সেই ভ্যাকসিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কোভিড১৯ রোগের ভ্যাকসিনের জন্য আজ গোটা পৃথিবীর মানুষ উন্মুখ। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার চেয়েও এই প্রতিষেধকের জন্য মানুষের অপেক্ষা আরও তীব্র। সবার এখন একটাই প্রশ্ন, কবে আসবে ভ্যাকসিন, কবে বিদায় করা যাবে এই কালান্তক কোভিড১৯ ব্যধিকে?

পৃথিবীজুড়ে এরকম বহু অসুখের নিদান চেয়ে আমরা দ্বারস্থ হয়েছি বিজ্ঞানের। বিজ্ঞানী আর চিকিৎসকরা এগিয়ে এসেছেন, আর্ত মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। রোগের বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই নিরন্তর। বিজ্ঞানের এই প্রচেষ্টার পথ কিন্তু মসৃণ ছিলো না। বিজ্ঞানী আর চিকিৎসকদের বহু ধরণের বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। জয় করতে হয়েছে বহু প্রতিকূলতা।

এমনি এক লড়াই ছিলো পৃথিবীতে বসন্ত রোগের ভ্যাকসিন নিয়ে। পৃথিবীতে এক সময় মানুষ বসন্ত রোগের নতুন আবিষ্কৃত টিকা নিতে চায়নি।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো বসন্ত রোগের টিকার ব্যবহার নিয়ে ডাক্তার এডায়ার্ড জেনারের যুদ্ধের কথা, ‘সেই ভ্যাকসিন…’

এডওয়ার্ড জেনার

ভাবতে অবাক লাগে, পৃথিবীতে প্রথম ভ্যাকসিন আসার দিন দৃশ্যপটটা ছিলো একেবারে উল্টো। ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার তাঁর তৈরি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও, লন্ডন শহরে দরজায় দরজায় ঘুরে প্রথমে কাউকে রাজি করাতে পারেননি ভ্যাকসিনটি নিতে। একে গ্রামের একজন অখ্যাত ডাক্তারের তৈরি ভ্যাকসিন, তারপর সেটির উৎস গরুর শরীরের বসন্তের পুঁজ! ভয়ঙ্কর অসুখের প্রতিবিধান পাওয়া গেছে সামান্য গোয়ালিনিদের গল্পকথার মধ্যে এই বিষয়টা তখনকার ইংল্যান্ডবাসী মেনে নিতে পারেনি। বিতৃষ্ণা, তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো সবাই। আর ঠিক তখনই এই টিকার প্রচারে ডাক্তার জেনারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রোম্যান্টিক যুগের কয়েকজন কবি!

প্রাচীনকালে পৃথিবীর দেশে দেশে গুটিবসন্ত ছিলো বিভীষিকার নাম। অ্যাজ়টেক আর ইনকা সভ্যতা প্রায় মুছেই গিয়েছিলো গুটিবসন্তের তাণ্ডবে। মধ্যযুগে ইউরোপে যখন-তখন মহামারির আকার নিতো এই রোগ। প্রাণে যারা বেঁচে যেত, সেই সব রোগীর মুখে আর শরীরে থেকে যেত কুৎসিত স্মৃতিচিহ্ন। আঠারো শতকে ইংল্যান্ডে গুটিবসন্তকে নাম দেয়া হয়েছিলো ‘দাগি দৈত্য’ অর্থাৎ ‘স্পেকল্‌ড মনস্টার’। যে রোগে রোগীর মুখে অমন কুৎসিত দাগ থেকে যায়, সে রোগের নিজের মুখেও ভয়ঙ্কর দাগ থাকবে, এমনটাই কল্পনা করে নিয়েছিলো মানুষ। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষের দৃষ্টিশক্তিও চলে যেত। ১৬১৬ সালে কবি ও নাট্যকার বেন জনসন ‘অ্যান এপিস্‌ল টু স্মলপক্স’ কবিতায় গুটিবসন্তকে ‘হিংসুটে জঘন্য অসুখ’ বলে সম্বোধন করে প্রশ্ন রেখেছিলেন: “কোনও কালে একজন সুন্দরীও কি তোমার হাত থেকে রেহাই পাবে না?”

পাশ্চাত্যে প্রথম অটোমান সাম্রাজ্য থেকে এসেছিলো গুটিবসন্ত প্রতিরোধের পদ্ধতি ‘ইনোকিউলেশন’। আক্রান্ত মানুষের গুটিবসন্তের গুটি থেকে রস নিয়ে সুস্থ মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হতো, তার ফলে অনেক সময়ই প্রথম জনের থেকে দ্বিতীয় জনের শরীরে সিফিলিস বা যক্ষ্মার মতো মারাত্নক অসুখও সংক্রমিত হতো। ১৭৫৭ সালে ওই পদ্ধতিতেই ইংল্যান্ডে কয়েক হাজার শিশুকে টিকা দেয়া হয়। তার মধ্যে ছিলো গ্লস্টারশায়ারের এক গ্রামের আট বছরের একটি শিশুও। বড় হয়ে সেই শিশু ডাক্তারি পড়ে গ্রামের মানুষের সেবায় নিজেকে সঁপে দিল। ডাক্তার হয়ে ওঠেন এডওয়ার্ড জেনার।

জেনার এক বার গ্রামের গোয়ালিনিদের মুখে শুনলেন, তাদের একবার গো-বসন্ত হয়ে গেলে আর গুটিবসন্ত হয় না। গো-বসন্ত রোগটা ছিলো নিতান্তই নিরীহ। জেনার তখন ভাবলেন, গো-বসন্ত থেকে গুটিবসন্তরোধী টিকা তৈরি করা গেলে মানুষের কাজে লাগবে।  ১৭৯৬ সালের মে মাসে জেনার এক গোয়ালিনির শরীরে গো-বসন্তের ক্ষত থেকে রস সংগ্রহ করে প্রয়োগ করলেন তাঁর বাগানের মালির আট বছর বয়সি একটি ছেলের ওপর। জ্বর, মাথাধরার মতো কিছু অসুস্থতার পর সে সুস্থ হয়ে ওঠে। তার কিছু দিন পর তার শরীরে গুটিবসন্তের রস চালান করেন, কিন্তু তার শরীরে সে রোগের কোনও লক্ষণ দেখা যায় না।কিন্তু রয়্যাল সোসাইটিতে জেনারের পাঠানো ভ্যাকসিন-বিষয়ক গবেষণাপত্রের স্থান হয় ডাস্টবিনে।

১৭৯৮ সাল। ইংরেজি কবিতার গতিমুখ বদলে দিতে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ তাঁদের কাব্যগ্রন্থ ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস’ প্রকাশ করলেন। আর সেই একই বছরে ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার প্রকাশ করলেন তাঁর একটি ছোট্ট বই। সেই বইটি ছিলো মানুষকে গুটি বসন্তের হাত থেকে বাঁচানোর নতুন পথের দিশা। ল্যাটিন ‘ভ্যাক্কা’ শব্দের মানে গরু, তাই জেনার তাঁর এই বইতে গো-বসন্ত বোঝাতে ‘variolae vaccinae’ কথাটি ব্যবহার করেন। তা থেকেই পরে টিকা, বোঝাতে ভ্যাকসিন কথাটির প্রচলন হয়।

লন্ডনে এসে ডাক্তার জেনার তিন মাস পড়ে থাকলেন ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য মানুষের খোঁজে। কিন্তু কে নেবে তাঁর ভ্যাকসিন? নিচু শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মেশা গেঁয়ো ডাক্তার নেহাতই পাগলের প্রলাপ বকছেন— এই ছিল  জেনার সম্পর্কে লন্ডনের অভিজাত সমাজের তখনকার মূল্যায়ন। ফরাসি বিপ্লবের সময় ইংল্যান্ডেও তার ছায়া পড়েছিল, দেখে আঁতকে উঠেছিলেন অনেকে। সে আতঙ্কের রেশ কি আর সহজে কাটে? সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল র‌্যাডিক্যালদের, যাঁরা সমাজ বদলের চিন্তায় বিভোর ছিলেন। জেনারের চিন্তাভাবনায় র‌্যাডিক্যালদের গন্ধ পেলেন অনেকে। জেনারের আবিষ্কারে চিকিৎসকরাও ভ্যাবাচ্যাকা। চার্চের পুরোহিতরাও শিহরিত। অসুস্থ পশুর শরীর থেকে পুঁজরস মানুষের শরীরে ঢুকবে? এ তো ভীষণ অনাচার!

জেনার ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন দেশে। তাঁর ধারণা সঠিক প্রমাণ করতে মফস্সল এলাকায় কারও কারও ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলেন তিনি। নিজের এগারো মাসের শিশু সন্তানকেও ভ্যাকসিন দিলেন।

যুগটা ছিলো রোম্যান্টিক কবিদের। যে যুগ স্মরণীয় হয়ে আছে নতুন পথে চলার নেশা আর মানুষের সুখদুঃখের কথা ভাবার জন্য। কবি কোলরিজ আর রবার্ট সাদি উঠেপড়ে লাগলেন ডাক্তার জেনারের তৈরি এই ভ্যাকসিনের প্রচারে। পত্রপত্রিকায় তাঁরা পঞ্চমুখ হলেন জেনারের প্রশংসায়। মফস্বলে থেকে নিখরচায় মানুষের যক্ষ্মার মতো দুরারোগ্য অসুখ দূর করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আর এক ডাক্তার টমাস বেডোস। তাঁর প্রচারেও কোলরিজ আর সাদি নেমেছিলেন।

১৮০৪ সালে এই ভ্যাকসিন নিয়ে ‘গুড টাইডিংস: নিউজ় ফ্রম দ্য ফার্ম’ কবিতা লিখলেন রবার্ট ব্লুমফিল্ড। ব্লুমফিল্ড লিখলেন গরুর নিঃশ্বাসের সৌরভের কথা। কী অদ্ভুত রোম্যান্টিকতা! আরও বিস্ময়কর, গির্জার পাদ্রিরাও ধর্মোপদেশের সঙ্গে জুড়ে দিলেন ভ্যাকসিনের পক্ষে কিছু কথা।

ধীরে ধীরে ভ্যাকসিনকে খারাপ চোখে দেখা বন্ধ হলো। জেনার পরিচিতদের তো বটেই, অন্য কেউ ভ্যাকসিনের ব্যাপারে উৎসাহ দেখালেই তাঁর ভ্যাকসিন পাঠিয়ে দিলেন নিজের খরচে। ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। ইংল্যান্ডের সেনাবাহিনীর সমস্ত সৈনিককে ভ্যাকসিন দেওয়া হলো। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পৌঁছে গেলো ভ্যাকসিন। ব্রিটেনের সঙ্গে ফ্রান্সের যুদ্ধ চলছে তখন। নেপোলিয়ন তাঁর সেনাবাহিনীর সমস্ত সৈনিককে ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মানবকল্যাণে ডাক্তার জেনারের অবদানের জন্য নেপোলিয়ন জেনারকে বিশেষ পদক দিয়ে সম্মানিতও করেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box