সেই সব অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি, আমাকে কি কাঁদায় ? না, কখনও না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

৯৮ সালের গল্প।ছবির জগতে আমি পরিচিত একটি নাম কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজে আমি হারানো দিনের গানের শিল্পী। গাইতে গেলেই আষাঢ় শ্রাবণ, নিঝুম সন্ধ্যায়, কিছুক্ষণ আরও, না হয় রহিতে কাছে এগুলো গাইতে হয়।তাদের আর দোষ কি,গেয়েছি যে আমি। কোন কিছুতেই আসলে দোষ নাই কিন্তু মনের কোনে একটা খচখচ। অনেক অনুষ্ঠান করি।মাসে প্রায় আট দশটা,নিয়মিত। কিন্তু আমার মনে তৃপ্তি আসেনা।আমি চেষ্টা করি আমার গানগুলো গাইতে। তুমি আমার এমনই একজন, যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে, তোমাকে চাই শুধু তোমাকে চাই।দর্শক স্থানুবৎ বসে থাকেন।যেন সামনে কোন শিল্পীই গাইছেনা।তালি যা পড়ে তা গোনা যায়।তারা আশায় থাকেন (সবাই না তবে বেশীরভাগই) শিল্পী কখন তালের গান গাইবেন তারা হাস্যকর ভঙ্গিতে নাচবেন। সারাবছর অফিস করে তারা অনুষ্ঠানে মহিলা শিল্পীর নাচগান দেখে উপভোগ করে ক্লান্তি কাটাতে চান।এখন এভাবে বলতে পারছি।তখন ভাবতেই গা গুলাতো। তারা কখনও বোঝেননি বা বুঝতে চাননি যে বিনোদনকারী আর শিল্পীতে কতো তফাৎ! এমনিতেই আমার “বাঁশের খাইটা”র মতো শুধু দাঁড়িয়ে থেকে গান উপস্থাপন , তার উপর সাদামাটা কাপড় জামা ইত্যাদি মনরঞ্জন করার মতো কিছুই ছিলো না।

তারা কতটা দ্বিধায় পড়লেন জানিনা আমি খুব সংকটে পড়লাম। আমার অনুষ্ঠানে যেতে ভয় লাগতে থাকলো ।তাদের উপর আস্থাও কমে আসতে থাকলো কিন্তু অবাক কান্ড যে, অনুষ্ঠান এর সংখ্যা বাড়তেই থাকলো।

আমার হাজব্যান্ড বলতেন তুমি এতো ভয় পেওনা।ওনারা তোমার গান শোনেন মনোযোগ দিয়ে। তোমার গান শুনলে তারা নীরব হয়ে যান।আমি বুঝিনা,বলি কিজানি তুমি কি সব বলো! কিন্তু দ্বিধা আমার রয়েই যায়।

ডন কোম্পানিতে যত হারানো দিনের গান গেয়েছিলাম তার শেষ দিকে আমি লতাজীর হিন্দি গান গেয়েছিলাম একটা পুরো ক্যাসেটে শ্রদ্ধাভরে। একটা কর্পোরেট অনুষ্ঠান, শেরাটনে গেলাম গাইতে।আমি নিজের দুয়ে ‘টা গান গাওয়ার পরই স্লিপ আসলো। সবই লতা মুঙ্গেসকর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রতিমা বন্দোপাধ্যায় উনাদের গান। সেগুলোও গাইলাম। তারপর আমার হাজব্যান্ড মঞ্চের পাশে এসে বললেন এই অনুষ্ঠানে কিছু ইন্ডিয়ান গেস্ট আছেন। তাদের সম্মানার্থে কিছু হিন্দি গান গাইতে বলেছেন আয়োজক।আমি সহজে হিন্দি গাইনা, যেহেতু গেস্ট এর দোহাই আমি খাতা উল্টিয়ে গান খুঁজে মেরা দিল ইয়ে পুকার আযা, আযারে পারদেশী, গাইতে আরও গাওয়ার রিকুয়েষ্ট আসছিলো। আমি ধরলাম মাওসাম হ্যায় আশকানা, লম্বা গান।গানের অর্ধেক হতে আমার হাজব্যন্ড হাত দিয়ে গান বন্ধ করার অর্ডার দিলেন। আমি কুণ্ঠিত। বুঝতে পারছিলাম না।তিনি এবার পরিষ্কার বললেন নেমে যেতে। একটা অন্তরা বাকি থাকতেই নেমে গেলাম।উনি আমার হাত ধরে সোজা হল থেকে টেনে বের করে নিয়ে সোজা গাড়িতে উঠালেন।সারা গাড়ি আর কোন কথা বললাম না।তাকে একটা স্পেস দিলাম।তারপর বাসায় এসে ধীরে সুস্থে জিজ্ঞেস করলাম, বলেনই না বলেনই না। পরে জানালেন আমি থার্ড হিন্দি গান ধরার পর আমি যখন মাওসাম হ্যায় আশেকানা গাইছিলাম তখন যিনি আমাকে গাইতে ডেকেছিলেন, পেমেন্ট নিয়ে ডিল করেছিলেন উনি খুব রেগে গিয়ে আমার হাজব্যান্ড কে বলেছেন ” হোয়াট দা হেল শি ইজ সিঙ্গিন! মানুষ নাচানাচি করবেনা? শ্রোতা ঘুমানোর জন্য উনাকে ডাকা হয়েছে?” এইরকম অপমানজনক কথা আমরা জীবনেও শুনতে হবে ভাবিনি।আমার ধারণা কিছু সুশীল শিল্পী গায়িকা বিনোদনকারী বারবনিতা সব গুলিয়ে ফেলেন! শ্রোতাদের ঘুম পাড়ানোও আমার দায়িত্ব না, নাচানোও আমার দায়িত্ব না।তারা বা তিনি কি আমার বেশভুশা আমার দাঁড়ানোর ভঙ্গি আমার উপস্থাপন দেখে কিছুই আন্দাজ করতে পারেননা? আসলে সকাল নয়টা পাঁচটা অফিস করে তাদের ভুবন ছাড়া অন্য কোন জগতকে সম্মান করা শেখেনই নাই।একজন পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর কাছে কিছু নাচাকোঁদা আশা করেন না অথচ মহিলা শিল্পী দেখলেই তারা ( সবাই না কিন্তু অনেকেই) নড়েচড়ে বসে আদিম ভাবনায় ডুবে যেতে চান।গান যে শোনার বিষয় এটা অনেকেরই মাথায় আসেনা!

আমার হাজব্যান্ড যে অর্ধেক এডভান্স টাকা নিয়ে যে অনুষ্ঠান ডিল করেছিলেন এবং এই অনর্থক মুর্খের মতো বাজে কথা অবলীলায় বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন তার অফিসে গিয়ে টাকাটা ফেরত দিয়ে আসলেন।শুনলাম উনি অনেক সরি টরি বলেছিলেন কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি।বলে ফেলা কথা টুথপেষ্ট এর মতো সবাই জানে।

উনি বাসায় ফিরে বললেন, লাগলে তোমাকে আর মঞ্চে গাইতেই হবে না কিন্তু তোমার নীতি তোমার সততা তোমার ইমেজ আমি কিছুতেই নষ্ট হতে দেবোনা। তাতে আমাদের যদি পানের দোকান দিতে হয় দেবো। যে শিক্ষা তিলে তিলে তোমার বাবা, তোমার পরিবার, তোমার ওস্তাদজী, আমি তোমাকে দিয়েছি তার এক পা ও তুমি এদিক ওদিক যাবেনা। এতে গান হয় হবে না হয় না হবে।তবে তুমি এটাও জেনে রেখো, এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তোমার গান সবাই স্থানুবৎ শোনে।তাই শুনবে ইনশাআল্লাহ। আমার দোয়া, সহযোগীতা,সহমর্মিতা, সব তোমাকে জড়িয়ে।তোমার বাবার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমি তোমাকে পৌঁছে দেবোই।তারজন্য আমার প্রফেশনের ব্যাঘাত ঘটে ঘটুক। তোমাকে পৌঁছে দিতে আমাকে এই আত্মত্যাগ করতেই হবে।আমি সেই পথেই আঁটঘাট বেঁধে নামছি।তুমি অশ্রু মোছো বউ!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক খেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]