সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন

বাংলাভাষাভাষী পাঠককে গত অর্ধশতাব্দী সময়কাল যিনি মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তার সৃষ্টির কলমের যাদুতে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি অসামান্য কবি, অতুলনীয় গদ্য লেখক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, সাংবাদিক ও নিবন্ধকার এই জনপ্রিয় সাহিত্যিকের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুরের তৎকালীন মাদারীপুর (বর্তমানে জেলা) মহাকুমায়। আজীবন তিনি জন্মমাটির পিছুটান তীব্রভাবে অনুভব করেছেন বলেই তাঁর নানা রচনায় পরিচয় পাই।  স্বনামে ও নানা ছদ্মনামে লেখনীর অসাধারণ জাদুশক্তি দিয়ে তিনি এপার-ওপার বাংলার সাহিত্যপ্রেমীদের গল্প, কবিতা, উপন্যাসের রসে মাতিয়ে রেখেছিলেন। বহুমাত্রিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন যেমন একজন অসাধারণ লেখক, ছিলেন দয়ালু এবং সেইসঙ্গে উষ্ণ হৃদয়ের একজন প্রাণবন্ত আড্ডাবাজ মানুষ। ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের৷ দু’শোরও বেশি বই লিখেছিলেন৷ কবিতা ছিলো তাঁর প্রথম প্রেম৷ কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালির মননে তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন৷ 

মৃত্যুর পূর্ববর্তী চার দশক তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব হিসাবে সর্ববৈশ্বিক বাংলা ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। বাঙলাভাষী এই ভারতীয় সাহিত্যিক একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসাবে অজস্র স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন।একই সঙ্গে তিনি আধুনিক ও রোমান্টিক। তাঁর কবিতার বহু পংক্তি সাধারণ মানুষের মুখস্থ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় “নীললোহিত”, “সনাতন পাঠক” ও “নীল উপাধ্যায়” ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আধুনিক বাংলাকে এবং ভারত ও বাংলায় শিল্পায়নের প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। গ্রামীণ এবং নগর জীবনের ছোট-বড় নানা সমস্যা তিনি তার গল্পে-উপন্যাস-কবিতায় স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি সচেতন ছিলেন। আর সে কারণেই তার সৃষ্টিকর্মে প্রেম কিংবা সামাজিক সমস্যা শক্তিশালীরূপে ফুটে উঠে। রাজনৈতিক বিষয়ে দিতেন স্পষ্ট মত।
বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুরের (বর্তমানে মাদারীপুর জেলা) মাইজপাড়া গ্রামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম । প্রয়াত কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায় ও মীরা গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘরে জন্ম নেয়া সুনীল মাত্র চার বছর বয়সেই কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, দমদম মতিঝিল কলেজ ও সিটি কলেজে লেখাপড়া করেন। কলেজের পাঠ চুকানোর পর ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি নেন তিনি। এরই মধ্যে লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে সুনীলের। ১৯৫৩ সাল থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশ হতে থাকে সাহিত্য পত্রিকা কৃত্তিবাস। আর এই পত্রিকাই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে নতুন কাব্যধারার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সেই সময় ভারতে ‘হাংরিয়ালিজম’ নামের সাহিত্য আন্দোলনে যারা যুক্ত হয়েছিলন, সুনীল ছিলেন তাদেরই একজন। সুনীলের লেখা ‘নিখিলেশ’ আর ‘নীরা’ সিরিজের কবিতাগুলো তরুণদের মুখে মুখে ছিল বহুদিন। সুনীলের প্রথম কবিতা ‘একটি চিঠি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে, দেশ পত্রিকায়। বয়স তখন ১৭ বছর। সে বছরই ‘আগামী সাহিত্য’ নামের একটি সাহিত্যপত্রের সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’য় তার লেখা ‘তুমি’ কবিতাটি প্রকাশের পর আলোচনায় উঠে আসেন সুনীল। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে তরুণ সুনীল পর্যন্ত খ্যাতিমান কবিদের কবিতা ঠাঁই পায় ওই সঙ্কলনে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। একই নামে পরে একটি উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। প্রথম কবিতার বই প্রকাশের প্রায় এক দশক পর ১৯৬৬ সালে বাঙালি পাঠকের হাতে আসে সুনীলের প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। আত্মপ্রকাশের পর গল্প বলিয়ে হিসেবে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ‘দেশ’ পত্রিকায় চাকরির সুবাদে প্রচুর ফিচার, বই আলোচনা, রম্য লিখতে হয়েছে তাঁকে। লিখেছেন ছবির দেশে কবিতার দেশের মতো চমৎকার সব ভ্রমণ কাহিনি।

মেট্রিক পরীক্ষার পর সুনীলের পিতা তাকে টেনিসনের একটা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন এখান থেকে দু’টি করে কবিতা অনুবাদ করবে। এটা করা হয়েছিল তিনি যাতে দুপুরে বাইরে যেতে না পারেন। তিনি তাই করতেন। বন্ধুরা যখন সিনেমা দেখত, বিড়ি ফুঁকত সুনীল তখন পিতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করে দুপুরে কবিতা অনুবাদ করতেন। অনুবাদ একঘেঁয়ে উঠলে তিনিই নিজেই লিখতে শুরু করেন। ছেলেবেলার প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করা লেখা কবিতাটি তিনি দেশ পত্রিকায় পাঠালে তা ছাপা হয়। সুন্দরের মন খারাপ মাধুর্যের জ্বর, সেই মুহূর্তে নীরা,স্মৃতির শহর, সুন্দর রহস্যময়, আমার স্বপ্ন, আমি কি রকম ভাবে বেঁচে আছি, ভালোবাসা খণ্ডকাব্য, নীরা, হারিয়ে যেও না, অন্য দেশের কবিতা, ভোরবেলার উপহার, সাদা পৃষ্ঠা তোমার সঙ্গে, হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভু কাব্যগ্রন্থগুলো এখনো পাঠকপ্রিয়। পাঠক সুনীলের কাছ থেকে পেয়েছে শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ, সেই সময়, প্রথম আলো ও পূর্ব পশ্চিমের মতো প্রায় দুই শতাধিক গ্রন্থ। দুই বাংলায় তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচকদেরও মনোযোগ কেড়েছে বইগুলো। ঊনিশ শতকের ভারতবর্ষে বাঙালি নবজাগরণের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘সেই সময়’ উপন্যাসের জন্য ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অ্যাকাদেমি পুরস্কার পান সুনীল। প্রথম প্রকাশের পর দীর্ঘদিন সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের মর্যাদা ধরে রাখে তার ওই উপন্যাস। একই ঘটনা ঘটে ইতিহাস নির্ভর ‘প্রথম আলো’ ও ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। ১৯৪৫ সালের দেশভাগের পটভূমিতে লেখা পূর্ব-পশ্চিমে উঠে আসে পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের তিন প্রজন্মের অভিজ্ঞান। সুনীলের কলম থেকে বেরিয়ে আসা গোয়েন্দা কাহিনী ‘কাকাবাবু-সন্তু’ কিশোর বয়সীদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭৪ সালের পর থেকে এই সিরিজের ৩৫টি উপন্যাস লেখেন তিনি।

সুনীলের প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ প্রকাশিত হলে তা আক্রমণাত্মক ও সোজাসাপ্টা কথা বলার ঢংয়ের কারণে সে সময় বেশ বিতর্কের জন্ম দেয় । সুনীল পরে নিজেও স্বীকার করেন, বিতর্কের মাত্রা দেখে ‘আতঙ্কে’ তিনি কয়েক দিন কলকাতার বাইরেও কাটান সে সময়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তরুণ ‘সুনীল’ একজন ভবঘুরে। কলকাতায় বেড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী চরিত্রের তরুণকে ঘিরেই গড়ে ওঠে উপন্যাসের জমিন। আত্মপ্রকাশের পর অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, কবি ও নর্তকী, একা এবং কয়েকজন, স্বর্গের নীচে মানুষ, আমিই সে, মেঘ বৃষ্টি আলো, রক্তমাংস, দুই নারী, স্বপ্ন লজ্জাহীন, সোনালী দুঃখ, প্রথম প্রণয় প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে সুনীল লেখেন স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজী। ‘শাজাহান ও তার নিজস্ব বাহিনী’, ‘আলোকলতার মূল’ নামে দুটি গল্পগ্রন্থও রয়েছে তার। ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ ও ‘রাশিয়া ভ্রমণে’ তুলে এনেছেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। সুনীলের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ উপন্যাসকে চলচ্চিত্রের রূপ দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। আর লালনকে নিয়ে লেখা সুনীলের ‘মনের মানুষ’ এর চলচ্চিত্রায়ন করেছেন গৌতম ঘোষ। অপর্ণা সেনের ইতি মৃণালিনী চলচ্চিত্রে ‘গান হয়ে’ দর্শকের কানে বাজে সুনীলের কবিতা স্মৃতির শহর। কাকাবাবু সিরিজের দুটি কাহিনী নিয়েও চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে।

পরিণত বয়সের একটি দীর্ঘ সময় কলকাতার প্রকাশনা জগতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান আনন্দবাজার গ্রুপের বিভিন্ন প্রকাশনায় যুক্ত ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৫৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেয়ার পর ইউনেস্কোর বয়স্ক শিক্ষা প্রকল্পে কাজ শুরু করলেও মাত্র তিন মাসের মাথায় তিনি ইস্তফা দেন। ওই বছরই নিউ ইন্ডিয়া অ্যাসুরেন্স কোম্পানিতে ট্রেইনি অফিসার হিসেবে যোগ দিলেও কাজের ধরণ ধাতে না সওয়ায় ছেড়ে দেন সেটিও। এরপর শুরু হয় প্রাইভেট টিউশনি। টিকে থাকার সংগ্রামে দীর্ঘদিন ছাত্র পড়িয়ে উপার্জনই ছিলো তার একমাত্র আয়ের উৎস। এরপর ১৯৭০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয় এই সাহিত্যিকের। সর্বশেষ সম্পৃক্ত ছিলেন ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে স্বাতী বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সুনীল। তাদের একমাত্র সন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম সেবছরই। ১৯৭৭ সাল থেকে তারা বসবাস করে আসছিলেন কলকাতার ২৪ মান্দেভিলে গার্ডেনসে।

নীললোহিত, নীল উপাধ্যায় আর সনাতন পাঠক ছদ্মনামে লিখতেন অজস্র। তবে তাঁর নীললোহিত ছদ্মনামটিই বেশি বিখ্যাত। নীললোহিত নামে তিনি যে উপন্যাস বা গল্পগুলো লিখেছেন সেগুলোর অধিকাংশের নায়ক নীললোহিত নামে সাতাশ বছরের এক তরুণ। যার পায়ের তলায় সর্ষে। যে খোলা চোখে, খোলা মনে দেখে জীবনকে। নীললোহিতের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক চমকপ্রদ সাক্ষাতের বর্ণনাও রয়েছে ভ্রমণকাহিনি তিন সমুদ্র সাতাশ নদীতে। নীললোহিত, সনাতন পাঠক, নীল উপাধ্যায় ছদ্মনামে সুনীল লিখে গেছেন ভ্রমণ কাহিনী, গোয়েন্দা গল্প, কখনোবা শিশুতোষ সাহিত্য। ভারতের জাতীয় সাহিত্য অ্যাকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর অ্যাকাদেমির সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যে সার্থকতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮২ সালে বঙ্কিম পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৭২ ও ১৯৮৯ সালে দুই বার আনন্দ পুরস্কার পান। ২০১১ সালে দ্য হিন্দু লিটারেরি পুরস্কারসহ জীবনভার বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন সুনীল। বরেণ্য এই কথা সাহিত্যিককে ২০০২ সালে সাম্মানিক পদ ‘কলকাতার শেরিফ’ হিসাবে নিয়োগ দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

কবিতাকে মানুষের মুখের-ব্যবহারের ভাষার কাছাকাছি নিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। সময়ের সমস্যা তুলে ধরেছেন লেখনীতে। ইতিহাস এবং ইতিহাসের নানা ঘটনাকে আশ্রয় করে সুনীলের লেখনী শুধু পাঠক হৃদয়কেই আন্দোলিত করেনি সমাজ সচেতনতাও তৈরি করেছে ব্যাপক পরিসরে। তাই বাংলার আকাশে, পূর্ব-পশ্চিমে সুনীল চিরদিন উজ্জ্বল থাকবেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সুনীল নানাভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়েও বাংলাদেশ-ভারতের নানা ইস্যুতে সুনীল বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এমনকি তার মুখে ভারত সরকারের প্রতি উচ্চারিত হয়েছে: ‘বাংলাদেশ যা চায়, তা-ই দিয়ে দাও’। এ থেকে বোঝা যায় তিনি বাংলাদেশের কতো বড় স্বজন ছিলেন। আবার কথা রাখা না রাখা নিয়েও তিনি ছিলেন ভীষণই সন্দিহান। কেউ কথা রেখেছিল কি না, তা হয়তো সুনীলই জানেন। কেউ কথা না রাখলেও আজ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু যায়-আসে না। বিশ্বসংসারের মায়া ছেড়ে তিনি এখন অন্য ভুবনে। এটাই এখন নির্মম সত্য যে, সেই অজানা লোক থেকে এসে আর কখনো দুই বাংলার অগণিত ভক্ত-পাঠককে সাহিত্যরসে মাতাবেন না তিনি। কবিতা ছিল তার প্রথম প্রেম, তবে অনেক বেশি পাঠকপ্রিয় হয়েছেন কথাশিল্পের ‘জাদু’ দেখিয়ে। পেশা ছিল সাংবাদিকতা, লিখতে হয়েছে প্রবন্ধ-কলাম। ‘কেউ কথা না রাখলেও’ কলম তার সঙ্গে ছিল আজীবন। এক জীবনে যখন যাই করেছেন, কবিতাই ছিল সুনীলের অনেকটাজুড়ে। সে কথা তিনি লিখে গেছেন কবিতায়ও। সুনীল বলেছেন, “শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম,/ শুধু কবিতার/ জন্য কিছু খেলা,/ শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা/ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য/…’’ আবার, “শুধু কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।/ মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু/ কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।”

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু যে পাঠকের কাছে তার কথা রেখেছেন তাই নয়। তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং বাঙালি জাতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা পালন করেছেন অনন্য চারটি ক্ল্যাসিক উপন্যাসের মাধ্যমে। সেই সময়, প্রথম আলো, একা এবং কয়েকজন এবং পূর্ব পশ্চিম উপন্যাসের মূল পটভূমি পশ্চিম বাংলা হলেও বাঙালির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ধারা এতে পরিস্ফূট হয়েছে। সেই সময় উপন্যাসে ১৮৩০-১৮৭০, প্রথম আলোতে ১৮৭০ থেকে বিশ শতকের প্রথম দশক, একা এবং কয়েকজন-এ ১৯২০-১৯৫০/৫২ এবং পূর্ব পশ্চিম-এ ১৯৫০-বিশ শতকের আশির দশকের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। চারটি উপন্যাসেরই মূল নায়ক সময়। সময়ের গতিতে ক্রমপরিবর্তনশীল সমাজ উপন্যাসগুলোর মূল উপজীব্য। একা এবং কয়েকজন ছাড়া অন্য তিনটি উপন্যাসে ইতিহাসখ্যাত মানুষরা এসেছেন উপন্যাসের চরিত্র হয়ে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাভাষী পাঠকের হাতে উপহার দিয়েছেন ক্ল্যাসিক সাহিত্য থেকে তুলে আনা কয়েকটি কাহিনির নিজস্ব ভাষ্য। প্রাচীন কাহিনির সৌরভ সম্পূর্ণ অক্ষুন্ন রেখে তিনি তাতে দিয়েছেন ভিন্ন ব্যঞ্জনা। এই ধারায় লেখা তার উল্লেখযোগ্য বই হলো, রাধাকৃষ্ণ, শকুন্তলা, স্বপ্ন বাসবদত্তা ও সোনালি দুঃখ। ইউরোপের বিখ্যাত প্রেমকাহিনি সোনালি ইসল্ট ও ত্রিস্তানের উপাখ্যান নিয়ে সোনালি দুঃখ। পাশ্চাত্যের এই জনপ্রিয় মধ্যযুগীয় উপাখ্যানকে প্রথমবারের মতো বাংলায় নিজস্ব ঢংয়ে পরিবেশন করেছেন সুনীল।

সত্তর ও আশির দশকে পশ্চিম বাংলার বিশেষ করে কলকাতার আধুনিক নাগরিক প্রেম, যন্ত্রণা, মূল্যবোধ আর উচ্চাশার গল্প বলেছেন সুনীল তাঁর অসংখ্য উপন্যাসে। গভীর গোপন, দর্পনে কার মুখ, এক জীবনে, বন্ধুবান্ধব, সংসারে এক সন্ন্যাসীসহ দুইশ’র বেশি উপন্যাসে অসম্ভব গতিশীল ভাষায় তিনি জীবনের ছবি এঁকেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে বিচিত্র সব বিষয়বস্তুকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে এসেছেন মধ্যযুগের কবি, ত্রিশ দশকের ব্রিটিশ বিরোধী বিল্পবী, নকশাল বিল্পবী, দেশবিভাগের শিকার উদ্বাস্তু , মহাভারতের বীর, বাংলা উপন্যাসের লেখক, কবি, চিত্রকর, ব্যবসায়ী, বেকার, চোরাচালানকারী, চিত্রনায়িকা। নবজাতক উপন্যাসে বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়কে তিনি নিয়ে এসেছেন বিংশ শতকের বাঁকুড়া ও কলকাতায়। মনের মানুষ উপন্যাসে লালন ফকির হয়েছেন নায়ক।

রক্তে যেন কেউ প্রেমের বীজ বুনে দিয়েছিলো সুনীলের কৈশোরেই। জীবনে আসা প্রেমিকাদের কথা লিখেছেনও নানাভাবে। নীরা তো মিথ হয়ে আছে সুনীল সাহিত্যে। ‘কমপ্যানি অব উওমেন’ নামে জনপ্রিয় একটা উপন্যাস লিখেছিলেন খুশবন্ত সিংহ। সেখানে তিনি লিখেছিলেন তাঁর জীবনে নানা পর্বে আসা মহিলাদের কথা। সেই মহিলাদের প্রভাবের কথা। আবার সালমান রুশদি প্রকাশ্যে তাঁর প্রেমিকাদের নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান। সেই তুলনায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের কৈশোর আর যৌবনের দুটি মাত্র বিবাহপূর্ব প্রণয়ের উল্লেখ করেছেন নিজের লেখায়। প্রয়াণের বছর দশেক আগে একবার মার্কিন মুলুকের আনন্দবাজারেরই সাহিত্যমঞ্চে এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন যে, নিজের বিয়ের আগের কয়েকটি প্রেম নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন। কিন্তু বিয়ের পরের প্রেমিকাদের কথা খোলাখুলি লেখেননি। কবিতায়, কাহিনিতে সেই সব প্রেম আর প্রেমিকাদের কথা আভাসে আছে। তাঁর ফরাসি প্রেমিকা মার্গারেটের সঙ্গে তাঁর অপরূপ সম্পর্কের কথা তিনি নিজে অসংখ্য বার লিখেছেন বলে বিষয়টি নিয়ে বলার প্রয়োজন কম। সব মিলিয়ে মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করা সুনীল যাপন করে গেছেন একান্ত নিজস্ব জীবন, অন্যদের মতো কোনো আরোপিত জীবন নয়।আর তাই অকৃত্রি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালির মননে তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন স্বকীয়তায়৷ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন দীর্ঘদিন ধরে । আর তাই প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনটা অবশ্য প্রাপ্য বলেই নি:সংকোচে স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই আমার।
২৩ অক্টোবর ২০১২ তারিখে হৃদযন্ত্রজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০০৩ খ্রিস্টোব্দে ৪ এপ্রিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার ‘গণদর্পণ’কে সস্ত্রীক মরণোত্তর দেহ দান করে যান। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতে তাঁর দেহ দাহ করা হয়। পশ্চিম বঙ্গ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ২৫ অক্টোবর ২০১২ তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

(তথ্যসূত্র : দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ইন্টারনেট)

ছবি: গুগল

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ভাসানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকা