সুন্দরকে নিয়ে পথ চলতেই জন্মেছিলেন কবি

লুৎফুল কবির রনি

”হাতে রাখো বৈঠায় , লাঙলে , দেখো
আমার হাতে স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর । দেখো
মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে
লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস ।
আমাকে বিশ্বাস করো , আমি কোন আগন্তুক নই ।
দুপাশে ধানের ক্ষেত
সরুপথ
সামনে ধু ধু নদীর কিনার
আমার অস্তিত্বের গাথা। আমি এই উধাও নদীর
মুগ্ধ এক অবোধ বালক ।”

মাটির গভীরে শেকড়কে বুকে নিয়ে চলা , গ্রাম , প্রকৃতি আর অবিশ্রান্ত মুখর পদধ্বনির ভাস্বর জীবনের কথা লিখে গেছেন আহসান হাবিব ।

আহসান হাবীবের কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের তর্জমা। সামাজিক-রাষ্ট্রীক তথা মানবিক মূল্যবোধে তার কবিতা নানাভাবে অণুরিত হয়েছে। বাংলা কবিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণে-ভারতের এক উত্তাল সময়ে তার আবির্ভাব। ভারত তখন বিক্ষুব্ধ, ভাঙছে, মত ও পথ বদলাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্থিরতা, হতাশা ও আশা তখন কবিদের মজ্জা ও মননে। স্বপ্ন অনেকটাই তিরোহিত। রক্ত ও মৃত্যুর পথ ধরে ১৩৫০-এর মন্বন্তরের ভয়াল রূপ, জয়নুলের ক্ষুধাদীর্ণ মৃত্যু-আকীর্ণ ছবির টান-টান রেখা কবিদেরও মানসপটে। মহামারি, নৈতিক অবক্ষয়, অবিশ্বাস চারিদিকে। নজরুল বাকরহিত, রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত। আর ‘পঞ্চপাণ্ডব’ নামে খ্যাত কবিরা বাইরের বিশ্বের হাতছানিতে নিমগ্ন। অন্যদিকে ইসলামি মূল্যবোধের কবিতার ধারা। এ রকম একটি সময় বাংলা কবিতাকে আপনার ঘরে ফিরিয়ে আনলেন তিনি।

বাংলা কবিতা আবারো ফিরে পেল তার প্রাণ, তার গান, সুর, ঘরদোর, উঠোন, পুকুর, ঝিঁঝিপোকা, নদী, পাখি, নারী, বালক, রাখাল-সব।

কবি আহসান হাবীবের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি। জন্মস্থান ও পৈতৃক আবাস বরিশালের শঙ্করপাশা গ্রামে। বাবা হামিজ উদ্দিন হাওলাদার এবং মা জমিলা খাতুন পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ আহসান হাবীব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মৃদুভাষী, আত্মমগ্ন ও ভাবুক প্রকৃতির। নিসর্গের প্রতি তার ছিল প্রবল আকর্ষণ। শৈশবেই ভেতরে শেকড় গেড়েছিল কবিতার বীজ।

যৌবনে কলকাতায় মেসবাড়ির দুর্বিষহ জীবনের মধ্যে তিনি সময় বের করে নিভৃতে কাব্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। জীবনের ওই চরম মুহূর্তের মধ্যেও তিনি ফলিয়েছেন কবিতার সোনার ফসল। বাংলা কবিতার ভুবনে যুক্ত করেছেন এক হিরন্ময় অধ্যায়। আমাদের এই বাংলায় উত্তরাধুনিক যুগ আর পথ নির্মাণে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন কবি আহসান হাবীব।

প্রকৃতির নিবিড় সখ্য মানুষের দোলাচল দগ্ধ জীবনকে আহসান হাবীব কবিতায় তুলে এনেছেন আপন দক্ষতায়। সেখানে শিল্পসুষমা অকৃপণভাবে দান করতে ভোলেননি তিনি। তার কবিতা হতে পেরেছে তাই বাতাসের মতো বেগবান।

রাজনীতি আহসান হাবীবের কবিতায় সচেতন মানসভূমির উচ্চারণ হিসেবেই এসেছে। সেখানে শিল্পের দায়-দাবি পূরণে তিনি ছিলেন নিখুঁত যত্নশীল। কোনো ধরনের বাহুল্য, পক্ষপাতিত্ব, কূপমণ্ডূকতা সেখানে জায়গা পায়নি। মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং সৌন্দর্য চেতনা সেখানে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ওই প্রখরতায় উজ্জ্বল হয়ে সময়কে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন কবি আহসান হাবীব। এখানেই তিনি উজ্জ্বল আলোকিত ঝলমলে। জীবন ও প্রকৃতি একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আহসান হাবীবের কবিতায়। কদাকার জীবন ভাবনার শিল্পিত ভাষ্য হচ্ছে তার কবিতা।

আহসানে হাবীব বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশের প্রসঙ্গ অনুষঙ্গকে তার কবিতায় তুলে আনতে পেরেছেন চমৎকার কুশলতায়। সব রকম শোষণ-জুলুম, দুঃশাসন নির্যাতন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এসবকে দেখেছেন মানবিক ঔদার্য্য দিয়ে, অন্তরঙ্গ আলোকের নিভৃত ভূগোলে তিনি সময়ে ও অসময়ে মানুষকে জর্জরিত হতে দেখে ব্যথিত হয়েছেন, দুঃখের পংক্তিমালা সাজিয়েছেন।

বাংলা কবিতার ক্রমবিকাশের পথ ধরে তিরিশোত্তরকালের কবিতার ধারায় কবি আহসান হাবীব এক অনিবার্য নাম। পঞ্চাশের কাব্য আন্দোলনের উত্তর সাধক হিসাবে আধুনিক কবিতার উত্তরাধিকারের পথকে অনিবার্য করে তুলেছিলেন আহসান হাবীব। কবিতায় জীবন দর্শনের শিল্পরীতি, চৈতন্য জুড়ে তীব্র দহন, অস্তিত্বের সংকট, মধ্যবিত্ত জীবনের আকাংখার স্বরূপ নির্মাণে নিজস্ব শক্তিমত্তায় ঋদ্ধ করেছেন আহসান হাবীব।

কবি ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ এক মূল্যায়নে আহসান হাবীবের কবিতা নিয়ে বলেছেন- “আহসান হাবীবের কবিতাই আমাদের আধুনিকতা চর্চার প্রকৃত সোপান তৈরি করেছেন।’

আহসান হাবীবের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৮টি। অন্যান্য লেখাসহ সব মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা ২৫। এর মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ- ‘রাত্রি শেষ’ ১৯৪৭, ‘ছায়া হরিণ’ ১৯৬২, ‘সারা দুপুর’ ১৯৬৪, ‘আশায় বসতি’ ১৯৭৪, ‘দুই হাতে দুই আদিম পাথর’ (৮১), ‘প্রেমের কবিতা’ (৮২) ও ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’ (৮৫), কাব্যনুবাদ: ‘খসড়া’ ১৯৮৬, উপন্যাস: ‘অরণ্য নীলিমা’ ১৯৬২, শিশুসাহিত্য: ‘জোছনা রাতের গল্প’ ‘রাণী খালের সাঁকো, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ (৭৭), ‘ছুটির দিন দুপুরে’ (৭৮), অনুবাদ: ‘প্রবাল দ্বীপে তিন বন্ধু’ ‘অভিযাত্রী কলম্বাস’ (৫৯), ‘রত্নদ্বীপ’, ‘রাজা বাদশা হাজার মানুষ’, ‘এসো পথ চিনে নিই’ ‘ইন্দোনেশিয়া’ (৬৬), ‘ছোটদের পাকিস্তান’ ও ‘বোকা বোকাই’, সম্পাদিত গ্রন্থ : ‘বিদেশের সেরা গল্প’ ও ‘কাব্যলোক’ (৬৮)।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি সদ্য স্বাধীন পশ্চিম পাকিস্তানে একটি দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য পাতাকে অন্য একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। পরবর্তীতে বাংলা কবিতার অনেক প্রধান কবির বেড়ে ওঠা এই পত্রিকার হাত ধরে। আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুন সহ পরবর্তী অনেক কবির কবিতা এই পত্রিকায় ছাপা হতো। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সাহিত্যের আলাদা একটা কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছিল। সাহিত্য রচনায় তিনি বেছে নিয়েছেন দেশ, মাটি, মানুষ, নিসর্গ ও প্রেম৷ শৈশবে বেড়ে ওঠা জন্মগ্রাম শংকরপাশা আর পারিবারিক অর্থনৈতিক দূরবস্থার প্রভাব তাঁর সাহিত্যে ছাপ ফেলে৷ আহসান হাবীব সারাজীবনই পেশা হিসেবে পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন। বাংলার মাটি জল থেকে উঠে আসা এই কবি নিজেই ঘোষণা করেছেন ‘আমি কোন আগন্তুক নই’, বাংলা সাহিত্যে তাঁর আগমন স্বত:স্বাভাবিক এক ঘটনা।

এতটা যে মাটির , মানুষের খোদার কসম উধাও নদীর মুগ্ধ অবোধ বালক তুমি আমার , আমাদের ।তুমি বিরাজমান সর্বত্রই ।

কবির বিশ্রুত উক্তি:
‘এই মন আর এই মৃত্তিকায় বিচ্ছেদ নেই কভু’।

কবিমাত্রই স্বাপ্নিক। কাহলিল জিবরান আর গান্ধী যেমন স্বপ্নকে এক উচ্চতর বাস্তব (Higher reality) ভাবতেন, অথবা মার্কেজ যেমন স্বপ্নকে জীবনের ছোট অংশ বলে মনে করতেন, সে রকম নয়-স্বপ্ন জাগরণেই আহসান হাবীব বাস করতেন শাশ্বত বাংলার প্রতিটি অনুষঙ্গে: ‘আসমানের তারা সাক্ষী/সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই/ নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকী সাক্ষী/ সাক্ষী এই জারুল, জামরুল, সাক্ষী/ পুবের পুকুর, তার ঝাকড়া ডুমুরের ডালে স্থিরদৃষ্টি/মাছরাঙা আমাকে চেনে/আমি কোনো আগন্তুক নই।’ কবি এ-ও জানতেন, একদিন তিনি এই সুন্দর দেশে থাকবেন না। যদিও সেই নির্মমতাকে মেনে নিতে কষ্ট হয় কবির। কেননা: ‘শৈশবে এই পাথর খণ্ডে বসে/ আমি সূর্যাস্ত দেখতাম/ রাখাল এই পথে ফিরতো/ আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতো/ এই বিকেল আমার সঙ্গে যাবে না/ তবে কেন যাবো?/ কেন যাবো স্বদেশ ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে/ অন্ধকারে?/ প্রস্তুতি বড় কষ্টের।/ আমার কোন প্রস্তুতি নেই।/ প্রস্তুতি বড় কষ্টের/ আমার কোনো প্রস্তুতি নেই।’ প্রকট মৃত্যু চেতনাগন্ধী কবিতার মধ্য দিয়েই কবি চলে গেলেন। একেবারে প্রস্তুতিহীন ভাবেই, রেখে গেলেন কবিতার যে অমিত শস্যভাণ্ডার, তা আগলে রাখার দায়িত্বে তো আমাদেরই। আমরা, যারা কবিতাকে, দেশকে, মাকে ভালোবাসি।

আহসান হাবীবের সঙ্গে বিচ্ছেদ নেই বাঙলা কবিতারও।

উধাও নদীর মুগ্ধ এক অবোধ বালক তুমি আগ্ন্তুক নও,আমাদের বয়ে চলা জীবনের মুগ্ধ কথক।গতকাল ২ জানুয়ারী ছিলো এই কবির জন্মদিন।সময়ের কাছে পরাজিত না হয়ে সময়কে ধারণ করে , তার জটিলতা , সুন্দরকে বুকে নিয়ে পথ চলতেই কবি জন্মেছিলেন এই দিন । ভালোবাসায় বুকের কার্নিশে থাকবে ।

ছবি: গুগল