সেই শহরের কথামালা

ইরাজ আহমেদ

এক সময় ‘ড্যাগার’ শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে ভয়ের অনুভূতি হতো। জানতাম ড্যাগার থাকে গুন্ডাদের কাছে। আর সেই শৈশবে গুন্ডা মানেই তো মনের পর্দায় ভেসে ওঠা অদ্ভুত এক দানবীয় প্রতিকৃতি। একদা ‘আয় জাইগা’ কথাটা মনের মধ্যে যৌন উত্তেজনার খোরাক যোগাতো। ‘ফিল্ডিং মারা’ কথাটা ছিলো প্রেমের অনুষঙ্গ।
এই শহরে সেই কোন কালে এরকম অসংখ্য শব্দ আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহারের ঝুলিতে জমা হয়েছিলো। সময় সেইসব শব্দ আর আবহকে চাপা দিয়েছে তার প্রবাহের নিচে।
আমি সেইসব শব্দকে বলি আন্ডারগ্রাউন্ড শব্দ। নানা প্রেক্ষাপট আর মানুষকে বোঝাতে বিচিত্র ধরনের শব্দের প্রচলন ঘটেছিলো। এখন এমনি অনেক শব্দ ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে। হয়তো আরো বহু বছর পরে এই শব্দরাও মরে যাবে নতুন শব্দের রণক্ষেত্রে।
দেশ স্বাধীন হওযার পর প্রথম ফিল্ডিং আর টাংকি মারা এই দুটো শব্দ পাড়ার বড় ভাই আর আপাদের মুখে বেশী শুনতে পেতাম। আরেকটু বড় হয়ে এগুলোর অর্থ পরিস্কার হলো।মেয়েদের স্কুলের সামনে নিয়ম করে দাঁড়ানো, বিকেলের অবসরে ছাদে মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার অন্য নাম তখন ফিল্ডিং মারা। কেউ বলতো টাংকি। তখন ছুরির বদলে ড্যাগার শব্দটাই বেশী প্রচলিত ছিলো। কিছুদিন পরে আমাদের কথায় উঠে আসে চাকু। ড্যাগার ছিলো অর্ধেক মাছের লেজের মতো বাঁকা বিশাল ছুরি। ভাঁজ খুলতে গিয়ে কট কট করে শব্দ হতো। পরে সেটার সাংকেতিক নাম হয়ে যায় সেভেন গিয়ার।
এক একটা শব্দ অনেক সময় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন সত্তরের শেষ ভাগে এই শহরে যাত্রার মঞ্চে প্রিন্সেস লাকি খানের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা একটি শব্দকে বেঁচে থাকার লাইসেন্স দিলো। শব্দটা ‘আয় জাইগা’। লাকি খান যাত্রা মঞ্চে নাচতেন। সেই বিষ্ফোরক নাচের ফাঁকে লাকি খান দর্শকদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিতেন ‘আয় জাইগা’ এই বাক্যবন্ধটি। ব্যাস, এই শহরের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠলো কথাটা। রিকশাওয়ালা, কসাই, মাস্তান, বেশ্যার দালাল, ছাত্র, যুবক-সবার মুখে তখন আয় জাইগা হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। সেই সময় ঢাকাই ছবিতেও কথাটা ব্যবহার করা হয়েছিলো।লাকি খানের পরে আরো অনেক নাচিয়ে যাত্রামঞ্চে কথাটা ব্যবহার করতেন।
আজকাল এই শহরে ঘুড়ি উড়ানো ব্যাপারটা ক্রমশ বাতিলের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। পুরনো শহরে ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব দেখা যায় নিয়ম করে। ঘড়ির সূত্র ধরে অনেক শব্দ একদা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো এই শহরে। যতদূর মনে পড়ে, সবচাইতে এই পর্বে বেশী জনপ্রিয় হয়েছিলো ‘ছাপ্পা’ শব্দটা। একটা ঘুড়িকে অন্য ঘুড়ি কেটে দিলে বলা হতো ছাপ্পা হয়ে যাওয়া। পরে লোকে প্রেমিকা চলে যাওয়া, ভাগ্য খারাপ এসব কথাকে প্রকাশ করতো ছাপ্পা শব্দ দিয়ে।
‘চালু কাদিরা চাইর আনা তিন আনা’ কথাটার উৎপত্তি সম্ভবত পুরনো ঢাকায়। পরে কেটে ছেটে জনপ্রিয়তা পায় শুধু ‘চালু কাদিরা’। রিকশাওয়ালাদের একদা চীৎকার করে কথাটা বলতে শোনা যেতো।
আশির দশকের সূচনালগ্নে এই শহরে জনপ্রিয় হয়েছিলো ভিসিআর কালচার। এই সংস্কিৃতি উপহার দিয়েছিলো ‘আয় বুলু বলু’ কথাটা। যারা টাকার বিনিময়ে ভিসিআর-এ সিনেমা দেখাতো তারা রাস্তায় পর্ণ সিনেমা দেখানোর জন্য লোক ডাকতো ‘বুলু বুলু বলে। বলে রাখা ভালো তখন এ ধরণের সিনেমার ইংরেজি নাম ছিলো ‘ব্লু ফিল্ম’। বাংলায় বলা হতো নীল ছবি। সেই ‘ব্লু ফিল্ম’-এর অপভ্রংশ হিসেবে চলতি উচ্চারণে এসেছিলো ‘বুলু’ কথাটা।ঢাকার দুই অংশেই তখন এই কথাটা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে।
পুরনো ঢাকার ভাষার হাত ধরে এক সময়ে এসেছিলো ‘আবে’ সম্ভাষণটা। সত্তরের দশক হয়ে আশিতেও প্রচলিত ছিলো আবে ডাক।এটা ছিলো একেবারেই মাস্তানদের ভাষা।
এই শহর বদলেছে। বদলে গেছে সংস্কৃতি আর মানুষের কথা।কত কথা চাপা পড়েছে নতুন কথার প্রবাহে। তবু পুরনো সময়ের সেইসব জনপ্রিয় কথা কখনো স্মৃতির খাতা খুললে উঁকি দেয়। ভাবি, শহরটা কত পাল্টে গেলো!