সেই রিভলবারটি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভিনসেন্ট ভ্যান গঁগ

তিনি বেতের তৈরি একটি হ্যাট পরতেন। রাতের অন্ধকারে কাজ করার জন্য সেই হ্যাটের ওপরে কয়েকটি মোম জ্বালিয়ে নিতেন। রাতে কাজ করা প্রসঙ্গে একটি চিঠিতে ভাই থিওকে লিখেছিলেন, ‘‌প্রায়ই মনে হয় যে রাতের অন্ধকারই দিনের চেয়ে অনেক বেশি রঙিন।’‌
আটত্রিশ বছরের জীবনের শেষ দশ বছরই তাঁর হাতের তুলি-রঙ ঝড় তুলেছিলো ক্যানভাসে। তাঁর আঁকা ছবি বেঁচে থাকতে বিক্রি হয়নি, হয়নি আলোচিত। অথচ তিনি হয়েছেন কালজয়ী শিল্পী।

কারো কাছে প্রথাগত ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ নেননি তিনি। এঁকেছেন আকাশ, এঁকেছেন ফুল, এঁকেছেন নারী, এঁকেছেন পাখির ঝাঁক,  আশ্চর্য নক্ষত্রপুঞ্জ অথবা ঘূর্ণায়মান আলোকরশ্মির উজ্জ্বলতা শষ্যক্ষেতে। তাঁর রঙিন ক্যানভাসে বর্ণচৈতন্যের সন্ধান পেয়েছে মানুষ। তিনি ভিনসেন্ট ভ্যান গঁগ।

১৮৯০ সাল। তখন ৩৭ বছর বয়স তাঁর। ভ্যান গঁগ জুলাই মাসের ২৭ তারিখে সেই অ্যাভঁরোর গ্রাম্য মেঠো আল পথ ধরে চলেছেন। সন্ধ্যা নেমে আসছে। হেঁটে রাতে ফিরলেন বাড়ি। কিছু খেলেন না। বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে আবার উঠে পায়চারি করলেন ছোট্ট ঘরের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। তারপর ড্রয়ার খুললেন। সেখানে স্থানীয় এক সরাইখানার মালিকের থেকে নিয়ে আসা ছোট্ট একটি রিভলভার রাখা ছিলো। বের করলেন। তারপর ট্রিগারে আঙুল রেখে চাপ দিলেন। ছিটকে বেরিয়ে আসা বুলেট তাঁর বুক ভেদ করলো। কাতরাতে কাতরাতে শুয়ে পড়লেন নিজের বিছানায়। সে অবস্থায় পাইপে টান দিতে দিতে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন। সারারাত এমন ভাবে কাটার পর সকালে ভাই এলেন, ডাক্তার এলেন।
‘কেন এমন করলে?‌’
সবাই এই প্রশ্নটাই করলে তিনি শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন ‘এটা আমার দেহ। আমি যা খুশি করতে পারি তা নিয়ে, কাউকে দোষ তো দিচ্ছি না, আমার ইচ্ছা আত্মহত্যা করি। তাই করেছি।’
হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও কিন্তু শেষরক্ষা হল না। চলে গেলেন ভ্যানগঁগ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে।

ভ্যান গঁগ এর সেই বাড়ি

সম্প্রতি কয়েকজন গবেষকের দাবি ভ্যান গঁগ আত্মহত্যা করেননি। রিভলভার নিয়ে স্থানীয় দু’টি বালক খেলতে খেলতে আচমকাই রিভলভার থেকে ছুটে আসা গুলি তাঁর বুকে লাগে। তাতেই তিনি দু’দিন পর মারা যান।
কিন্তু প্যারিসের অকশন আর্ট দাবি করেছে এই রিভলভার বুকে ঠেকিয়েই আত্মহত্যা করেছিলেন ভ্যান গঁগ। প্যারিসের উত্তর সীমান্তে যে গ্রামের বাড়িতে তিনি গুলি করেছিলেন নিজের বুকে, সেখানেই দীর্ঘ সময় মানুষের চোখের আড়ালে পড়েছিলো ৭ মিমি ল্যাফ্যঁশো ব্রান্ডের এই রিভলভারটি।

অতি সম্প্রতি তাঁর ব্যবহৃত সেই কুখ্যাত মরচে পড়া রিভলভারটিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই পড়েছে আবার। প্যারিসের অকশন আর্ট নামে একটি সংস্থা রিভলবারটি নিলামে তুলেছে। দাম উঠেছে ১৬২,৫০০ ইউরো। যথারীতি জং ধরা সওয়া শো বছরের পুরোনো রিভলভারটি বিক্রিও হয়ে গেছে। অবশ্য ক্রেতার নামটি গোপন রেখেছেন অকশন হাউজের কর্তারা।

২০১৬ সালে আমস্টারডামের ভ্যান গঁগ মিউজিয়ামে কিছুদিনের জন্য এই ঐতিহাসিক ঘাতক রিভলভারটি প্রদর্শিত হয়েছিলো।কিন্তু পরে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দুনিয়াজুড়ে শিল্পীর ভক্তরা প্রতিবাদ জানান। তারা তাদের প্রিয় শিল্পীর ছবির পাশে সেই কুখ্যাত অস্ত্রের প্রদর্শনী দেখতে চাননি। কিছুদিন পর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ অস্ত্রটি সরিয়ে নেন।

জানা গেছে, ১৯৬৫ সালের কোনো এক সময়ে স্থানীয় একটি ক্ষেতে এক কৃষক সেটি কুড়িয়ে পান। তিনি সেটি গ্রামের এক প্রধানের হাতে তুলে দেন। সেখান থেকে নানা হাত ঘুরে পৌঁছোয় অকশন আর্টের দোকানে। যদিও অনেকেই এই রিভলভারের আসল মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কারো দাবি আমস্টারডামের ভ্যান গখ মিউজিয়ামে যে রিভলভার রাখা ছিলো, তার সঙ্গে এর বিস্তর মিল। তবে নানা জল্পনা–কল্পনা, তর্ক–বিতর্কের মাঝেই অকশন আর্ট সম্প্রতি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‌১৮৯০ সালে যে রিভলভারটি দিয়ে ভ্যান গঁগ আত্মহত্যা করেছিলেন, সেটির সঙ্গে এই রিভলভারের অনেক মিল রয়েছে। সেই সময় যে ডাক্তার শিল্পীর মৃতদেহ পরীক্ষা করেছিলেন তিনি গুলি ও পিস্তলের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার প্রায় সবই মিলে যায় এই রিভলভারের সঙ্গে।’‌
বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে বলেছেন, নিলামে ওঠা এই রিভলভার মাটিতে পড়েছিলো প্রায় পাঁচ থেকে আট দশক। তবে রিভলভারটি এমনভাবে নিলামে বিক্রি হওয়ার ঘটনায়  আমস্টারডমের ভ্যান গঁগ মিউজিয়াম কিছুটা বিরক্ত। তারা মনে করছেন, শিল্পীর জীবন কেড়ে নেয়া সেই হাতিয়ার নিলামে চড়িয়ে ব্যবসা না হলেই বোধহয় ভাল হতো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ আজকাল পত্রিকা

ছবিঃ গুগল  

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]