সুন্দরবনের ডাকে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

মনুষ্য সমাজে থাকতে থাকতে আর ইচ্ছে করছিলো না এখানে থাকিবার। ইচ্ছে হলো গোটা কয়েক বানর, বাঘ আর হরিণের মুখ দেখিবার।

২১ জনের টিমের সঙ্গে রওনা দিলাম সুন্দরবন। খুলনায় তখন জেলখানা ঘাটে জাহাজ ‘উৎসব’ আমাদের অপেক্ষায়। একদিকে শীতের ঠান্ডা হাওয়া, অন্যদিকে নদীর উত্তাল ঢেউ, সঙ্গে ভোর ভোর অন্ধকার। সবমিলে কেমন গা ছমছম ভয়। এই বুঝি চলে যাওয়া নদীর অতল দেশে।

৪০ জন মানুষের সবার লক্ষ্য নৌকার মাঝে বসা। যেন হরি পার করো আমারে। ঢেউয়ের স্রোত ঠেলে ঠেলে উঠলাম জাহাজে। ছোট্ট কেবিন। সঙ্গে এটাচড বাথ। এতো ছোট বেসিন জীবনে প্রথম দেখা।

জাহাজ যখন ছাড়লো একমুর্হতে ভালোবেসে ফেললাম নদী আর বনকে। ছোটবেলায় দুলে দুলে ভুগোল বইয়ে মুখস্ত করেছিলাম ম্যানগ্রোব বলা হয় সুন্দরবনকে। শ্বাসমুলে ভরা বন। সেই বন আজ আমার পাশে। হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি তাকে। বড় আপন মনে হয়। মনে হয় আমি যেন এই বনেরই কন্যা। নদীরই কন্যা।

এক জেলে আর জেলে বউকে দেখলাম নৌকায় হাড়ি পাতিলের সংসার। অপিকে বললাম লাফ দেই ? ভেসে যাই দূর বহুদূর। অপি বলে বেশীদূর যেতে পারবে না। একটু পরেই ঠান্ডায় বলবে ও বাবা ও মা জাহাজে ওঠি।

মনে মনে ভেবেছিলাম রোমান্টিক ভাবে অপি বলবে, না যেও না। দূর তাতো বললোই না উল্টো অন্য কথা বলা। কি আর করা। মনের দু:খে আপাতত বনের কাছেই যাই। হাঁটা দিলাম অন্যদিকে।

ততক্ষনে তিথি আর মিতা আপার চিৎকার শুশুক দেখেছে ওরা। যাক পানিবন্ধু আছে তাহলে। জাহাজ চলছে। আমাদের চোখ বন্ধ হচ্ছে না। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছি ওর অপার সৌন্দর্য। গোলপাতা যে গোল না, চিকন চিকন নারকেল পাতার মতো। তা প্রথম যখন ধরি অনুভব করি। সুন্দরী গাছ সত্যিই বড় সুন্দর। সূর্যের আলোর পরে তা হয় আরও সবুজ। গেওয়া, কেওড়া, গড়ান কতো যে গাছ।

বনের ভেতর দিয়ে হাঁটি আর ভাবি, থেকে যাব নাকি এই বনে। ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘর। পাশে হরিণ বানর ফল এনে দেবে। সাদা বক ছড়িয়ে দেবে ঘন পালক। কেটে যাবে অযুত নিযুত বছর। নৌকার ইঞ্জিনের ঘরঘর শব্দে ঘোর ভেঙ্গে যায়। তাকিয়ে দেখি নৌকা ভরা লাইফ জ্যাকেট । গরমে ঘামছে সবাই তবু লাইফ জ্যাকেট খোলা যাবে না। আমরাও পরেছি তবে যতটা না ভয়ে ততটা ফটোসেশনের জন্য।

ফেরদৌসি ভাই দুই মেয়ে আর শারমিন ভাবীর ছবি তুলছেন নানা ভাবে। দুলছে নৌকা। তাতে কি। হাসান ভাই সেলফি ষ্টিক দিয়ে ছবি তুলছেন বনের। খাড়িতে চলেছে নৌকা। হঠাৎ সবার চিৎকার হরিণ ! চিড়িয়াখানায় বন্দী হরিণ অনেক দেখেছি, এভাবে নদীর পাড়ে নিজের ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ানো হরিণ প্রথম দেখা। ঘাড় বাঁকিয়ে একটু অবাক হয়ে হরিনও দেখলো যেন আমাদের। ওর মায়াভরা চোখে বিস্ময়! ভাবছে এরা আবার কে? বলা হলোনা হরিণ ছানাকে, আমরা মনুষ্য জাতি। যারা নিজ স্বার্থে হানাহানি করি। নষ্ট করি বন। পানি খেতে যেয়ে লাফ দেয় হরিণ। আহা ওরা কি স্বাধীন। মানুষ যদি এমন স্বাধীন হতে পারতো। সবার মোবাইল তখন ক্লিক ক্লিক।

এরপর বানর। এ ডাল থেকে ও ডালে ঝুলছে। ছোট বানর, বড় বানর। আহা ছোটবেলায় আদর করে বাদর উপাধি কত যে জুটেছে কপালে! সেই বানর। আঁশ মেটে না। তোমাদের কাছেই তো আসা। কেওড়া গাছের মাথায় তখন চুপ করে বসে আছে চিল। উঁচু মগডালে ভুতুমপেচা। নীলরঙের পাখিটা কি যেন ভাবে। মনে মনে ভাবি কি কথা তাহার সঙ্গে। জামতলা বীচে তখন হাঁটা পথ। সারা বনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে উপড়ে পরা গাছ, নীল রঙের একপাটি স্যান্ডেল, চিমসে যাওয়া বল, মরচে পরা টিন, হাড়ি, জীবনের কতকিছু। আইলা, সিডরের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছে সুন্দরবন। ওর উপড়ে পরা গাছগুলো যেন বলছে মানুষ, তোমাদের জন্য ছিলো আমাদের আত্মাহুতি, তবুও তোমরা ভালো থেকো।

বীচে তখন সূর্য মামার উঁকি। পেলাম বাঘের ছাপ। বনরক্ষী কাশেম চাচা দেখালেন। এ ছাপ রাতের। বাঘমামার দেখা না পেয়ে তার ছাপের সঙ্গেই ছবি তুললাম। বাংলার বাঘ বলে কথা। শুনলাম গ্রুপে সবার শেষে যে থাকে তাকেই টার্গেট করেন তিনি। বনে যেয়ে শিখলাম দলছুট হতে হয়না। হাসতে হাসতে বনরক্ষক জানালেন তার বন্দুকে গুলি নেই। বাঘ এলে তিনিও আমাদের মতোই ভোঁদৌড় দিবেন।

বলে কি ! বলতে বলতে পেলাম বরই গাছ। আহা কি স্বাদ। গাছগুলো সব ছাতার মতোন। গাইড নির্ঝর জানালো এসব হরিণের কান্ড। ও লম্বা হয়ে পাতা খায়। এভাবে পাতা খেতে খেতে গাছগুলো সব সমান হয়ে যায়। কি অদ্ভুত প্রকৃতির কাজ। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। সারোয়ার ভাই, মন্নাফ ভাই, সুজন ভাই তখন ব্যস্ত বাচ্চাদের করমজলে কুমির দেখাতে। ডা. শায়লা ভাবীর ননদ ছবি তুলছেন সুন্দরী গাছের সঙ্গে।

আমার হাত থেকে বাঁধাকপি ছিনিয়ে নিয়ে গেলো এক বানর। এক মহিলার ব্যাগ নিয়ে চম্পট আরেক বানর। হতভম্ব তিনি। কোথায় পাবে তাকে এই ঘনবনে। ভালোলাগলো সবাইকে মাস্ক পরে থাকার নির্দেশনায়। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। আমাদের ফিরতে হবে ঢাকায়। শারমিন ভাবী নৌকার কিনারে বসলেন। বললেন প্রথমদিন নৌকায় ওঠে ভয় পেয়েছিলাম। আজ দেখেন কোনো ভয় ছাড়াই ধারে বসলাম।

নদীকে এখন আর ভয় লাগেনা। মনে মনে বললাম নদীর পরণে তো উড়ু উড়ু ঢেউয়ের নীল ঘাঘড়া, পায়ে তার নুপুর বাধা। ভয় কিসে!

মধ্যরাতে জাহাজের করিডোরে দাঁড়ালাম। সামনে হলুদাভ চাঁদ। আকাশ ভরা জোসনা, পানিতে রুপালী ছায়া, আমি যেন ভেসে চলছি রুপালি জলের সঙ্গে অন্তহীনপথে। বিশ্ব চরাচরে আর কেউ নেই যেন। শুধু ক্ষুদ্র আমি….। মিছে সব জীবনের কোলাহল।

বিস্ময়ভরে তাকিয়ে রইলাম অসহ্যরকম সেই সুন্দরের দিকে। অসাধারণ এক অনুভুতি। যা এ জীবনে আগে পাইনি কখনো। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখে পানি এলো।

সুন্দরবনের এ আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ ফ্লোরার সারোয়ারভাইসহ সবাইকে। ধন্যবাদ মহেন’দা ও জুয়েলভাইকে। খুলনার মানুষরা সত্যিই অনেক ভালো। তারা ভাগ্যবান তাদের একটা সুন্দর বন আছে, মন আছে।

ছবি: লেখক

 

 

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box