সেই চায়ের দোকান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শহরের উস্কোখুস্কো ফুটপাত, ছিটকে ছড়িয়ে যাওয়া ভিড়, গাঁজার নেশার মতো ঝিমধরা দুপুরের কোনো গলি অথবা নিঃসঙ্গতার পোস্টার সাঁটানো রাত্রির বাড়তে থাকা শরীরে হেলান দিয়ে ঘুমায় না চায়ের দোকান। চায়ের দোকানের লাল চোখ তাকিয়ে থাকে, কেতলির মন পুড়ে যায়, চায়ের কাপ কী ভেবে হিজিবিজি ধোঁয়া ছড়ায় আকাশে। জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেনের মুখোমুখি বসতে চেয়েছিলেন। আমরা বহু যুগ ধরে চায়ের দোকানের মুখোমুখি । কত গল্পের ফুলঝুড়ি চায়ের দোকানে। আড্ডার তুমুল ঝড়ে প্রায় উড়ে যাওয়া ছোট্ট চায়ের দোকান কত কথা জানে বাঙালির! কত সময়ের রেখাপাত, প্রতিক্রিয়া, ঝগড়া আর তীব্র অপেক্ষার সাক্ষী এমন কত দোকান। আমাদের আদরের ডাক-টঙ দোকান। অভিধান জানাচ্ছে, টঙ মানে উঁচুতে বাঁধা মাচা যেখানে আশ্রয় নেয় মানুষ। এই মাচা শব্দটাই একটা সময়ে চায়ের দোকানের আয়োজন বোঝাতে ব্যবহৃত হলো। সবাই তাকে ডাকলো টঙ বলে।

চারটা নড়বড়ে কাঠের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা টঙ। সামনে কখনো সরু কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি বেঞ্চ। সেখানেই ছুটির দিনে পত্রিকা পড়া, দাবা খেলার বোর্ড পাতা, কবিদের তুমুল হৈ হল্লা, কত সক্রেটিসের জন্ম এবং মৃত্যু, উঁচু গলায় তর্ক আর জল্পনার ফানুস ওড়ানো।

এই শহরে টঙের সংখ্যা কতো কেউ আঙুল গুনে বলতে পারবে? কখনোই সম্ভব নয়। শহর থেকে মফস্বল, মফস্বল থেকে গ্রাম-টঙ আছেই। সেসব টঙ নিয়ে জন্ম নিয়েছে, নিচ্ছে কত গল্প। রাস্তার মোড় আকড়ে ধরা এরকম দোকান নিয়ে বাঙালির অনেক আবেগ, অনেক ভালোবাসা। আসলে এসব দোকান তো এক ধরণের আশ্রয়ও। 

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘সেই চায়ের দোকান’। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আশির দশকের গোড়া থেকেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলো হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকান। লাইব্রেরী ভবনের পাশে বড় একটা মাঠ। মাঠের ওপাশে বড় রাস্তা। মাঠের লোহার রেলিং ঘেরাওয়ের গা ঘেঁষে হাকিম নামে মানুষটার ছোট্ট চায়ের আয়োজন।কাচের বোয়ামে কয়েকটি বিশুষ্ক বিস্কুট, কখনো ছোট পাউরুটি,সারাদিন ওই মাঠের নিয়মিত আড্ডাধারীদের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছিলো ওই একরত্তি চায়ের দোকান।সেই দোকানে রাগি তরুণরা কখনো লুকিয়ে রাখতো অবৈধ পিস্তল, প্রেমিক বা প্রেমিকা রেখে যেত চিরকুটে লেখা ক্ষুদে বার্তা, হাকিম ভাই মনে রাখতেন সারাদিন কে কোথায় থাকবে সে খবরও। তখন কোথাও কোথাও চায়ের দোকান এরকম পোস্ট অফিস হয়ে থাকতো। কত বার্তা চালাচালি হতো চায়ের দোকানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একবার হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকান উচ্ছেদ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সমেবেত ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো। তাদের ঝোড়ো সেই প্রতিবাদে আটকে গিয়েছিলো উচ্ছেদ অভিযান। পরে ওই মাঠটার নামই হয়েছে হাকিম চত্বর।

শিক্ষাবিদ হাফিজ জি এ সিদ্দিকী ‘ঢাকা যেভাবে চা পানে আসক্ত হলো’ নিবন্ধে লিখেছেন, ব্রিটিশ কোম্পানির কর্মকর্তা খুরশিদ আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঢাকাবাসীকে বিনা মূল্যে চা খাওয়ানোর। সহযোগীদের নিয়ে তিনি তৎকালীন ঢাকার সূত্রাপুর, কোতোয়ালি ও লালবাগ থানায় চায়ের প্রচারসংক্রান্ত কাজগুলো তত্ত্বাবধান করতেন। তাদের নিয়োগকৃত ‘চা-ওয়ালা’ বিকেলবেলায় নিয়মিতভাবে রাস্তার ধারে চা তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে বসতেন। পরিবারের সবার জন্য চা সংগ্রহ করতে অনেকেই চাওয়ালার কাছে পাত্র নিয়ে যেতেন। একবার চা পানের আসক্তি হয়ে গেলে ঢাকাইয়ারা এর অভাব বোধ করবে, ব্রিটিশদের এ ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলো যখন বিনা মূল্যে চা পরিবেশনের কার্যক্রমটি প্রত্যাহার করা হয়।

ফুলবাড়িয়ার মোড় থেকে  সদরঘাট পর্যন্ত চায়ের প্রচারণা শুরু করেছিলো ব্রিটিশরা। মাটির পাত্রে ঢেলে তখন গরম চা বিতরণ করা হতো। ঘোড়ার গাড়ি, ঠেলাগাড়িকে সাজিয়ে এবং ব্যান্ড বাজিয়ে তারা জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। শুরুর দিকে তেমন সাড়া পায়নি। পরে চায়ের কাপে মনযোগ টানার জন্য যখন পেন্সিল, ক্যালেন্ডারের মতো ছোট ছোট উপহার দেয়া শুরু হলো মানুষের ভিড় বাড়লো। তখনই বিনা পয়সার চা বিক্রি হতে শুরু করলো। দুধের দোকানগুলো পরিণত হলো চায়ের দোকানে।

ঢাকার পুরনো অংশে এরকম টঙ দোকান বরাবরই জনপ্রিয়।বহু দোকান এরকম সারা রাত আলো জ্বালিয়ে বসে থাকে নির্দিষ্ট আসক্তদের জন্য।একদা টিপু সুলতান রোডে এক চায়ের দোকানে আফিম মিশ্রিত চা বিক্রি হতো। সেই দোকানে চা পানে আগ্রহীদের ভিড় লেগে থাকতো সকাল থেকে।কারো লেবু চা জনপ্রিয় কারো আবার গরুর দুধের চা। গলির পর গলি এই শহরে। গলির প্রশ্রয়ে থাকা চায়ের দোকানে বৃদ্ধ থেকে তরুণ কে না আসে সেখানে। একটা সময় ছিলো যখন শহরের সব পাড়ায় চায়ের দোকানীর কাছে জমা হতো রাজ্যের যত গল্প। কার সঙ্গে কে প্রেম করছে, কে বাড়ি ফিরে বউকে পেটায়, কার চাকরি গেছে, কে টাকা ধার করে শোধ করতে পারছে না এমন সব কাহিনিতে ফুলে উঠতো চায়ের দোকানে গল্পের পালা। ভেসে চলতো কথার নৌকা।

এই টঙ দোকানের যুগ বোধ হয় কখনো শেষ হয় না।একজন দোকানী চায়ে দুধ আর চিনি মিশিয়ে তাতে চামচ নাড়তে নাড়তে কাটিয়ে দেয় বহু বছর। কত নাম তাদের, কখনো মামা, কখনো ভাই, কখনো শুধু একটি নাম, চায়ের দোকান অমরতা পায় তার হাতে বানানো চায়ে।একদা স্টেডিয়াম পাড়ায় পথের ধারে বিহারির দোকানের চা আবার পুরনা পল্টনের গলিতে হাউজ বিল্ডিং ভবনের গেটে রহমত ভাই। এই চায়ের দোকানই আবার চেহারা পাল্টায় নিউমার্কেটের বারান্দায়। ঠিক টঙের চরিত্র না পেয়েও সেই দোকান এক ধরণের টঙ-ই। চায়ের দোকানের চরিত্র পাল্টায় তার খদ্দেরদের ওপর ভিত্তি করে। বলাকা সিনেমা হলের দোরগোড়ায় চায়ের দোকানের চরিত্র আর শাহবাগ মোড়ে পিজি হাসপাতালের গেট লাগোয়া চায়ের দোকানের চরিত্র আবার আলাদা। ভিন্ন সেখানে চা পান করতে আসা মানুষগুলোও।রেলস্টেশনে চায়ের দোকানের নাম ছিলো একদা ‘টি স্টল’। পাশেই কোনো বইয়ের দোকান। চা খেতে খেতে কেউ বই ঘাটছে। কেউ সাইকেল ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে গল্প জুড়েছে; ছবির পর ছবি চায়ের দোকান ঘিরে।চায়ের কাপগুলো যেন কোনো ‍সিনেমার নির্বাক চরিত্র।

ছুটির দিনের আলস্যে অথবা খুব একটা কেজো দিনের ভিড়ের মধ্যেও সক্রিয় থাকে চায়ের দোকান। কেউ পত্রিকা পড়ে সকালের রোদে বসে, কেউ শুধু বসে থাকে, কেউ আবার একা একা কথা বলে চলে। কখনো কোনো শীতরাতে আলস্যে আড়মোড়া ভাঙে চায়ের দোকানের আলো। গুটিশুটি মেরে ঘুমায় চেনা কুকুর।খুব বৃষ্টির দিনে চায়ের টঙ একলাই পড়ে থাকে তার সারাদিনের বহু গল্প নিয়ে। ছাতা মাথায় কেউ হেঁটে হেঁটে চলে যায় দোকানের সামনে দিয়ে।হয়তো সেদিন তার জন্য দোকানের সামনে অপেক্ষায় নেই সেই ছেলেটি। বৃষ্টির ছাটে জড়োসড়ো মেয়েটি কি তাকায় দোকানের আলোর দিকে? গলিতে পানি জমে, আকাশ চমকায়, চায়ের দোকানের গল্প নিভে আসে একটু একটু করে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box