সেটুকু বাকী জীবন মিস করবো

আবিদা নাসরীন কলি: তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র সংবাদ পত্রিকা অফিস। ২০০৪ থেকে তাঁকে দেখেছি খুব কাছ থেকে।বড়ো আমুদে এবং গল্পবাজ বেলাল ভাই।সংবাদের চিফ রিপোর্টার সালাম জুবায়ের কলকাতা ভ্রমণের কথা উঠলেই বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে কলকাতা ঘোরার গল্প বলতেন। আমার প্রচন্ড হিংসে হতো।তারপর দিনে দিনে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে আমারই গড়ে ওঠে দারুণ সখ্য।তখন প্রায়ই সারাদেশে হরতাল পালিত হতো।এমনি দিনে বেলাল ভাই বাড়ি থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে চলে আসতেন সংবাদ অফিসে।সহকারী সম্পাদকদের রূমে চলতো তাঁর আড্ডা।সালাম ভাইও যোগ দিতেন।বাদ পড়তামনা আমিও। কখনও সখনও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ভাইও বসে পড়তেন। তারপর অফিসের সিএজিতে চড়াও হয়ে এই আড্ডা চলে যেত বিউটি বোডিং-এ।চলতো লাঞ্চ করা আর স্মৃতির অলিগলিতে ঘোরা। কারো কথাই যেন শেষ হতে চাইতো না।মাঝে মাঝে সালাম ভাইয়ের কাছে কিছু জানতে চাইলে বলতেন, এটা তো বেলাল ভাই ভালো বলতে পারবেন।আবার অপেক্ষা করে থাকা সেই মানুষটার জন্য।দেখা পেলেই হামলে পড়া।এমনই একজন গল্পবাজ মানুষ ছিলেন আমাদের বেলাল ভাই। যেন কথার যাদুকর।
মাঝে মধ্যে প্রেসক্লাবে আমি তাঁকে একেবারে একা পেয়ে যেতাম।সেদিন গল্পের কোন মাথামুণ্ডু থাকতো না।কিভাবে জাহাজে চড়ে কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন সেখান থেকেশুরু করে কিভাবে বুদ্ধদেব বসু, সুনীল,শক্তি এমনকি কমলকুমার মজুমদার অব্দি পৌছে যেতাম টেরও পেতাম না।কবি-সাহিত্যিকদের নাম ধরে ধরে প্রত্যেকের সম্পর্কে আমি তার কাছ থেকে কত অজানা কথাইনা জেনেছি।কখনও নিজের জানার গণ্ডি থেকেই বলেছেন জীবনানন্দ দাশ, এমন কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কেও।কখনও মনে মনে ভাবতাম বেলাল ভাই না থাকলে আমাকে এসব গল্প কে শোনাবে???তখনই জানতে চাইতাম আপনার শরীর এখন কেমন আছে বেলাল ভাই? বলতেন, এখনও এক ঘন্টা করে হাটতে পারি রমনায়।আমি মনে মনে খুশি হতাম, তাহলে কোন রোগ নেই বেলাল ভাইয়ের।
খুব ছোটবেলাতে ছোটফুফুর বাড়ি সন্দ্বীপে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি।ভুলতে পারেননি কখনও সন্দ্বীপের হরিশপুর শহরটা ।বলতেন, এমন ছবির মতো শহর আমি কোথাও দেখিনি। উত্তর-পূর্ব, পশ্চিম-দক্ষিণ সবই কেমন দিকশূন্যপুর।শুনে শুনে আমার মনটাও চলে যেতো সেই শহরে।খুব দেখার ইচ্ছে হতো হরিশপুর শহরটা।বলতাম, চলেন বেলাল ভাই চলে যাই সেই শহরে ।বলতেন, চলো…।কিন্তু আমাদের আর যাওয়া হয়নি, কখন দেখা হয়নি ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন সেই কোর্টকাছারি পাড়া।
অনেক সময় নিজের সাজানো লাইব্রেরীটা নিয়েও চিন্তিত হতেন। বলতেন, আমি না থাকলে কি হবে বইগুলোর?এখনই তো ছিড়েছুড়ে যাচ্ছে বইগুলো।এ বয়েসে আর ঝেড়েঝুড়ে রাখা সম্ভব নয়। আমার লোভ হতো কিন্তু সংম্বরন করতাম।একদিন দুপুরে বাসা থেকে ফোন করি, বেলাল ভাই রিসিভ করা মাত্রই বলি,আপনার বইগুলো থেকে ক’টা বই কি আমি নিতে পারি…? হেসে বলেন, পারলে সবই নিয়ে যাও। দিনক্ষণও ঠিক হয়। তবে কথা হলো সকাল ৯টার ভিতর যেতে হবে।উত্তরা থেকে পুরানা পল্টন। দু’দিন রওয়ানা হয়েও ৯টার ভেতর পৌছাতে পারিনি।তারপর একদিন ভারতীয় দূতাবাসে দেখা হলো বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে।সেদিন আমার মতো বই নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন আমার পাশে বসা অভিনয় শিল্পী শম্পা রেজাও ।এবার উত্তরাবাসী দু’জনই সুবেহ সাদিকে রওয়ানা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই।কিন্তু আর সে গন্তব্যে যাওয়া হলোনা আমাদের। অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন আমাদের বেলাল ভাই।একটু সুস্থ্য হয়ে পাড়ি জমালেন সন্তানের কাছে আমেরিকায়।তারপরেরটুকু সবাই জানা। অসুখ আর তার পিছু ছাড়েনি…।শেষ পর্য্ন্ত তিনিই ছেড়ে দিলেন পৃথিবীর হাতটা।
এই একটা জীবনে বেলাল ভাই দেখেননি এমন কিছু মনে হয় নেই। জীবনের স্বাদ গ্রহন করেছেন আজলা ভরেই।কোন কিছুতেই তাকে কখনও অতৃপ্ত দেখিনি।বলতেন, জীবনটাকে দেখেছি উল্টেপাল্টে।কোন ক্ষোভ নেই।তবে আমিতো তাঁর চলার পথটা শুনে শুনে হৃদ্ধ হতাম।এখন সেটুকু বাকী জীবন মিস করবো।

ছবি: গুগল