সে উত্তমা, প্রিয়তমা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামীম আজাদ

১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মর্ত্যধাম ফেলে চলে গেলেও সব সময়ে তিনি আমাদের মনে থাকেনই। তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম- আমাদের সর্বকালের এক অনন্য উত্তমা ও প্রিয়তমা, আমাদের হতভাগা দেশের এক সোনার মেয়ে!

দুই ছেলের সঙ্গে মা জাহানারা ইমাম

তাকে প্রথম দেখতে গেলে তাঁর এলিফেন্ট রোডের বাসা কণিকার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে রেলিঙ থেকে হাত সরাবার আগেই, সুশৃঙ্খল বসার স্পেসে পা দেবার আগেই রুমির লাইফ সাইজ আঁকা ছবির সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। এমন সুদর্শন যুবক আমি অনেকদিন দেখিনি। এতো মায়াভরা অথচ দীপ্তিময় চোখ! এ সেই রুমি, ক্ষুদিরামের ভাই, সূর্যসেনের উত্তরাধিকারী। মুক্তিযোদ্ধা। যাঁরা বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।

তিনি পাশের বেড রুমে। ভেতরের ফ্যানের হাওয়ায় পর্দা দুলছে। রেডিওতে কি যেন একটা গান চলছে এতদিন পর মনে করতে পারছি না।
রুমির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাতে গোছা করে আমার তাঁতের শাড়ি একটু তুলে পা থেকে স্যান্ডেল ছাড়াচ্ছিলাম। হাওয়ার ভেতর থেকে আহবান এলো, শামীম আমি একটু শুয়েছি। এসো মা ভেতরে এসো।

আমি তাতেই কেঁপে উঠলাম। গা কাঁটা দিইয়ে উঠলো। আমি শহীদ রুমির মা’কে দেখবো। আমি এক্ষুনি দেখবো, লেখক, বিচিত্রার দূর্দান্ত টিভি ক্রিটিক, নারী আইকন এবং আমাদের সুচিত্রা সেন জাহানারা ইমামকে। স্টাইল, বিদ্যা, বুদ্ধি, সংযম, শিক্ষা, দয়া, আধুনিকতার আকড় এই নারী। আর এই সব আমি জেনেছি রুমির সহযোদ্ধা, বন্ধু এবং আমার তখনকার বন্ধু ফতেহ, বাদল, আলম, শা চৌ এদের কাছ থেকে। তাঁরা সবাই এখন তাঁর এক একজন রুমি। সবাই তাকে মা ডাকে। তাঁদের স্ত্রী কবিতা, নায়লা, তৌহিদা, সেলিনা তার পুত্রবধূ। তিনি সপ্তাহে একদিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মা কে দেখতে যান। যে মা আজাদকে হত্যা করার পর আমৃত্যু মুখে অন্ন তোলেন নি। সময় কাটান লিখে, ক্যান্সারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে, যুদ্ধের সময় তার পাশে দাঁড়ানো বন্ধু ও ভক্তদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তাঁকে দেখতে আসে কত নতুন মানুষ। আমি তাদের একজন।

এই আমিটা কে? তাঁতের শাড়ি পরে, রিক্সা করে পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের কাছে ঘরাঘুরি করা এক উঠতি গদ্যকার। সন্ধ্যায় সংসার সামলে টিভি রেডিওতে উপস্থাপনা ও আবৃত্তি করা এক সম্ভাবনাময়ী । আসল কথা, আমি তাঁর রেখে যাওয়া কলম হাতে তুলে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখছি।

এদিকে আবার ঢাকা কলেজে মাস্টারিও করি। ঈশিতা পাঁচ বছরের প্রজাপতি, সজীব পৃথিবীতে মাত্র এসে ঘন পাঁপড়ি ভরা চোখ নিয়ে এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে। আর আজাদ বাংলাদেশ টোবাকোর এক গম্ভীর এ্যাকাউট্যান্ট আমার ঘরের বস হবার বিফল চেষ্টায় আছে। বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত শাহাদত চৌধুরী তখন আমার বস। মাত্র কিছু দিন হলো ঢাকার ফাটাফাটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টিভি রিভিউ লিখছি। আমার আগে এই কিংবদন্তী কন্যা জাহানারা ইমামই লিখতেন। হঠাৎ করে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় তাঁর পুত্র জামি ও পুত্রবধূ ফ্রিডার কাছে গেলে তাঁর কলামটি লেখতে শুরু করেছি আমি। বলা বাহুল্য, আমার সেই প্রথম দিককার টিভি জার্নালিজম নিয়ে আমি কোনদিন গর্বিত ছিলাম না। কারণ আমি নিজেই জানতাম তাঁর সেই চনমনে হিউমার সমৃদ্ধ কলামের গোড়ায় পড়ে আমার লেখা গোঙ্গাচ্ছে। কিন্তু এমন এক রোল মডেল আইকনের অনুপস্থিতিতে রবাহুত হয়ে আমি তাঁকে দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। চিকিৎসা শেষে ক্লান্ত খালা ফিরে এসেছেন। সেখানেই থেকে গেলে তাঁর জন্য ভালো হতো কিন্তু তিনি বাংলাদেশেই থাকবেন। ফোনে অনেক কথা হয়েছে। আজ তাঁকে দেখবো।

রুমি, এই সেই মেলাঘরের রুমি! ওর গায়ে সেনা পোশাক কেনো? ঘরের সবদিক যেনো এই মাত্র কেউ শিল্প ও সংস্কৃতির পালকে পরিষ্কার করে গেছে এমন। নামী শিল্পীর অরিজিন্যালের পাশে কাঠ ও বেতের আসবাব, বইয়ের র‍্যাক। ডান দিকে তাকিয়ে মনে হল ওটা খাবার ঘর হবে। আর তার সঙ্গে এই বেডরুমের প্যারালাল নিশ্চয়ই তাঁর সেই স্মার্ট কিচেন। ফ্রিজের হাতল সুন্দর কাপড়ে ঢাকা। সিঙ্কের কাছে ছোট ছোট হাড়িঁ ধরার বালিশ! আর বাঁ দিক দিয়ে ছাদে ঊঠে গেলেই দেখতে পাবো পৃথিবীর সব চেয়ে সুগন্ধী বেলী। সে বেলী তুলে নিলে অর্ধেক করতল ভরে যাবে। কণিকার ছাদের চিলেকোঠা নাকি পৃথিবীর তাবত সুন্দর বই এর তাকে ঠাসা। একটা ছোট চৌকি আর চেয়ার পাশে চেয়ার!

শামীম কি হলো! এসো এসো, এখানেই! আমার যে কি হলো বা হচ্ছিলো তা কি করে বুঝাই আপনাদের! পর্দা তুলে আমি প্রবেশ করলাম সেই প্রার্থনালয়ে। শহীদ জননীর শোবার ঘরে। এখানেই লুটোপুটি করেছে রুমি জামি।সক্কাল বেলা শরীফ খালু তৈরি হয়েছেন অফিস যাবার জন্য। এ যেন তিনি জীবিত থাকতেই এক মিউজিয়াম! পাখার শব্দ বড় হয়ে গেল। ঘরের ঠিক মধ্যে তাঁর বিছানা। মাথার কাছে তাকময় সাইড বোর্ড। বই, কলম পট, লেখার জন্য ছোট ছোট চিরকূট, একটা চা কাপ, সাদা লেসের ঢাকনা দেয়া পানির গ্লাস। লেসের প্রান্তের পুঁতি গুলো হাওয়ায় রিন রিন করছে। নাকি সে শব্দ আমার মনে বেজেছিলো। আজ আর তাঁর স্মৃতি থেকে সেই রিন রিন শব্দ থেকে তাঁকে আর আলাদা করতে পারি না।

ওমা! বিছানায় যে নরম তাঁতের শাড়ি পরা নারী, বহুযুগের অহঙ্কার নিয়ে বালিশে লেপ্টে আছেন – তাঁকে যে দেখতে একদম আমার মা’র মতোই লাগছে। যেনো কতো দেখেছি, কতো চেনা! একটু উঠে বসলেন। আমার মনে হলো পুরো ঘর ফুটে উঠলো। এতক্ষনে চারপাশ দেখলাম। সে ছিলো তাঁর একাত্তরের ডায়েরী লেখার কাল। ঝাঁকড়া চুলের গাজী ভাই তখন সে সময়ের অন্যতম সাহিত্য সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক ও সন্ধানী প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী। সেখানে আমার এক আধটা লেখা ছাপা হচ্ছে।

দেখলাম চিকিৎসাত্তোর ক্লান্তির পাশে তাঁর অবয়বে লেখার অনন্য প্রত্যয়। উঠে বাঁদিকের লেখার টেবিলের উপর থেকে একটি ডায়েরী নিলেন। যে কোন স্থানে খুললেন। তারপর তাঁর সাংকেতিক নোটগুলো থেকে পড়ে পড়ে গল্প করতে শুরু করলেন।

বুলেট পয়েন্ট বলি সে রকমই। তারিখের নীচে এমন করে আকারে ইঙ্গিতে লেখা যাতে সে সময় আর্মির হাতে ধরা পড়লেও তাদের বাবার সাধ্য নেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তার দৈনন্দিন যোগাযোগ বোঝে! আমরা দু’জন হেঁটে রান্নাঘরে গেলাম। গ্যাসের বা ইলেকট্রিক সাদা চুলা। কেটলিটার হাতলটা এলিয়ে পড়ে আছে। চারিদিকে কিচেন ওয়ার্কিং স্পেস। বাইশ বা চব্বিশ ফুট উঁচু হবে। তারই মধ্যে রূপালী সিংক। চুলোর উলটো দিকে সেই কাপড় ঢাকা ফুলতোলা হাতলের বিশাল ফ্রিজ। কি আধুনিক! অথচ কত আগে তাঁর ইঞ্জিনিয়ার স্বামী শরীফ খালুর করা।

এতক্ষনে মনে হলো তিনি একটু টেনে কথা বলছেন। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো স্মৃতি কাতরতা, হয়তো মন খারাপ দেশের কথা ভেবে। তবু কি সুন্দরী রে বাবা। রাহমান ভাই, হুমায়ূন ভাই তারা তাঁকে দেখেছেন তখন। এতক্ষনে তিনি কবার আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। আমি তাঁর সুগন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে যেনো আমার কোন জনমের সখী। তাঁর ত্বকের লাবন্যে অবাক হয়ে বলি এত তারুন্য কি মাখেন? এবার কিশোরীর মত কল কল করে বলেন, শুধু গ্লিসারিন আর গোলাপ জল।

সেই ছিল আমার সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের প্রথম রোজ ওয়াটার। তারপর তাঁরই সঙ্কেত ও সাহায্যে আমি গড়ে উঠতে থাকি। থাকি এই বিলেতে চাকুরী করতে আসার আগে পর্যন্ত।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]