সেই শহরের রাত্রিগুলো…

ইরাজ আহমেদ

ঢাকা শহর তখন রাত্রি এলে এতো আলো জ্বেলে জেগে থাকতো না। সেই শহরের রাত্রিগুলি ছিলো অনুজ্জ্বল আর নিভু নিভু, রোগে ভোগা বালকের মতো। শহরের পথে ছিলো ম্লান আলোর স্ট্রিটলাইটের মিছিল।বেশীররভাগ গলিপথে জ্বলতো না লালচে আলোর নিঃসঙ্গ বাল্ব। এতো যানবাহনের তীব্র আলো রাজপথের অন্ধকারের ময়নাতদন্ত করতো না কেটেছিঁড়ে। আলোর মহড়া বলতে ছিলো কয়েকটা দামী হোটেলবাড়ি, ফোয়ারা আর সিনেমাহল।তবু ওই শহরটাকেই ভালোবাসতাম আমি।

মাত্র ৩৫ বছর আগেও সেই শহরের গলি-উপগলিতে আলোর বন্যা বইয়ে দিতো না স্ট্রিটলাইট। পাড়ার মোড়ে ল্যাম্পপোস্টে ফাঁসির আসামীর মতো একা জ্বলে থাকতো কম শক্তির ন্যাড়া বাল্ব।বেশীরভাগ সময় এসব বাল্ব চলে যেতো চোরদের ঝুলিতে। ফলে আলো হারিয়ে গলিগুলো ডুব দিতো অন্ধকারে। সেইসব রাতে লোডশেডিং হলে তার আয়ুও ছিলো দীর্ঘ। একবার গেলে কখন ফিরবে কেউ বলতে পারতো না। আলোহীন রাত্রিগুলো আমার কাছে ছিলো দীর্ঘ নিষ্প্রদীপ উৎসবের মতো। কিশোর বয়সে সেই অন্ধকারে পাড়ায় ছিঁচকে চুরি, অন্যকে বিরক্ত করতে জানালায় পাথর ছোঁড়া, দলবেঁধে চিৎকার করে গান গাওয়া আর গলির মোড়ে আড্ডা।

তখন একটু বড় ধরণের ঝড় হলেই বিদ্যুত চলে যেতো লম্বা বিরতি নিয়ে। রাতবিরাতে অথবা সন্ধ্যাবেলা বন্ধুদের বাড়ি অথবা নিজের বাড়িতেই আড্ডা জমতো। কেউ না কেউ ছাতা মাথায় চলে আসতো ভিজতে ভিজতে। আমিও যেতাম। এমনো হয়েছে সিদ্বেশ্বরীর একতলা বাড়ির জানালার ভেতরে আমি আর বাইরে ছাতা মাথায় কোনো বন্ধু, জানালায় দাঁড়িয়েই আড্ডা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এবং পরে দেখতাম বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এবং রাষ্ট্রীয় দিবসে সাজানো হতো রাতের শহরকে টুনি বাল্ব জ্বেলে।মনে আছে, কৈশরে সন্ধ্যাবেলা ছাদে উঠে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতাম অনেক দূরে টেলিফোন অফিসের বিশাল টাওয়ারের গায়ে ফুটে থাকে লাল বিন্দুসম আলোরটার দিকে।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ছিলো শাহবাগের মোড়ে। বড়দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর ঝলমলে অলো দিয়ে সাজানো হতো সেই হোটেলকে। তবে এখনকার মতো অতো আলো, সান্তাক্লসের আলোর মালা জড়ানো অবয়ব ফুটে উঠতো না হোটেলবাড়ির মাথায়। কিন্তু সেই আলোকমালা দেখেই আমাদের মন ভরে যেতো। রাষ্ট্রীয় দিবসে আলো দেয়া হতো শাহবাগ মোড়ের ফোয়ারায়(ফোয়ারাটা এখন আর নেই)। আলো মেখে ঝলমল করে উঠতো কার্জন হল আমার সেই ম্লান শহরে।

শহরের সিনেমা হল আর হোর্ডিংয়ে বিশাল আকৃতির নায়ক নায়িকার ছবি মধ্যরাত অবধি আলো জ্বেলে বসে থাকতো লাস্ট শো শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। জেগে থাকতো বাহাদুর শাহ পার্কের মোড়ে প্রাচীন কুমিরের মতো দেখতে কিছু ট্যাক্সি জেগে থাকতো রাতের যাত্রী ধরবে বলে। তখন রাতজাগা হোটেল-রেস্তোরাঁ ছিলো না ঢাকায়। সিনেমা হল, রেলস্টেশন আর স্টিমারঘাটের আশপাশে রাত্রির ক্লান্ত বাতাসে ভর করে কিছু খাবারের দোকান অনিদ্রায় ভুগতো। জেগে জেগে ঘুমাতো শহরের পতিতাপল্লীগুলো। এদিক-সেদিক ছড়িয়ে থাকা নিভৃত পানশালা রাত দশটায় উগরে দিতো কয়েকজন মাতাল। সেই শহরে রাতের বিয়েবাড়িগুলোর আয়ু-ও বেশীক্ষণ স্থায়ী হতো না।অনেক বছর আগে এই শহরে বেশীরভাগ বিয়ের অনুষ্ঠান হতো দুপুরে। রাতের বিয়ে বাড়ির গেট সাজানো হতো সামান্য আলো ছড়ানো টুনিবাল্ব দিয়ে। সেই লাল, নীল আলোর ইশারাও চোখ বন্ধ করতো রাত দশটার মধ্যে।

সেই শহরে সন্ধ্যাগুলো আমাদের জন্য উপভোগ্য করে তুলতো টেলিভিশন। দুনিয়া কাঁপানো ইংরেজি ধারাবাহিক আর অসাধারণ বাংলা সাপ্তাহিক নাটক ভরিয়ে তুলতো আমাদের নানা অতৃপ্তির শূন্যস্থান।

আশির দশকে আমাদের এই রাজধানীতে বসেছিলো ফ্লাড লাইট। স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখা রাতেরবেলা। এ অভিজ্ঞতা ছিলো তুলনাহীন। অতো আলোর আয়োজন সেই প্রথম দেখা। তখন স্টেডিয়াম পাড়া সন্ধ্যা থেকেই জমজমাট। ফ্লাড লাইটের নীলচে আলো মোহময় করে তুলছে স্টেডিয়ামের ভেতরে সবুজ ঘাসের ময়দান। মনে আছে, পাড়া থেকে বন্ধুরা দলবেঁধে সেই ফুটবল ম্যাচ দেখতে যেতাম।

এখন অনেক আলোর মাঝে ঢাকা সেজে থাকে রাত্রিবেলা। আলো ঠিকরে পড়ে পথে, দামী দোকানের দরজা-জানালায় কত হাতছানি, কফির দোকানে উষ্ণতার খোঁজে মানুষের ভীড়, গানের ঝংকারে হোটেল আর বার-নগরীর নৈশজীবন। কিন্তু আমার তখন খুব মনে পড়ে সেই শহরের কথা। মনে পড়ে তার আলো নিভিয়ে নিদ্রার আয়োজন, বাল্বহীন ল্যাম্পপোস্ট, অন্ধকার গলি, দেয়ালে শ্যাওলার দাগ আর মায়ামাখা রাত্রিকাল।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা