সেইসব দিন আহা!

পারভেজ আহমেদ

জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন সপ্তাহে একদিন বাংলা সিনেমা দেখার জন্য ঘর ভর্তি মানুষ সাদা কালো টিভির সামনে বসে থাকতাম। সিনেমা শুরু হবার অনেক আগে আবহাওয়ার খবর দেখা, বৌদ্ধদের ত্রিপিটক পাঠ শোনা; সবই সিনেমা দেখার অংশ ছিলো। সিনেমা চলাকালীন সময় বিজ্ঞাপন এলে আমরা আঙুল দিয়ে নামতার মত করে বিজ্ঞাপণ গুনতাম। ত্রিশটা বিজ্ঞাপণ দেখানোর পরই সিনেমা শুরু হয় এই ব্যাপারটা ততদিনে আমরা আবিষ্কার করে ফেলেছি। যেদিন ভুল করে দুপুরে ঘুমিয়ে যেতাম, খুব মন খারাপ হতো। দুপূরে ঘুমানোর মানেই হল বিকেলের খেলার টাইম মিস করে ফেলা। আমরা সারাদিন বিকেল সময়টার জন্য অপেক্ষা করতাম, শীতের সময় মাগরীবের আযান বিকেল সাড়ে ৫ টায় দিয়ে দিলে কান্না কান্না মুখ করে ঘরে ফিরতাম। ঘরে ফেরা মানেই পাটিগণিতের বই নিয়ে বসা। চৌবাচ্চার অংকটা জীবনটাকে প্রায়শই অতিষ্ট করে ফেলতো। অংক মেলাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পেন্সিলের উল্টো দিকের রাবারের অংশ কামড়ে খেয়ে ফেলতাম। রোজ সন্ধ্যায় পড়ার সময়টাতে একবার লোডশেডিং হতো।

সঙ্গে সঙ্গেই যে যেখানে থাকুক না কেন একসঙ্গে একটা বিকট চিৎকার করে রাস্তায় জড়ো হতাম। শুধু একটা সময় লোডশেডিং হলে আমাদের কষ্ট হত যখন আলিফ লায়লা দেখাতো। সেই সময় কিছু শৌখিন বড়লোক ছিল যাদের বাসায় ব্যাটারি ওয়ালা টিভি থাকতো। অর্থাৎ কারেন্ট চলে যাবার পরেও টিভি চলবে। আমরা দল বেধে সেই বাসায় হানা দিতাম। জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন মনমালিন্য হলে আমরা কাইন আঙুলে আড়ি নিতাম, দু’দিন কথা বলতাম না। তারপর আবার আনুষ্ঠানিক ভাবে দুই আঙুলে ‘ ভাব’ নিতাম; এখন থেকে আবার কথা বলা যাবে। সেই সময় সব মেয়েরা একটা পুতুল কিনত, যেটার সুইচ অন করলেই শাহরুখ খানের ‘ ছাইয়া ছাইয়া’ গানটা বাজতো আর ছেলেদের সব থেকে দামী খেলনা ছিল রবোকোপ, যেটা চালু করতে আটটা পেন্সিল ব্যাটারি লাগতো। জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন ক্লাস রুমে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, এখন যদি ফ্যানটা খুলে পড়ে তাহলে সেটা কার মাথায় পড়বে ? অনেক পরে জেনেছি, এই জিনিস শুধু আমি না, প্রায় সবাই একই জিনিস ভাবতো ! আমাদের সময় একটা নিয়ম প্রচলিত ছিল, যার ব্যাট সে সব সময় আগে ব্যাটিং করবে। আমাদের টস মানেই হল আগে ব্যাটিং, টসে জেতার পর কাউকে কোনদিন ফিল্ডিং নিতে দেখিনি। রোজ বিকেলে কটকটি ওয়ালা আসতো।

মজার ব্যাপার হলো কটকটি কিনতে কোন টাকা পয়সার দরকার হতো না। পুরনো কাগজ, প্লাস্টিকের কিছু একটা দিলেই কটকটি পাওয়া যেতো। আমরা এক টাকা দিয়ে নারকেল আইসক্রিম খেতাম; কত মার খেয়েছিলাম এই কিশমিশ মেশানো নারকেল আইসক্রিমের জন্য, ঠিক যেন চোখের সামনে ভাসে ! আমাদের সময় সব চাইতে সুন্দর জুতা ছিল লাইট ওয়ালা কেডস জুতা। হাঁটলেই জুতা থেকে লাইট জ্বলত। অন্ধকারে সেটা পায়ে দিয়ে বের হলে দুনিয়া শুদ্ধ মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে ভিমড়ি খেতো। পড়ার বইএর ভেতরে থাকতো চাচা চৌধুরী। চাচা চৌধুরীর বুদ্ধি ছিল কম্পিউটারের থেকেও প্রখর। জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন আমরা রাজা কনডমকে বেলুন বানিয়ে খেলতাম। সব চাইতে বড় অপারেশন ছিল চটপটি খেয়ে টাকা না দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ! স্ট্যাম্প জমাতাম, রানী এলিজাবেথ ছিল সব চেয়ে দামী স্ট্যাম্প, পাঁচ টাকা। ঈদের এক সপ্তাহ আগে ঈদ কার্ড বিক্রি করতাম। সেই সময় সব চাইতে দামী জরিওয়ালা ঈদ কার্ড যেটা ছিল সেটা খুললে ভেতর থেকে অবিশ্বাস্য ভাবে মিউজিক বাজতো! সেই দিন গুলোতে আমরা পেন্সিলের শার্পনার হারিয়ে কাঁদতাম ! আমাদের দুঃখগুলো তখন আমাদের মতই শিশু ছিলো। আমাদের কোন প্রেমিকা না থাকলেও একটা কেউ ছিলো। যার সামনে দাড়ালে আমাদের বুক ধুপ ধুপ করে উঠতো। দরজা বন্ধ করে ড্রয়িং খাতায় তাকে আঁকতাম। কপালের টিপ মাঝখান বরাবর না বসলে রাবার দিয়ে মুছে আবার আঁকতাম। সেদিন আর পড়ায় মন বসতোনা ! কী সব সোনালী দিন ছিল… আহা !”

ছবি: লেখক