সুরের পথের ওই সুরেলা পঞ্চবটী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

গান গাইতে গিয়ে নিজের সাধনা ছাড়া গান নিয়ে হোমওয়ার্ক আমি খুব কমই করেছি।যে যেমন ডেকেছে আমি কর্মজীবির মতো গেয়ে দিয়েছি।যার জন্য লম্বা সময় ধরে ক্যাসেটের জগতে হারানো দিনের গান, নজরুল সংগীত লালনের গান পল্লীগীতি এবং কিছু লতাজীর হিন্দি গান গেয়েছি এবং তার পরপরই আমি ছবির গানে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি।এবং আমার স্বামী একজন মিউজিক ডিরেক্টর বলে অনেক মিউজিক ডিরেক্টরেরই ধারণা ছিলো আমি হয়তো আমার স্বামীর সুর ছাড়া আর কারো গান গাইবো না।আসলে তেমন ব্যাপার নয় মোটেও। যে-ই আমাকে ডেকেছেন আমি গেয়েছি।কিন্তু তারা ডাকতেনই কম।আমি ছবির গান ছাড়াও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী, আনোয়ার পারভেজ, দেবু ভট্টাচার্য, সুধীন দাস,আবদুল আহাদ, প্রনব ঘোষ, সুজেয় শ্যাম, শেখ সাদী খান, খোন্দকার নুরুল আলম, আনিসুর রহমান তনু, সাঈদ হোসেন সেন্টু, আবিদ হোসেন, মোস্তাক আহমেদ, সেলিম আশরাফ,বদরুল আলম বকুল, আলী আকবর রুপু এবং আরও অনেকের গানই গেয়েছি বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতারে।

 তো এক সময় আমাদের সেলিম আশরাফ ভাই ডাকলেন দুটি ক্যাসেটের গানের জন্য। তখনও আমরা অডিও এলবাম কে ক্যাসেট বলি।মিক্সড একটা দেশের গানের অ্যালবামে দুটো দেশের গান আমি গাইবো।সেখানে সাবিনা আপা, হাদি ভাই উনারাও আছেন। আমি গাইতে গেলাম দুই নম্বর শ্রুতি স্টুডিওতে।দুটো গানের একটি মোহাম্মদ মোজাক্কের ভাইয়ের লেখা। উনি খুবই দক্ষ গীতিকার। কি দারুণ সে গানের কথা! আমার গাঁয়ের পঞ্চবটীর তলায় রাখাল ছেলের তেমনি বাঁশি বাজে।গান তুলে দিলেন সেলিম ভাই।গান তুলতে গিয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো।যেমন সুর তেমন কথা। গানের মাঝখানে পুতুল খেলার দিন কখনো গাইতে গিয়ে তারার পা স্বর ছুঁয়ে আসতে হলো। আমার স্বামী একটু দ্বিধা করছিলেন।স্বল্পভাষী সেলিম ভাই আমার চোখে চোখ রেখে যেন হুকুম করছেন এমন ভাবে বললেন “কনক পারবে” ব্যাস,আমি দিব্বি গেয়ে আসলাম। গানটি খুব আবেগ দিয়ে গাইছিলাম। সেলিম ভাই বললেন কনক, গলায় আবেগ এনোনা। তীরের মতো তাক করে সুর লাগাও কিন্তু শিশুর সারল্য রাখো আর স্পষ্ট উচ্চারণ, যা তোমার গানের সবচেয়ে বড় সম্বল তা ঢেলে দাও!

সারাজীবন গাইতে গেলে মিষ্টি কন্ঠ মধুঝরা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মধুর দানা কত উপমা শুনেছি। ওস্তাদজী ডাকতেন টেপরেকর্ডার কিন্তু এই প্রথম সেলিম ভাই আমার উচ্চারণ নিয়ে এমন প্রশংসা করলেন। আমি ওনার আর্জি মতো উচ্চারণ, তীরের তীব্রতা এবং শিশুর সারল্য সব মিশিয়ে গাইলাম। এবার পরের গান।সঙ্গে সঙ্গেই তুলে দিলেন “ও মা তুমি বলোনা ওরা কেন শহীদ হলো ” এটা তুলে নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াবো, উনি আবার কাছে এলেন। বললেন এই গানটিও একটি কিশোরীর। কিন্তু তুমি গাইবে সেই কিশোরীর কণ্ঠে যে মায়ের দুঃখে কষ্টে ভাইদের শহীদ হওয়ার দুঃখ সয়ে কিশোরী বয়সেই অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তরুণী হয়ে উঠছে।কন্ঠে আবেগ মিশ্রিত অভিমান, একদম পরিনত অভিমান থাকবে।মায়ের না বলা গল্প জানার আগ্রহ থাকবে।গলার কাছে দলাপাকানো অভিমান থাকবে। আমার স্বামী আবার বললেন এতো কিছু একসঙ্গে কিভাবে! উনি আবার আমার চোখে তাকিয়ে বললেন কনক একজন নারী। ও এই দুঃখ কণ্ঠে আনতে পারবে।কনক পারে! আমি আবারও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালাম। এবার আমার গলার কাছে দুঃখ পাকিয়ে ফেনিয়ে উঠলো। আমি এক দমে এক কাটে গেয়ে রেকর্ডিং প্যানেলে এসে দাড়িয়ে কেঁদে ফেললাম। সেলিম ভাই বললেন কনক, আমি যা চেয়েছি তুমি তার চেয়ে দুইশো পার্সেন্ট বেশি দিয়েছো।তোমার পেমেন্ট আমি বাড়িয়ে দেবো।আমি বললাম আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।আমি বাড়তি পেমেন্ট নেবোনা। আপনি দোয়া করে দেন।

এই হলেন আমাদের সেলিম আশরাফ ভাই।জীবনে অনেক বেশি গান সুর করেননি কিন্তু যা করেছেন সব গানই অপূর্ব সুরেলা ছিলো। ওনার সুরে যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে গানটি বাংলাদেশের অথবা সারা পৃথিবীর দেশের গানগুলোর সেরা গান গুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা একটি গান।অথচ উনি খুব একটা সুর করতেন না। ক্যাসেটের একটা যুগ ছিলো। কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে ক্যাসেট কোম্পানির মালিকরা ঈদে পুজায় সে লগ্নিকৃত মুলধন তুলে অনেক টাকার ব্যাবসা করতেন। একমাত্র প্রনব ঘোষ ছাড়া আলাউদ্দিন আলী, সেলিম আশরাফ, শেখ সাদী খান, মইনুল ইসলাম খান উনারা যদি নিয়মিত গান সুর করায় মনোযোগ দিতেন তাহলে কিন্তু অদরকারী সুরকার এই জগতে ফালতু গান তৈরির সুযোগ পেতোনা।সেই হিসেবে আমি আমার স্বামী এবং সেলিম ভাইকে খুব রাগ করে দোষ দিয়ে বলতাম আপনাদের অলসতা উদাসীনতা আমাদের গানের জগতের কত ক্ষতি করলো জানেন? অনেকবার অনেক রকম উদ্দোগ নিয়েছি।কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি।সেলিম ভাই, মইনুল ইসলাম সাহেব ওনারা গানের কথায় খুবই চুজি ছিলেন, ছিলেন অভিমানিও।তাঁদের এক সময় মনে হলো তাদের গান কেউ শুনবে না এবং এভাবেই তারা সবার অলক্ষ্যে গানের জগত থেকে সরে এলেন সেই সময় যখন গানের জগত কি না হয়ে গেলো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি!

আমাদের গানের জগতের বাঘা বাঘা মিউজিক ডিরেক্টর, কণ্ঠশিল্পীর সাথে আমরা স্বল্পভাষী, নিভৃতচারী,মেলোডি সুরকার সেলিম আশরাফ ভাই কে আমরা হারালাম।অনেক দিনই তিনি অসুস্থ ছিলেন। সব অসুস্থতার অবসান হলো শেষমেষ!

আল্লাহ ওনাকে বেহেশত নসীব করুক। আমীন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]