সেদিনের সেই একই কিশোর আজও ছুটে চলেছে

ডা. এম আল মামুন

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

(মদিনা-তাবুক মহাসড়ক থেকে): সিটবেল্ট বেঁধে বসে আছি টয়োটা ল্যাণ্ড ক্র্যুজার জীপের সামনের সিটে। হাতের বামে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালাচ্ছে আমার অফিসের সৌদি গাড়িচালক। বিশালাকৃতির এই প্রাডো জীপে আর কেউ নেই। গাড়ি চলছে ঘন্টায় একশো ত্রিশ কিলোমিটার বেগে। মদিনা-তাবুক মহাসড়ক ধরে। এই মহাসড়ক তাবুক শহরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে জর্ডানের রাজধানী আম্মান বরাবর। আজ সকালে এসেছিলাম তাবুক ডাউনটাউন থেকে আড়াইশো কিলোমিটার দূরের একটি জেলা শহরে। সরকারী সফর। এখানকার প্রধান হাসপাতালটির ‘ইনফেকশন প্রিভেনশন এণ্ড কন্ট্রোল’ বিষয়াদি পরিদর্শন শেষে ফিরে যাচ্ছি তাবুকে।

রোদেলা মরুদুপুর। ঘড়ির কাঁটায় সময় দুপুর আড়াইটা। মরুভূমির আকাশ বেশিরভাগ সময়ই ঝকঝকে নীল থাকে। আজ যেন একটু বেশিই নীল। ওই নীলের ভেতর এখানে ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে সাদা মেঘের হালকা প্রলেপ। সেই প্রলেপ ভেদ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে মরুসূর্যের সোনালী রোদ। মহাসড়কের দুই পাশে ছোট ছোট মরুপাহাড়। মরুপাহাড়গুলোর রঙ ধূসর। ধূসর মরুপাহাড়ের ঢালে মরুপ্রান্তর থেকে বাতাসে ভেসে এসে আছড়ে পড়ছে ঘূর্ণায়মান বালিকণা। ওই উড়ন্ত বালিকণায় সূর্যের রাঙা আলো প্রতিফলিত হয়ে বিস্তীর্ণ মরুভূমির শূন্যতাকে গভীর থেকে আরও গভীর করে তুলছে।

স্যুটেড ব্যুটেড আমি চোখে রোদ-চশনা লাগিয়ে চলন্ত জীপের ভেতর থেকে এসব দৃশ্য উপভোগ করছি। এই মুহূর্তে আমার দৃষ্টি সামনের পিচঢালা মহাসড়কে। মাঝে মধ্যে উল্টোদিক থেকে আসা দুই একটা ধীরগতির ট্রেইলার ছাড়া মহাসড়কে তেমন একটা যানবাহন চোখে পড়ছে না। আচমকা মনে হলো একটু দূরে গাড়ির সামনে মহাসড়ক জুড়ে থৈ থৈ করছে শুধু পানি আর পানি। এই ঝকঝকে রোদেলা মরুদুপুরে সড়কে পানি এলো কোথা থেকে? তবে কী এ আমার চোখের ভুল? পরমুহূর্তেই মনে পড়ে গেল, আরে এ তো মরুভূমির সেই মরীচিকা, যা এক ধরনের দৃষ্টি বিভ্রম। এর কারণ প্রচণ্ড সূর্যের তাপে বালি গরম হয়ে পড়ায় বালির ওপরের বায়ুস্তর হালকা হয়ে যায়। এর ফলে আলো প্রতিসরিত হয়ে এমনভাবে বেঁকে যায়, যাতে করে আকাশের প্রতিবিম্ব সড়কে পড়লে তাকে জলাশয় বলে বিভ্রম হয়।

মানুষের এক জীবনের পুরোটাই হয়তো কেটে যায় এই মরীচিকা-বিভ্রমে। আমাদের জীপ যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মরীচিকা ততই দূরে সরে যাচ্ছে। আমরা কিছুতেই মরীচিকার নাগাল পাচ্ছি না। মরীচিকা যেন সেই সোনার হরিণ। যে সোনার হরিণের পেছনে মানুষ জীবনভর ছুটে চলে। কিন্তু তার নাগাল কখনো পায় না।

মরীচিকাময় এই উদাস মরুদুপুর আমার মনকেও উদাস করে তোলে। স্মৃতির মহাসড়ক বেয়ে মুহূর্তেই আমি পৌঁছে যাই দূর-অতীতের সেই দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পিচঢালা রাস্তায়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, ঘুঘুডাকা কোনও এক ফাগুনের নির্জন দুপুরে ওই মহাসড়কে বাইসাইকেল চালিয়ে ছুটে চলেছে মায়াকাড়া চোখের এক দুরন্ত কিশোর। সড়কের দু’পাশে গাছগুলোতে ফুটে আছে টকটকে লাল শিমূল। ওই শিমূলের রঙে রঙিন হয়ে যাচ্ছে কিশোরের সবুজ মন। সেই রাঙানো মনের ভেতর সাইকেলের চাকার তালে রিনরিনিয়ে বেজে উঠছে-
‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।
মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই।
সে-যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা।
সে-যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায় চোখে ধাঁধা।
আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই–
আামি আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই।’

সেদিনের সেই একই কিশোর আজও ছুটে চলেছে কোনও এক আরব্য মরুভূমির মহাসড়ক ধরে, মরীচিকার পেছনে পেছনে, মরু ফাগুনের উদাস দুপুরে…।

লেখক:বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ছবি: গুগল