সেই শহরে প্রেমের গল্প

ইরাজ আহমেদ

মেয়েটি দাঁড়িয়েছিলো নীলক্ষেতে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুলের সামনে। ওই ভবনে তখন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছায়ানটের ক্লাস হতো। আশির দশকেও ছায়ানটের নিজস্ব ভবন তৈরী হয়নি। মেয়েটি দাঁড়িয়েছিলো ছুটির দিনের সকালে। ছায়ানটে গান শিখতে আসতো। আমরা দুই বন্ধু রিকশায় চড়ে গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। তবে সেটা পাত্রী দেখা নয়, বলা যায় প্রেমিকা দেখা। একদা এই শহরে প্রেমিক-প্রেমিকারা এভাবে দলবদ্ধ হয়ে দেখতে যেতো সম্ভাব্য প্রেমের মানুষটিকে। আর এই দেখতে যাওয়া নিয়ে ঘটতো নানান বিপত্তি আর উত্তেজনাকর ঘটনা।

  আমার সঙ্গে বছর তিরিশ আগে যে বন্ধুটি ছিলো তার সঙ্গেই সেই অজ্ঞাত মেয়েটির ল্যান্ডফোনে অদ্ভূত ভাবে একটা সম্পর্ক তৈরী হয়েছিলো। তারা কথা বলতো ফোনে। এক পর্যায়ে মেয়েটি আমার সেই বন্ধুর প্রেমে পড়ে যায়। তারপর একদিন ঠিক হলো তারা দেখা করবে। তখন এরকম প্রথম দেখায় জামাকাপড়ের রঙ দিয়ে একে অপরকে চিনতে হতো। তখন তো আর মোবাইল ফোনের যুগ ছিলো না। বিশেষ একটি রঙের জামা অথবা শার্ট পড়ে যেতে হতো অকুস্থলে। অবশ্য সেই রঙটা ঠিক করে নিতো প্রেমে আগ্রহী যুগল। কথা অনুযায়ী আমার বন্ধুরও একটি নিদিষ্ট রঙের শার্ট পরার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমার বন্ধুটি মত বদলালো। সেদিন তার হঠাৎ করেই মনে হয়েছিলো না দেখে আগে থেকেই প্রেমের জালে ধরা দেবে না। তাই সে রঙ বদলে নিয়েছিলো শার্টের যাতে মেয়েটি তাকে দূর থেকে চিনতে না পারে।

এমনি সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকতো আমাদের সেই তরুণবেলয়। উল্টো পোশাক পরে এরকম দেখাদেখির পালায় ছেলেরা অনেক সময়ই কন্যা পছন্দ না হলে আগেই কেটে পড়তো। তবে এই একই ঘটনা ছেলেদের কপালেও যে জুটতো না তা নয়। তাদের অনেক সময় রীতিমতো নাজেহাল হতে হতো। হয়তো প্রথম দেখার নাটক মঞ্চস্থ হবে রাজধানীর নিউ মার্কেটে। ছেলেটি ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে পৌঁছালো সেখানে। দেখা গেলো সেখানে সেই কাঙ্ক্ষিত বালিকা একা নয়, উপস্থিত আছে আরো কয়েকজন। তারা সবাই বন্ধু। শর্ত জুড়ে দেয়া হতো প্রথম দেখায় সেই দুরুদুরু বক্ষের ছেলেটিকেই চিনে নিতে হবে তার অদেখা প্রেমিকাকে। অনেকটা কানামাছি খেলার মতো একটা ব্যাপার। শেষে নানা ধরণের বিদ্রুপ আর হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে  যবনিকাপাত হতো সেই সংক্ষিপ্ত নাটকের।

তখন এই শহরে ‘ছিল দেয়া’ বলে একটা শব্দের প্রচলন ছিলো। আলু অথবা শশা ছেলার মতো একটি চিত্রকল্প। আরেকটু বিশদ করে বলা যেতে পারে, অনেকটা মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গার মতো। এমন প্রথম দেখায় দলবদ্ধ হয়ে কোনো রেস্তোরাঁয় ছেলেটি অথবা মেয়েটির মানিব্যাগ হালকা করার কাজটাকেই বলা হতো ‘ছিল দেয়া’। তখন মানিব্যাগে কত টাকাই আর থাকতো! এমন বিপত্তির কবলে পড়ে কৌশলে পালিয়েও আসতে হয়েছে কাউকে। ফলাফল, প্রেম বিফলে যাওয়া। এখন যে তরুণ তরুণীরা এই শহরে মন দেয়া- নেয়ার কারবার করেন তাদের বেলায় এমন ধরণের ঘটনা ঘটার কোনো সুযোগ নেই। হয়তো তাদের সেই ইচ্ছেও নেই।দামি রেস্তোরাঁ আর দামি খাবারে এখন অনায়াশ প্রবেশাধিকার রয়েছে তাদের। তাদের কাছে এসব ছেলেমানুষী কাণ্ড হয়তো অর্থহীনও।

সেই সময়ে এই শহরে এরকম প্রথম দেখা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় তরুণদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও ঘটে যেতো। এরকম অনেক মারপিটে আমি নিজেও অংশ নিয়েছি।আরেক পাড়ার ছেলে এসে আমাদের পাড়ার মেয়ের সঙ্গে প্রেমের পরীক্ষা দেবে সেটা আমরা কিছুতেই মানতে পারতাম না। আমার শৈশবের পাড়ায় একটি মেয়ে ছিলো। সে ছিলো বেশ তরল স্বভাবের কিশোরী। সেই সময়ে অনেক ছেলেই তার প্রেমে হাবুডুবু খেতো। এক সময়ে আমাদের পাড়ার তিন বন্ধু একসঙ্গে প্রেমে পড়েছিলাম সেই কিশোরীর। সেও আমাদের তিনজনের সঙ্গেই চোখ আর হাতের ইশারায় প্রেমপর্ব চালিয়ে যাচ্ছিলো। তখন বেশীরভাগ ভালোবাসার সূচনা হতো এমনি ইশারায়। শেষে একদিন তারই এক বন্ধুর ছাদে দেখা করার আমন্ত্রণ পেলাম। কিন্তু বিভ্রাট অপেক্ষা করছিলো আমার জন্য। সময় ভুলে মেয়েটি আমাদের দুই বন্ধুকে একই দিনে একই সময়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেছিলো। তারপরের ঘটনা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই প্রথম দেখার পর্ব শেষ হয়েছিলো কঠিন সংঘাতের মধ্যে দিয়ে।

শুরু করেছিলাম অোমার সেই বন্ধুর প্রথম দেখার গল্প দিয়ে। মেয়েটির কথা আমার এখনো মনে আছে। তার সামনে দিয়ে আমরা দুজন রিকশায় চলে গিয়েছিলাম সেদিন। আমার বন্ধুকে সে চিনতে পারেনি। আর আমার বন্ধুরও সেই কিশোরীকে দেখে পছন্দ হয়নি। তার বিবেচনায় সেই মেয়েটি তখন যথেষ্ট রূপবতী ছিলো না। আজ সে কোথায় আছে জানি না। তবে তার কথা আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে। মনে পড়ে তার সেই অসহায় দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গীটি।

ছবিঃ লেখক