেলেবুড়ো সবাই তাঁর লেখা পড়ে আনন্দ পায়। সুকুমার রায় শুধু বাচ্চাদের লেখক নন, তার বাচ্চাদের কবিতাগুলোতেও বড়দের ভাবনা-চিন্তার অনেক অনেক উপাদান পাওয়া যাবে।

সুকুমার রায়ের সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায় নামে দুই ভাই ছাড়াও তার ছিল তিন বোন। সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাঙালি নবজাগরণের স্বর্ণযুগে। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিলো সাহিত্যনুরাগী, যা তার মধ্যকার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। সুকুমার রায় সিটি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে অনার্সসহ বিএসসি (১৯১১) পাস করেন। পরে ফটোগ্রাফি ও প্রিন্টিং টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গুরুপ্রসন্ন ঘোষ স্কলারশিপ’ নিয়ে তিনি বিলেত যান। সেখানে তিনি প্রথমে লন্ডন এবং পরে ম্যাঞ্চেস্টারে স্কুল অফ টেকনোলজিতে লেখাপড়া করেন। ম্যাঞ্চেস্টারে স্কুল অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হয়ে তিনি পিতার উদ্ভাবিত হাফটোন পদ্ধতি প্রদর্শন করে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেন।

প্রবাসে থাকা অবস্থায় সুকুমার রায় বিভিন্ন বিষয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি East and West Society-তে ‘Spirit of Rabindranath’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধটি The Quest পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি বিলেতের বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা করার আমন্ত্রণ পান। তিনি Royal Photographic Society-র ফেলো (FRPS) নির্বাচিত হন। এ ক্ষেত্রে তিনি দ্বিতীয় ভারতীয়। ১৯১৩ সালে দেশে ফিরে তিনি পিতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’-এ যোগ দেন। মুদ্রণ এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ‘সন্দেশ’ পত্রিকাও। বাংলা শিশুসাহিত্যে এই পত্রিকার অবদান যে কেউ স্বীকার করবেন। বাবার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাকে আরো প্রাণময় করেছিলেন সুকুমার। তাঁর পরে সত্যজিৎ রায়। সে বিরাট এক অধ্যায়।

সুকুমার রায় একাধিক গুণের অধিকারী ছিলেন। অল্প বয়স থেকেই তিনি পিতার অনুপ্রেরণায় মুখে মুখে ছড়া রচনা ও ছবি আঁকার সঙ্গে ফটোগ্রাফিরও চর্চা করতেন। কলেজ জীবনে তিনি ছোটদের হাসির নাটক রচনা এবং তাতে অভিনয় করতেন। তিনি শান্তিনিকেতনে একবার রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে গোড়ায় গলদ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনের সময় তিনি বেশ কিছু গান রচনা করেন এবং নিজে সেগুলি গেয়েছেনও।

লেখালেখির ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। বাবা আঁকেন, লেখেন, গান করেন। দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে ‘নদী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশিত হয়, শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত ‘মুকুল’ পত্রিকায়। পরে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী যখন ‘সন্দেশ’ প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘সন্দেশ’-এর নিয়মিত লেখক এবং অংকন শিল্পী হয়ে ওঠেন সুকুমার। ছড়া, কবিতা, গল্প, নিবন্ধ, ছোটদের জন্য নানা রকম বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন ‘সন্দেশ’-এ। খুলে দিয়েছেন এক আজব জগতের দুয়ার। আজব জগৎ, আশ্চর্য জগৎ, খেয়ালখুশির জগৎ, হাসিখুশির জগৎ। এই জগতে হ্যাংলা থেরিয়াম থাকে। গেছোদাদা, হাঁসজারু থাকে। ‘হাঁস ছিল সজারু ব্যাকরণ মানি না।/ হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।’ কিংবা, ‘খেলার ছলে ষষ্ঠীচরণ/হাতী লোফেন যখন-তখন। কিংবা, ‘ঝগড়া করে দুই বেড়াল/ তুই বেড়াল না মুই বেড়াল।’

স্বস্ত্রীক সুকুমার রায়

এ রকম কত কত লাইন যে কত অনায়াসে লিখে গেছেন সুকুমার। লিখে সঙ্গে আবার ছবিও একেঁছেন! পড়লেই মজা, দেখলেই মজা। ১০০ বছরেও সেই মজা একফোটা কমেনি। কোনদিন কমবে, মনে হয় না। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, সুকুমার রায়ের লেখা ততদিন পড়বেন বাংলা অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষজন।

পিতার মৃত্যুর পর তিনি পিতৃপ্রতিষ্ঠিত সন্দেশ পত্রিকা পরিচালনা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। বিলেতে থাকা অবস্থায় তিনি এ পত্রিকার জন্য নিয়মিত গল্প, কবিতা ও নিজের আঁকা ছবি পাঠাতেন। সুকুমার রায় প্রেসিডেন্সিতে ছাত্র থাকাকালে ‘ননসেন্স ক্লাব’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যার মুখপত্র ছিল সাড়ে-বত্রিশ-ভাজা। বিলেত থেকে ফিরে তিনি গঠন করেন ‘মানডে ক্লাব’। এখানে আলোচনা ও পাঠের সঙ্গে থাকত ভূরিভোজের ব্যবস্থা। তাই ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ একে বলত ‘মন্ডা ক্লাব’।

সুকুমার রায়ের প্রধান অবদান শিশু-কিশোর উপযোগী বিচিত্র সাহিত্যকর্ম। কবিতা, নাটক, গল্প, ছবি সবকিছুতেই তিনি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ ও কৌতুকরস সঞ্চার করতে পারতেন। তাঁর কাব্যে হাস্যরসের সঙ্গে সমাজচেতনাও প্রতিফলিত হয়েছে। পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন তিনি। রচনার পরিমানও তাক লাগার মতো। ছড়া, কবিতা, গল্প, নিবন্ধ বাদে সাতটা নাটকও লিখেছিলেন। ছোটদের জন্য। সেই সব নাটক এখনও অভিনীত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো: আবোল-তাবোল (১৯২৩), হ-য-ব-র-ল (১৯২৪), পাগলা দাশু (১৯৪০), বহুরূপী (১৯৪৪), খাইখাই (১৯৫০), অবাক জলপান, শব্দকল্পদ্রুম, ঝালাপালা, লক্ষণের শক্তিশেল, হিংসুটি, ভাবুকসভা, চলচ্চিত্র চঞ্চয়ী ইত্যাদি। এছাড়া বাংলা ও ইংরেজিতে রচিত তাঁর কিছু গুরুগম্ভীর প্রবন্ধও রয়েছে। ডাইরির আকারে রচিত হেসোরামের ডাইরী নামে তাঁর একটি অপ্রকাশিত রম্যরচনা আছে। প্রকাশিত বই, ‘আবোল তাবোল, এবং ‘খাই খাই’ ছড়ার। ‘পাগলি দাশু’ ‘হযবরল’-এবং ‘বহুরূপী’ গল্পের। দুঃখের বিষয় হলো কোনও বইই তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। ‘আবোল তাবোল’ বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্তুত এবং প্রুফ দেখে যেতে পেরেছিলেন শুধু।

সুকুমার রায়ের গল্প বাংলা শিশুসাহিত্যের সম্পদ। যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পর সুকুমারের রচনা বাংলা শিশুসাহিত্যকে সাবালক করে তুলেছিল। কিন্তু সুকুমারের গল্প শুধু শিশুদের নয়, বড়দের চেতনাকেও আচ্ছন্ন করে আসছে এতকাল। কথন-বাচনে, দৈনন্দিন জীবনচর্যায় সুকুমারের বিভিন্ন বাক্যবন্ধ ও শব্দাবলি সুভাষিতে রূপান্তরিত। আবোল-তাবোলের জগৎ কিংবা খাই-খাইয়ের জগৎ যেমন বাঙালি-মননে নিখাদ ফ্যান্টাসির রূপময়তাকে তুলে ধরে, তেমনি মধ্যবিত্তীয় গ্লানিময়তার মধ্যে তৈরি করে ছদ্ম-অন্তর্ঘাতের অভীপ্সা; যে-জীবন পাওয়া হলো না, দেখা হলো না অথবা আর ফিরে আসবে না, তার কথা। মাত্র ছত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন ছিল এই অবিস্মরণীয় প্রতিভার; তার মধ্যে অতি সংক্ষিপ্ত সাহিত্যজীবন। সাকুল্যে গোটা আষ্টেক নাটক, গোটা দুই কাব্যগ্রন্থ ও বেশকিছু কবিতা, খানবিশেক প্রবন্ধ ও বিভিন্ন শিশু-কিশোরপাঠ্য গল্প ও রচনা – এই তাঁর রচনাভান্ডার। আর এর মধ্যে তাঁর ‘জীবজন্তুর গল্প’ সংখ্যা প্রায় সাঁইত্রিশ। সত্যজিৎ রায়-সম্পাদিত সুকুমার সাহিত্য সমগ্রতে এই রচনাগুলিকে সংকলন করা হয়েছে।

সুকুমারের রচিত নানাবিধ মহাপুরুষের জীবনীর মধ্যে যে প্রখর ইতিহাসবোধ ও মূল্যবোধের পরিচয় পাই এগুলির মধ্যেও তার দেখা মেলে। সন্দেশের পাতায় ডেভিড লিভিংস্টোন, গ্যালিলিও, ডারউইন, আর্কিমিডিস প্রমুখ মনীষীর জীবনী যেভাবে শিশু-কিশোরদের সামনে উপস্থাপিত করেন তা বাংলা শিশুসাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ হয়ে থাকবে। দুক্ষেত্রেই বলা যেতে পারে, পাশ্চাত্য জগৎ বিশেষত আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকার না-জানা মানুষ ও জীবজন্তুকে নিয়ে সুকুমার উদ্দীপ্ত হয়েছেন ও গল্প লিখেছেন। তাঁর নাটক ও কবিতার পরিচিত চরিত্র ও চিত্রকল্পগুলিতে দেশজ ও লোকায়ত মানুষজন প্রশস্ত পরিসর পেয়েছে; কিন্তু এই সমস্ত রচনার মধ্যে তিনি যেন বহির্মুখী এবং আন্তর্জাতিক। বিপুল বিশ্বের ভৌগোলিকতা এবং তার বৈচিত্র্যময়তা সুকুমারের লেখনীতে এক অন্য পৃথিবীর স্বাদ এনে দিয়েছে পাঠককে। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির সতেজ সাবলীল প্রকাশ ব্যতিরেকে এমনটা সম্ভব নয়।

তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক নানা রচনায় স্পষ্ট শোনা যায় এক স্বচ্ছ বিজ্ঞান-দৃষ্টিসম্পন্ন কথকের কণ্ঠ, যিনি গল্পের ছলে আধুনিক পৃথিবীর বিজ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত করান কচি-কাঁচা পাঠকদের; তাদের মধ্যে উসকে দেন আরো জানার ইচ্ছে। ‘সেকাল’ মানেই সুদূর অতীত; আর সেই বহু পুরাতন যুগের গল্পে যে আদর্শ রোমান্সের উপাদান বিদ্যমান তাকে স্ব-কপোলকল্পিত কাহিনির পরিবর্তে বাস্তব বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার মাঝে দাঁড় করান তিনি। ফলে শিশু-পাঠকের মনে ক্রমশই খুলে যেতে থাকে ঐতিহাসিক যুগের অপূর্ব চিত্রময়-রূপময় জীবজন্তুর জগৎ। সুকুমার সাহিত্য সমগ্রের দ্বিতীয় খন্ডের ভূমিকায় সত্যজিৎ রায় বিষয়টি ধরে দিয়েছেন অন্যভাবে, ‘…তৎকালে এবং তার আগে যে-সমস্ত বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক আবিষ্কার হয়েছে, আধুনিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, মানুষের সভ্যতার উপকরণে যেসব প্রয়োজনীয় উপাদান সংগৃহীত হয়েছে – সেসব তথ্যবহুল সংবাদ সন্দেশ পত্রিকায় সুকুমার নিয়মিরূপে, অত্যন্ত সরসভাবে পরিবেশন করতেন।… বিভিন্ন ইউরোপীয় গ্রন্থ বা পত্র-পত্রিকা থেকে এসব তথ্য আহৃত হয়েছে।… তাছাড়া, উনিশ শতাব্দের মধ্যভাগে আর বিশ শতাব্দের প্রথমাংশে পাশ্চাত্য জগতে বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে যে বিস্ময় ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিলো – এ দেশে শিক্ষিতজনের মধ্যেও তার আলোড়ন লেগেছিলো। এই লেখাগুলিতে অন্তর্নিহিত রয়েছে সেই একই আগ্রহ ও উদ্দীপনা; সুকুমার কিশোর মনে তাকে সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয়জন সুকুমার রায় নিয়ে লিখেছেন, ‘সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছন্দ গতি, তাঁর ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিলো সেইজন্যেই তিনি তার বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন। বঙ্গসাহিত্যে ব্যঙ্গ রসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আরো কয়েকটি দেখা গিয়েছে কিন্তু সুকুমারের অজস্র হাস্যোচ্ছ্বাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভার যে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছে তার ঠিক সমশ্রেণীয় রচনা দেখা যায় না। তাঁর এই বিশুদ্ধ হাসির দানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অকাল-মৃত্যুর সকরুণতা পাঠকদের মনে চিরকালের জন্য জড়িত হয়ে রইলো।

ছবি: গুগল