সেই চমকে ওঠা শহরে…

ইরাজ আহমেদ

ছোটবেলা এই শহরে কত কিছুতেই চমকে যেতাম।এই শহরে চমকিত,শিহরিত হওয়ার কত গল্প যে বাক্সবন্দী হয়ে থাকলো তার ইয়ত্তা নেই। এখন এই ঢাকা শহরে বিশালাকৃতির বাড়ি উঠেছে, তৈরী হয়েছে আধুনিক ফ্লাইওভার, সবুজ নিধন করে আমরা রাস্তা তৈরী করেছি কিন্তু তেমন করে চমকে দিতে আর কোনো কিছু ঘটে না। শিশুরাও মনে হয় আর কোনো কিছুতেই চমকিত হয় না। বিস্ময় তাদের মন থেকে বিদায় করে দিয়েছে প্রযুক্তি।

সেই কোনকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের আস্তাবলে বিশাল আকৃতির তেজী ঘোড়া দেখে শিহরিত হয়েছিলাম। তখন পুলিশ লাইনের মাঠ আর বিশাল দীঘির আশপাশের এলাকা ছিলো বহু মানুষের বৈকালিক ভ্রমণের জায়গা। সেখানেই আস্তাবলে দাঁড়িয়ে থাকতো পুলিশের দৈত্যাকৃতি ঘোড়াগুলো। মাঝে মাঝে পা ঠুকতো, সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলতো। হাওয়ায় ভেসে থাকতো ভুসি, খৈল, ঘাস আর ঘোড়ার শরীরের গন্ধ। আস্তাবলের সামনে গিয়ে চোখ বন্ধ করলে শেরউডের জঙ্গলে ঘোড়ার পিঠে রবিনহুডের ছুটে চলার দৃশ্য ভেসে উঠতো। মনের মধ্যে পলকে তৈরী হয়ে যেতো কতো গল্প।

এই শহর আমাকে ভীষণ ভাবে চমকে দেয় ১৯৭০ সালে। সে বছর ঢাকায় প্রদর্শনীর জন্য নিয়ে নিয়ে আসা হয় চাঁদের একখণ্ড পাথর। আগের বছর মানুষ চাঁদে গেছে।পৃথিবীর মানুষের জন্য নিয়ে এসেছে চাঁদের পাথর আর মাটি।সেই পাথরের একটুকরো প্রদর্শনীর জন্য আনা হয় ঢাকায়। কাকরাইলে তখনকার শিল্পকলা একাডেমীর একটি গোলাকৃতি প্রদর্শনী কক্ষে পাথরটি রাখা হয়েছিলো।কাচের জারে রাখা ছাই রঙের সেই পাথর দেখে বিস্ময়ে কেঁপে উঠেছিলাম। বাবার মুখে এইচ.জি ওয়েলসের উপন্যাস ‘ফার্স্ট ম্যান ইন দ্য মুন’-এর গল্প শুনেছিলাম। নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে সেই ছোট পাথরটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল সেই কাহিনির কথা।

তখন ঢাকায় তৈরী হচ্ছিল ফকিরের পুলের বিশাল পানির ট্যাংকটা। থাকতাম নয়া পল্টন বলে একটা জায়গায়। তখনও ফকিরের পুলের বড় রাস্তাটা তৈরী হয়নি। একটা সরু পথ ছিলো মাটি আর ইঁট বিছানো। একতলা বাড়ির জানালা দিয়ে সেই ট্যাংক নির্মাণের যজ্ঞ দেখা যেতো। আমি দুপুরবেলা জানালায় দাঁড়িয়ে সেই বিশাল বিশাল উর্ধমুখী লোহার পাইপ বসানো দেখতাম। গুনতাম কয়টা পাইপ বসানো হলো। একটা সময়ে সেই পাইপগুলো আমার মনের মধ্যে চলতে থাকা কাল্পনিক গল্পের প্রক্রিয়ার দৈত্য চরিত্র হয়ে গেলো। বিস্মিত হয়ে দেখলাম একদিন পাইপের মাথায় জল সংরক্ষণের আধারটাও বসানো হয়ে গেলো। তখন ঈদের সময় সেই ট্যাংকের গোড়ায় মেলা বসতো। মাটির তৈরী পুতুল, হাঁস, মুরগি, একতারা হাতে দাঁড়িওয়ালা বুড়ো বাউলের মূর্তি কিনতে যেতাম। তখন ওই পানির ট্যাংকটাও ছিলো দেখার মতো একটা বিষয়। ঘুরে ঘুরে অবাক হয়ে দেখতাম সেই লোহার স্থাপনা।

এমনি আমাকে চমকে দিয়েছিলো মতিঝিলে সম্ভবত আটতলা আমিন কোর্ট ভবনের ছাদে ছোট্ট রেস্তোরাঁটি। এখন সেই রেস্তোরাঁর অস্তিত্ব আর নেই। বাবার হাত ধরে কখনো যেতাম ওখানে। মতিঝিল তখন এত বড় বড় ভবন নিয়ে আকাশকে ছুঁতে চায়নি। তখন ওই আট তলাকেই মনে হতো বিশাল উঁচু এক ভবন। ছাদের ওপর থেকে ছড়িয়ে থাকা শান্ত মতিঝিল, পেছন দিকে কমলাপুর রেল স্টেশনের ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা শূন্য বগি দেখতাম ভীষণ কৌতুহল নিয়ে।

সময়টা সত্তরের দশকের শেষভাগ। সম্ভবত ১৯৭৮ সাল। জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানর হাইজ্যাক করে সেখানকার মার্কসবাদী গেরিলা গ্রুপ ‘রেড আর্মি’। সেই বিপ্লবীরা প্লেনটি নিয়ে নেমেছিলো ঢাকা বিমান বন্দরে। সাংবাদিক পিতার সঙ্গে ছিনতাই করা সেই বিমান খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো। অজানা এক ভয় নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম প্লেনটা। বিমান বন্দরের কমিউনিকেশন টাওয়ারে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবা। রানওয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি নিঃসঙ্গ বিমান। বেশ অনেক দূরে অবস্থান নেয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। একসময় হঠাৎ সেই প্লেনের দরজা খুলে এসে দাঁড়িয়েছিলো অস্ত্রধারী এক গেরিলা। যতদূর মনে পড়ে তার মুখ কালো মুখোশে ঢাকা ছিলো। বিস্ময়ে শিহরণ জেগেছিলো। বিদেশী পত্রিকার কল্যাণে তখন ইয়াসির আরাফাতের সংগঠন পি.এল.ও-এর বিমান ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলাম। সেদিন স্বচক্ষে এক ছিনতাইকারীকে দেখে চমকিত হয়েছিলাম ভীষণ।

সেই এক শহর কত যে ছোট ছোট বিষয়ে চমকে দিতো। বিস্মিত করতো। স্মৃতির খাতায় রয়ে গেলো সেইসব চমকিত হবার গল্প।