সেই শহরের দেয়াল

ইরাজ আহমেদ

এই ঢাকা শহরে একদা দেয়ালগুলো যেন ছিলো টপকানোর জন্য, ছিলো বসে গল্প করার জন্য। হোক সে দেয়াল শ্যাওলা ধরা অথবা নতুন। সেদিন ভাইয়ের ছেলেকে প্রশ্ন করেছিলাম, সে দেয়াল টপকেছে কি না? সেই ১২ বছর বয়সী বালক আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলো দেয়াল টপকাবো কেনো কোনো কারণ ছাড়া? জানতে পারলাম সে কখনোই কোনো দেয়ালেই সওয়ার হয়নি, টপকানো তো দূরের কথা। আমার কাছে এটা বিষ্ময়কর সংবাদ তো বটেই।

শৈশব থেকে কৈশর টপকে যৌবন, এই ঢাকা শহরে-ই বেড়ে ওঠা।একতলা, দোতলা বাড়ি সেই শহরে। নানান মাপের বাড়িঘর তখন বেশী থাকায় বাড়িগুলোর সীমানা প্রচীরও ছিলো নানান মাপের।ইট আর সিমেন্টে তৈরী দেয়াল টপকানো কত গল্প ঝুলিতে জমা হয়ে রইলো।

দেয়ালে ওঠা অথবা দেয়াল টপকানো ব্যাপারটা সঙ্গে প্রথম পরিচয় গাছের ফল পাড়তে গিয়ে। বাড়িওয়ালার বাড়ির সাদা দেয়াল। তার পাশেই বিশাল কামরাঙ্গা গাছ। সেই ফলের লোভে পড়ে আমার প্রথম দেয়ালে উঠতে শেখা। একদা এই শহরে আমরা যেসব বালক-বালিকারা সেই শহরের বিভিন্ন পাড়ায় বড় হয়ে উঠেছিলাম ‘টিলো এক্সপ্রেস’ নামে খেলাটা তাদের কাছে ছিলো ভীষণ প্রিয়। এক ধরণের চোর খুঁজে বের করার মতোই খেলা।একদল লুকিয়ে পড়বে আর অন্যদল তাদের খুঁজবে। যতদূর মনে পড়ে এখন, সেই খেলাটাই আমাকে দেয়াল টপকানোয় অভ্যস্ত করে তুলেছিলো। সরু, শ্যাওলার ছোপ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেশীর নড়বড়ে দেয়ালে ঝট করে উঠে যাওয়া, ঢুকে পড়া অন্য কোথাও-কাজগুলো অসাধারণ সব অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানিতে ভরপুর ছিলো। একটা উঁচু দেয়ালে উঠতে পারার মধ্যে এক ধরণের কৃতিত্বও ছিলো। নিজের বাড়িতে ঢোকা আর বের হওয়াটাও বেশীরভাগ সময় হতো দেয়াল টপকে। অভিবাবকদের ফাঁকি দিয়ে দুপুরবেলা কোথাও হারিয়ে যাওয়ার সাক্ষী থাকতো সেই দেয়াল।

মানুষের গাছের ফল চুরির বহু গল্প সেই শহরের অনেক দেয়ালের গায়ে মনে হয় লেখা আছে। আমার বেড়ে ওঠার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই শহরের সিদ্ধেশ্বরী পাড়া। একবার এক দুপুরে সেই পাড়ার মন্দির লাগোয়া এক বাড়ির দেয়ালে উঠেছি তিন বন্ধু। উদ্দেশ্য বিশাল এক পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা চুরি। নড়বড়ে দেয়ালে সাবধানে উঠেছি।দেয়ালটার শেষ জীবন চলছিলো তখন। একদিকে সামান্য হেলে পড়া, শ্যাওলার আগ্রাসনে ক্লান্ত। আমাদের পেয়ারা পাড়াও চলছে নিঃশব্দে। হঠাৎ একতলা বাড়ির বারান্দায় গৃহস্বামীর উদয়।বয়ষ্ক এক মানুষ সেই দুপুরে তাঁর গাছে ডাকাত পড়েছে দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। তৎক্ষণাৎ ঘরে গেলেন এবং ফিরে এলেন বন্দুক হাতে। আমরা তখনও পেয়ারা লোপাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ বন্দুকের আগমনে আমরা তিনমূর্তি তখন দিশেহারা, পালানোর পথ খুঁজি। সেই পলায়ন পর্বে আমাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিলো। নড়বড়ে সেই দেয়ালের উপর দিয়ে ছোটা এবং লাফিয়ে পড়ার সময় আমাদের পায়ের ধাক্কা আর অত্যাচার সইতে না পেরে সেই ইঁট-সিমেন্টে তৈরী প্রাচীর নতজানু হয়ে গেলো। পেছনে ভেঙ্গে পড়ার  বিকট শব্দ আর গৃহস্বামীর আর্তচিৎকার ফেলে আমরা তখন উধাও।

সেই শহরে দেয়ালে বসে আড্ডা দেয়ার একটা সংস্কতি চালু ছিলো পাড়ায় পাড়ায়। ভাঙ্গা অথবা সবল দেয়ল সে যাই হোক না কেনো, তরুণদের একটা আড্ডা সেখানে হবেই। আমাদের পাড়ার মোড়ে জনতা ব্যাংকের শাখা। ব্যাংকের সীমানা জানান দিতো দিচ্ছে নিচু এক দেয়াল। আমাদের প্রিয় আড্ডাস্থল, অলস ছুটির দিনগুলিতে বন্ধুদের মিলিত হওয়ার জায়গা। একটা তারে বসা অনেকগুলো পাখির মতোন আমরা সারবেঁধে বসে থাকতাম সেই ব্যাংকের দেয়ালে। বৃষ্টি ফুরানো কোনো বিকেল,বসন্তের সন্ধ্যা অথবা শীতের সকালে দেয়ালে বসে আমরা গল্প করতাম।

আমার সেই পাড়ায় দেয়াল টপকানোর একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলো। বয়সে একটু বড় এক তরুণ। ডাকতাম মঈন ভাই বলে কিন্তু সম্পর্কটা বন্ধুর চাইতেও কিছু বেশি।সেই মানুষটার দেয়াল টপকানোয় প্রতিভা ছিলো গল্পের মতোন। পাড়ার হেনো দেয়াল ছিলো না যে সে অতিক্রম করতে পারতো না। তার সঙ্গে থেকে থেকে আমিও দেয়াল অতিক্রম করায় বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম। আমার ধারণা প্রত্যেক পাড়ায়ই তখন এরকম একজন ওস্তাদ লোকের দেখা মিলতো।

বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেয়াল টপকাতে হয়েছে পুলিশ অথবা প্রতিপক্ষের তাড়া খেয়ে। ভাঙ্গা মিছিল তো দেয়ালই টপকাবে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৩ সালের সেই রক্তাক্ত ১৪ ফেব্রুয়ারীতেও পুলিশের ধাওয়ায় পালাতে গিয়ে টপকাতে হয়েছিলো দেয়াল।এরপর বহুবার এ ধরণের ঘটনায় দেয়াল পার হয়ে খুঁজতে হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়।

দেয়াল টপকানোর সঙ্গে সেখান থেকে পড়ে যাওয়ার গল্পও খুব গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।বহুবার দেয়াল থেকে পড়ে গেছি। ঢাকা স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলায় মারামারি থেকে বাঁচতে দেয়াল টপকে পা মচকে গিয়েছিলো। বিছানায় থাকতে হয়েছিলো টানা একমাস।

এই শহরে কোনো বালক অথবা কিশোর আর দেয়াল টপকায় না। গলির ভেতরে হুল্লোড় করে ‘টিলো এক্সপ্রেস’ খেলাও বোধ করি আর নেই। বদলে গেছে সেই সব ঘরবাড়ির দেয়াল-সীমানাও। দেয়াল টপকানো এখন আর অ্যাডভেঞ্চারের মতো হাতছানি দিয়ে ডকে না। ঝকঝকে বাড়িরে আরো বেশী রংদার দেয়াল এখন অনেক বেশি মাপা, হিসেবী। সেখানে বেহিসাবী তরুণদের আর বসে থাকতে দেখা যায় না একদা দূর থেকে যাদের কোনো তারে বসা পাখি বলে মনে হতো।

ইরাজ অাহমেদ

ছবি: প্রাণের বাংলা